সুলতান সুলায়মান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট

পর্দার জৌলুস বনাম ইতিহাসের বাস্তবতা

পর্দার জৌলুস বনাম ইতিহাসের বাস্তবতা
‘মুহতেশেম ইউজ্যিল’ এর পোস্টার

২০১১ সালে তুরস্কের বেসরকারি টিভি চ্যানেল শো টিভিতে যখন ‘মুহতেশেম ইউজ্যিল’ (দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেঞ্চুরি) সিরিজটি প্রচারিত হয়, তখন এর প্রভাব সম্পর্কে কারো তেমন ধারণা ছিল না। সুলতান সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের বর্ণাঢ্য জীবন, তার সুদীর্ঘ শাসনকাল, রাজমহলের অভ্যন্তরে সুলতানের ব্যক্তিগত জীবন ও রোমাঞ্চকর প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নির্মিত এই সোপ অপেরাটি বিশ্বব্যাপী তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। চার মৌসুম ও ১৩৯ পর্বের এই ধারাবাহিক প্রায় ৪৫টি দেশে প্রচারিত হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, এর সাপ্তাহিক দর্শকসংখ্যা ছিল ২১ কোটিরও বেশি। ষোড়শ শতকের উসমানি সুলতান সুলেমান, তার স্ত্রী হুররেমের প্রেম, প্রাসাদের ষড়যন্ত্র আর ক্ষমতার লড়াই আমাদের দেশের দর্শকদেরও মুগ্ধ করেছে। তবে এই বিশাল বাণিজ্যিক সাফল্য ও দর্শকপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে ধারাবাহিকটি তীব্র বিতর্ক এবং সমালোচনার ঝড় তোলে। উসমানি সাম্রাজ্য, রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তর এবং ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের যেভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, এর সঙ্গে বাস্তবের ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজের মিল কতটুকু, তা নিয়ে ইতিহাসবিদ, রাজনীতিবিদ ও সাধারণ দর্শকদের মধ্যে শুরু হয় নানামুখী বিতর্ক। এই ধারাবাহিকটি কি নিছকই হলিউড বা আধুনিক স্টাইলের মনগড়া নাটক, নাকি এর পেছনে রয়েছে নিখাদ নথিভুক্ত ইতিহাস, তা নিয়ে আলোচনার অন্ত নেই। দর্শকমনে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—পর্দায় আমরা যে সুলতান ও সালতানাতের অন্দরমহল দেখি, ইতিহাসের সঙ্গে তার মিল কতটুকু?

বিজ্ঞাপন

যেমন ছিলেন মহান সুলতান

সুলতান সুলেমান মাত্র ২৬ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন এবং ১৫২০ থেকে ১৫৬৬ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তিনি ‘কানুনি’ বা আইনপ্রণেতা নামে পরিচিত ছিলেন। তার যুগকে সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়। অথচ সিরিজের কেন্দ্রে সাম্রাজ্যবিস্তার বা রাষ্ট্রপরিচালনার চেয়ে অনেক জায়গায় আছে সুলতানের ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম আর হেরেমের টানাপোড়েন। এ নিয়ে তুরস্কে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। ২০১২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান প্রকাশ্যেই বলেন, ‘সুলেমান জীবনের ৩০ বছর কাটিয়েছেন ঘোড়ার পিঠে, প্রাসাদে নয়।’ তিনি নির্মাতাদের নিন্দা জানান এবং আইনি ব্যবস্থার প্রত্যাশা করেন। এক সংসদ সদস্য ঐতিহাসিক চরিত্রকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন নিষিদ্ধ করার একটি আইন প্রস্তাব করেন। এর আগে যৌন সংবেদনশীল দৃশ্যের কারণে দেশের সম্প্রচার কর্তৃপক্ষের কাছে ৭০ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছিল। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম কথা আছে। এরদোয়ান ৩০ বছরের যে হিসাব দিয়েছেন, বহু ইতিহাসবিদের গবেষণায় তা মেলে না। তাদের হিসাবে সুলেমান সামরিক অভিযানে কাটিয়েছেন প্রায় আট বছর। তা সত্ত্বেও এটুকু অস্বীকার করা যায় না, তিনি নিছক প্রেমিক সুলতান ছিলেন না, বরং একজন সক্রিয় সেনানায়ক ও অভিজ্ঞ আইনপ্রণেতা ছিলেন।

হুররেম সুলতানের উত্থান

সিরিজের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক সত্য সম্ভবত হুররেমের উত্থান। ইউক্রেন অঞ্চলের দাসী হিসেবে প্রাসাদে আসা এই নারী উসমানি সালতানাতের ইতিহাসের অন্যতম ক্ষমতাধর নারী হয়ে ওঠেন। সুলতান ১৫৩৩ বা ১৫৩৪ সালের দিকে তাকে আজাদ করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেন।

প্রথাগতভাবে সুলতানের প্রিয়তমা আর রাজকুমারের মা আলাদা নারী হতেন। এক উপপত্নীর একটিই ছেলে থাকত। ছেলে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে প্রদেশে গেলে মা-ও সঙ্গে যেতেন। হুররেম এর ব্যতিক্রম ছিলেন। তার গর্ভে ছয় সন্তান জন্ম নেয় এবং সারাজীবন প্রাসাদেই থেকে যান। এ কারণে জনসাধারণ ও দরবারে হুররেমের প্রতি অসন্তোষও বাড়ে। তিনি সুলতানের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হয়ে ওঠেন, অভিযানের সময় চিঠিতে রাজধানীর খবর জানাতেন এবং কূটনৈতিক পত্রালাপেও ভূমিকা রাখতেন। ইস্তাম্বুলে তার নামে গড়ে ওঠে মসজিদ, মাদরাসা, হাসপাতাল ও ফোয়ারা নিয়ে বিশাল কমপ্লেক্স। জেরুসালেম ও মক্কায়ও তিনি দাতব্য প্রকল্পে অবদান রাখেন। তার এই যুগান্তকারী ও প্রভাবশালী সময়কালকে ইতিহাসবিদরা ‘নারীদের সালতানাত’ (Sultanate of Women) হিসেবে অভিহিত করেছেন। ক্ষমতাধর হুররেমের এই চিত্র সিরিজ যথেষ্ট বিশ্বস্তভাবেই তুলে ধরেছে।

শাহজাদা মুস্তফার মৃত্যুদণ্ড

শাহজাদা মুস্তফার মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাটি সিরিজে মোটের ওপর ইতিহাসের কাছাকাছি রেখেই উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৫৫৩ সালে পারস্য অভিযানের সময় সুলতান সুলেমানের আদেশে তার নিজের তাঁবুতেই জ্যেষ্ঠ পুত্র মুস্তফার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, রুস্তম পাশার তৈরি একটি জাল চিঠির কারণে সুলতান বিশ্বাস করেছিলেন, মুস্তফা সিংহাসন দখলের ষড়যন্ত্র করছেন। এতে জেনিসারি সেনাদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

তবে মুস্তফা কিংবা ইব্রাহিম পাশার হত্যার ষড়যন্ত্রে হুররেম সরাসরি জড়িত ছিলেন, এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তাদের মৃত্যুর পেছনে হুররেমের ভূমিকা ছিল বলে ঐতিহাসিকদের মধ্যে আলোচনা আছে। কিন্তু সিরিজে দেখানো মতো তিনিই ষড়যন্ত্র করে তাদের হত্যা করিয়েছিলেন—এ দাবির ঐতিহাসিক ভিত্তি দুর্বল। হুররেমের ‘ডাইনি’ ভাবমূর্তিও মূলত সমসাময়িক গুজব ও ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকদের বিবরণে গড়ে ওঠে। ভেনিসিয়ান লেখক লুইজি বাসানো লিখেছিলেন, ‘প্রজারা মনে করত সুলতানকে তিনি জাদু করেছেন।’

প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও হেরেমের বাস্তবতা

ধারাবাহিকটিতে প্রাসাদ ও হেরেমের চিত্রণেই সবচেয়ে বেশি অমিল দেখা যায়। সিরিজে হেরেম যেন চিৎকার, বিষপ্রয়োগ, ষড়যন্ত্র ও হাতাহাতিতে ভরা এক অরাজক জগৎ। অথচ বাস্তবে হেরেম ছিল কঠোর নিয়ম ও শ্রেণিবিন্যাসে পরিচালিত একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। ‘হেরেম’ শব্দের অর্থও ‘নিষিদ্ধ’ বা ‘পবিত্র’—অর্থাৎ নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের প্রবেশাধিকার-সংরক্ষিত স্থান।

হেরেমে নারীদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও প্রশিক্ষণ ছিল। ক্ষমতার দ্বন্দ্বও ছিল, তবে তা সাধারণত প্রকাশ্য হাতাহাতির বদলে সম্পর্ক, আনুগত্য ও প্রাসাদীয় রাজনীতির মধ্য দিয়ে চলত। হেরেমের অভ্যন্তরীণ জীবন সম্পর্কে প্রত্যক্ষ তথ্য খুবই সীমিত।

সমস্যা হলো, হেরেমের অভ্যন্তরীণ জীবন সম্পর্কে আমাদের প্রত্যক্ষ তথ্য খুবই সীমিত। এ ক্ষেত্রে ইতিহাসবিদদের নির্ভর করতে হয় রাজকোষের হিসাব, প্রাসাদের নথি, বিদেশি দূতদের প্রতিবেদন ও কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণের ওপর। ইউরোপীয় ভ্রমণকারীদের অনেক বর্ণনায় আবার গুজব, কৌতূহল ও কল্পনার মিশ্রণ ছিল। ফলে ইতিহাসের এই অনালোকিত জায়গাগুলোই ধারাবাহিকটির নির্মাতাদের কল্পনার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল।

পোশাক-আশাকের বিকৃতি

নাটক ও বাস্তবের ফারাক সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাজপ্রাসাদের পোশাক-আশাক এবং হেরেমের অন্দরের দৈনন্দিন পরিবেশের মধ্যে। ধারাবাহিকে হেরেমের নারীরা, বিশেষ করে হুররেম ও মাহিদেভ্রানসহ সবাইকেই প্রাসাদের ভেতর অত্যন্ত আধুনিক, আকর্ষণীয় সব লো-কাট ইউরোপীয় ধাঁচের গাউন বা বক্ষদেশ উন্মুক্ত নকশাদার পোশাকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়, যেখানে ঘরের ভেতরে কোনো মাথার স্কার্ফ বা শালীন ওড়নার বালাই থাকে না। কিন্তু ষোড়শ শতকের রক্ষণশীল উসমানি সালতানাতের রাজপরিবারের নারীরা কখনোই এমন খোলামেলা পোশাক পরিধান করতেন না। তারা অত্যন্ত শালীন, লম্বা হাতা, উঁচু গলা এবং ঢিলেঢালা কাফতানের মতো ঐতিহ্যবাহী ও রাজকীয় উসমানীয় পোশাক পরতেন। যদিও তাদের পোশাকগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল সিল্ক এবং খাঁটি সোনার সুতার কারুকাজে তৈরি হতো, তবু ফরাসি বলরুম ডিনারের পরিধেয় ওইসব গাউন সম্পূর্ণ কাল্পনিক। নির্মাতারা মূলত দৃশ্যগত নান্দনিকতা এবং আধুনিক দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার লক্ষ্যেই পোশাকে এই অতিরঞ্জিত পরিবর্তন এনেছিলেন।

কালপঞ্জিগত ত্রুটি ও অ্যানাক্রোনিজম

ধারাবাহিকটিতে বেশ কিছু কালপঞ্জিগত ও ঐতিহাসিক অসংগতি স্পষ্ট। পারগালি ইব্রাহিম পাশাকে আধুনিক ধাঁচের বিলাসবহুল টেবিলে দাপ্তরিক কাজ করতে দেখা যায়। অথচ উসমানি প্রাসাদে এ ধরনের টেবিলের প্রচলন শুরু হয় অনেক পরে, উনিশ শতকে সুলতান প্রথম আব্দুল মজিদের আমলে। এক দৃশ্যে সুলতান সুলেমানকে আবার উনিশ শতকের কবি জিয়া পাশার কবিতা আবৃত্তি করতে দেখা যায়—যা সুলেমানের মৃত্যুর তিন শতাধিক বছর পরের রচনা।

ষোড়শ শতকের রাজপ্রাসাদের রান্নাঘরে টমেটো দিয়ে রান্না এবং মানিসা প্রাসাদের মেঝেতে ভার্সাই-ধাঁচের কাঠের কাজ বা পারকেট মেঝে দেখানোও কালপঞ্জিগত ত্রুটি। হুররেমের গ্রামে ‘লিও’ নামের সাবেক বাগদত্তা এবং পরে তার প্রাসাদে চিত্রশিল্পী হিসেবে উপস্থিতিরও কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। এমনকি হাঙ্গেরির রাজা দ্বিতীয় লুইকেও প্রবীণ দেখানো হয়েছে, যদিও ১৫২৬ সালের মোহাচের যুদ্ধে মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর।

এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ‘দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেঞ্চুরি’ কোনো প্রামাণ্যচিত্র বা ঐতিহাসিক দলিল নয়; এটি ইতিহাসের পটভূমিতে নির্মিত একটি উচ্চমানের কল্পকাহিনি ও সোপ অপেরা। দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখতে এতে নান্দনিকতা, নাটকীয়তা ও কাল্পনিক ঘটনার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তবু সিরিজের মূল কাঠামোয় ইতিহাসের বেশ কিছু সত্য ঘটনাও উঠে এসেছে।

সুলেমানের দীর্ঘ শাসন, হুররেমের সঙ্গে তার বিয়ে ও হুররেমের প্রাসাদীয় ক্ষমতার উত্থান, মুস্তফার মৃত্যুদণ্ড—এসবের সঙ্গে ইতিহাসের মূল ঘটনাপ্রবাহের যথেষ্ট মিল রয়েছে। বিপরীতে হেরেমের অরাজক চিত্র, নারীদের পোশাক, হুররেমের অতিরঞ্জিত ষড়যন্ত্রী ভূমিকা এবং নানা আনুষঙ্গিক ঘটনায় নির্মাতাদের কল্পনার ছাপ স্পষ্ট।

তাই সিরিজটি ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ তৈরির একটি দরজা হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের শেষ কথা নয়। পর্দার সুলতান বিনোদনের; ইতিহাসের সুলতান গবেষণা ও পাঠের বিষয়। সিরিজ দেখে আগ্রহ জন্মালে সেই আগ্রহই আমাদের ফিরিয়ে নিক বইয়ের পাতা ও ইতিহাসের প্রকৃত উৎসের কাছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...