১৩ থেকে ২৩ হিজরির মধ্যকাল। মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণে তখন জমা হচ্ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী মাদায়েনের রাজপ্রাসাদ থেকে বিজিত স্বর্ণালংকার, রত্নখচিত রাজমুকুট, পারস্য সম্রাট খসরুর বহুমূল্য পোশাক এবং সিরিয়া-মিসরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত অগণিত স্বর্ণমুদ্রার স্তূপ।
পারস্য বিজয়ের পর যখন এই বিপুল বৈভব মদিনায় আসে, তখন খলিফা ওমর আনন্দিত হওয়ার বদলে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি অনুতাপের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত প্রাচুর্য অতীতের বহু জাতিকে বিভেদ ও পতনের মুখে ঠেলে দিয়েছে (এই আশঙ্কা আমি নিজেদের ক্ষেত্রেও করছি)।’
তখন দ্বিতীয় খলিফা ওমরের শাসনকাল। আরব উপদ্বীপের সীমিত পরিসর পেরিয়ে মুসলিম খেলাফত দ্রুত আন্তর্মহাদেশীয় সাম্রাজ্যে রূপ নিচ্ছিল। নতুন নতুন ভূখণ্ড বিজয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হচ্ছিল গনিমত, জিজিয়া, খারাজ ও ফায়। এই অর্থনৈতিক বিস্তার রাষ্ট্রকে একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি করে—এই বিপুল সম্পদ কীভাবে সুসংগঠিত ও স্থায়ীভাবে বণ্টন ও সংরক্ষণ করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তরেই বাইতুল মালের প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের সূচনা হয়।
কেন এই রূপান্তর?
প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত শাসনকালে বাইতুল মাল মূলত তাৎক্ষণিক বণ্টনকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। সংগৃহীত রাজস্ব নাগরিক ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে দ্রুত বণ্টন করে দেওয়া হতো; দীর্ঘমেয়াদি উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু ১৩ হিজরিতে ওমর (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্রুত সম্প্রসারিত রাষ্ট্রের নতুন বাস্তবতা সামনে আসে। বিজিত অঞ্চল থেকে বিপুল রাজস্ব আসতে শুরু করায় নিয়মিত সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও জনকল্যাণের জন্য একটি সুসংগঠিত ও স্থায়ী ‘কোষাগার ব্যবস্থা’ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে ওমর (রা.) বাইতুল মালকে তাৎক্ষণিকভাবে বণ্টনের কেন্দ্র থেকে একটি নিয়ন্ত্রিত, নীতিভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগ নেন।
রূপান্তরের বৈপ্লবিক ভিত্তি
ইরাকের উর্বর কৃষি অঞ্চল ‘সওয়াদ’ ও সিরিয়া বিজয়ের পর বিজিত ভূমি ও বাইতুল মালের মালিকানা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। অনেক জ্যেষ্ঠ সাহাবি প্রচলিত নীতি অনুযায়ী বিজিত কৃষিজমি যোদ্ধাদের মধ্যে গনিমত হিসেবে বণ্টনের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু খলিফা ওমর (রা.) ভিন্ন ও সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেন। তার দৃষ্টিতে বিজিত ভূমি কেবল বিজয়ী সৈনিকদের সম্পদ নয়; বরং তা সমগ্র সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে সংরক্ষিত থাকা উচিত। তাই জমি ব্যক্তিমালিকানায় বণ্টন না করে কৃষকদের হাতেই রেখে তার উৎপাদন ও খারাজ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রবাহিত রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এতে কৃষি উৎপাদন ও রাষ্ট্রের স্থায়ী রাজস্ব—উভয়ই সুরক্ষিত থাকে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও সীমান্তরক্ষার জন্য বাইতুল মালের আয় অব্যাহত থাকে।
করের সুনির্দিষ্ট পুনর্বিন্যাস ও নতুন রাজস্ব উদ্ভাবন
খলিফা ওমর (রা.) রাজকোষের আয় বৃদ্ধি ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে রাজস্ব জরিপ পরিচালনা করেন। ইমাম আবু ইউসুফ (র.) লিখেছেন, ওমর (রা.) স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন কোনো প্রজার ওপর পরিশোধ ক্ষমতার অতিরিক্ত কর ধার্য না করা হয়। ইরাকের জমি নির্ভুলভাবে পরিমাপের জন্য তিনি ওসমান ইবনে হুনাইফ ও হুজাইফা ইবনুল ইয়ামানকে পাঠিয়ে ছিলেন। আর এটাই ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম ক্যাডাস্ট্রাল ভূমি জরিপ (Cadastral Land Survey)।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে ওমর (রা.) ‘উশর’ নামে বাণিজ্যিক শুল্ক ব্যবস্থা চালু করেন। আবু মুসা আল-আশআরি জানান, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো মুসলিম বণিকদের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক নেয়। জবাবে ওমর (রা.) পারস্পরিক মতামতের ভিত্তিতে বিদেশি বণিকদের ওপরও একই হারে শুল্ক আরোপের নির্দেশ দেন।
দেওয়ান প্রতিষ্ঠা
বর্ধিত রাজস্ব ও সামরিক ব্যয় সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য খলিফা ওমরের শাসনামলে ‘দেওয়ান’ ও সরকারি দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে সামরিক সদস্যদের নিবন্ধন করে বাইতুল মাল থেকে নিয়মিত বার্ষিক ভাতা বা ‘আতা’ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। ভাতা নির্ধারণে ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামিতা, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহচর্য ও ইসলামের জন্য আত্মত্যাগকে বিবেচনায় নেওয়া হতো। ফলে অনিয়মিত দানের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় ভাতা একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
প্রাদেশিক রাজস্ব ব্যবস্থা
সাম্রাজ্যের সুবিশাল ভৌগোলিক বিস্তারের কারণে খলিফা রাজ্যকে কয়েকটি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করেন। প্রতিটি প্রদেশে প্রশাসনিক গভর্নরের (ওয়ালি) পাশাপাশি স্বতন্ত্র কোষাধ্যক্ষ হিসেবে একজন ‘সাহিবুল খারাজ’ (Revenue Commissioner) নিয়োগ করা হয়।
প্রদেশগুলো সংগৃহীত খারাজ, জিজিয়া ও উশর থেকে স্থানীয় সৈন্যবাহিনীর বেতন, প্রশাসনিক ভাতা এবং সড়ক, সেতু ও খাল সংস্কারের ব্যয় মেটানো হতো। এরপর উদ্বৃত্ত অর্থ প্রাদেশিক কোষাগার থেকে মদিনার কেন্দ্রীয় বাইতুল মালে পাঠানো হতো। রাজস্ব আদায় ও হিসাব তদারকিতে খলিফা-নিযুক্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করতেন, ফলে প্রদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকত।
কেন্দ্রীয় আর্কাইভ
বর্ধিত রাজস্বের হিসাব ও নথিপত্র সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষণের জন্য খলিফা ওমর দিওয়ানভিত্তিক হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। বিজিত অঞ্চলে স্থানীয় ভাষা ও প্রশাসনিক রীতিতে দক্ষ কেরানিদের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়, ব্যয় ও জমির হিসাব সংরক্ষণ করা হয়।
মদিনায় কেন্দ্রীয় বাইতুল মালের অর্থ ও নথিপত্রের তদারকির দায়িত্ব আবদুল্লাহ ইবনে আরকামের ওপর অর্পণ করা হয়। এভাবে প্রাদেশিক রাজস্বের হিসাব, কেন্দ্রীয় কোষাগারে অর্থ প্রেরণ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের নথি সংরক্ষণে একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে।
বাইতুল মাল খলিফার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়
খলিফা ওমরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল খলিফার ব্যক্তিগত সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের মধ্যে স্পষ্ট পৃথক্করণ। তিনি ঘোষণা করেন, বাইতুল মাল কোনো শাসকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র উম্মাহর আমানত।
খলিফা ও তার পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে কোনো বিশেষ সুবিধা গ্রহণের সুযোগ ছিল না। শুরা পরিষদ তার জন্য সাধারণ নাগরিকের সমপরিমাণ ভাতা নির্ধারণ করেছিল। ফলে অসুস্থ অবস্থায় বাইতুল মাল থেকে সামান্য মধু ব্যবহারের প্রয়োজন হলেও তিনি জনগণের অনুমতি নিয়েছিলেন।
কল্যাণ রাষ্ট্র ও ‘আম আল-রামাদাহ’
ওমর (রা.)-এর প্রশাসনিক সংস্কারে বাইতুল মাল কেবল রাষ্ট্রীয় ব্যয় মেটানোর মাধ্যম ছিল না, বরং এর মাধ্যমে লেখাফত রাষ্ট্র বিশ্বের প্রথম দিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কল্যাণ রাষ্ট্র (Welfare State) হিসেবে বিকাশ লাভ করে। নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি ঘোষণা করেন যে, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা বাইতুল মালের প্রধান দায়িত্ব।
১৮ হিজরিতে ‘আমুর রামাদাহ’-র ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে বাইতুল মাল থেকে বিপুল খাদ্য ও অর্থ অভাবগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। মিসর ও সিরিয়া থেকে জরুরি ত্রাণ আনার ব্যবস্থা করা হয়। দ্রুত খাদ্য পরিবহনের জন্য খালিজে আমিরুল মুমিনিন খালটি পুনঃখনন করা হয়।
বাইতুল মালের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় শিশুদের ভাতা, প্রবীণ ও অক্ষমদের সহায়তা এবং অমুসলিম জিম্মিদের জন্যও মানবিক ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা ছিল। এভাবে বাইতুল মাল খলিফা ওমরের শাসনে রাষ্ট্রের অর্থভান্ডার থেকে একটি বিস্তৃত জনকল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়।
বাইতুল মাল : রাষ্ট্রীয় রাজকোষ না বহুমাত্রিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান
খলিফা ওমর (রা.)-এর যুগে বাইতুল মালকে কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থ সংরক্ষণের একটি ভান্ডার হিসেবে বিবেচনা করলে এর প্রকৃত ভূমিকা ও সক্ষমতা অনুধাবন করা যায় না। ১৩ থেকে ২৩ হিজরির মধ্যে এটি ধীরে ধীরে রাজস্ব সংগ্রহ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পুনর্বণ্টন ও জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি বিস্তৃত রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল—
সুনির্দিষ্ট রাজস্বব্যবস্থা : যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খারাজ, জিজিয়া ও উশরের মতো নিয়মিত রাজস্বের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।
সম্পদের পুনর্বণ্টন ও অর্থের সঞ্চালন : দিওয়ানের মাধ্যমে নির্ধারিত ভাতা বিতরণ করা হতো। পাশাপাশি সেচব্যবস্থা, সড়ক, সেতু এবং কুফা ও বসরার মতো নতুন নগর গড়ে তোলার কাজে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করা হয়।
জরুরি আর্থিক সহায়তা : রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বাইতুল মাল থেকে সাময়িকভাবে অর্থ নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে তা পরিশোধের ব্যবস্থাও ছিল।
অতএব ওমর (রা.)-এর প্রশাসনিক সংস্কারে বাইতুল মাল নিষ্ক্রিয় অর্থভান্ডার হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং রাজস্ব সংগ্রহ, সম্পদ পুনর্বণ্টন, রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও জনকল্যাণের সমন্বিত ব্যবস্থার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
১৩ থেকে ২৩ হিজরি খলিফা ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর শাসনের এই ১০ বছরে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থায় যে পরিবর্তন আসে, তা ছিল সুদূরপ্রসারী। সওয়াদের ভূমি ব্যবস্থাপনা, দিওয়ান প্রতিষ্ঠা, ভূমি জরিপ, উশর আদায় এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার সমন্বয়ে বাইতুল মাল একটি সম্প্রসারিত রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও জনকল্যাণ পরিচালনার অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

