রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে গ্রাহকদের কোটি টাকা নিয়ে কর্মচারী লাপাত্তা

রাজবাড়ী প্রতিনিধি

রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে গ্রাহকদের কোটি টাকা নিয়ে কর্মচারী লাপাত্তা
ছবি: আমার দেশ

রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের একজন কর্মচারী কমপক্ষে ৭৬ গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছে। তার নাম শিহাব মৃধা। তিনি লেটার রাইটার হিসেবে কাজ করতেন। ডাকঘরে টাকা রাখা গ্রাহক সবাই প্রান্তিক মানুষ। এর মধ্যে নারীই বেশি। কেউ গরু-ছাগল বিক্রি করে, কেউবা হাঁস-মুরগি পালন করে টাকা জোগাড় করে পোস্ট অফিসে সঞ্চয় করছিলেন। অনেক নারী স্বামীর অজান্তে সঞ্চয় করতে গিয়ে জানাজানি হওয়ার পর তাদের দাম্পত্য জীবনের অশান্তিও সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল রোববার দুপুরে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে গিয়ে দেখা যায়, প্রতারণার শিকার অসংখ্য গ্রাহক সেখানে ভিড় করেছেন। কেউ উদ্বিগ্ন, কেউ হতাশ, কেউ আবার কান্না চেপে বসে আছেন। সবার মুখে একটাই প্রশ্ন—আমাদের টাকা কি ফেরত পাব?

ডাকঘর সূত্র জানায়, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র বদলি হওয়ার পর গত ৬ জুলাই নতুন পোস্টমাস্টার হিসেবে যোগ দেন শামীম আহমেদ। যোগদানের প্রথম দিনই এক গ্রাহক জমার একটি হাত স্লিপ নিয়ে তার কাছে আসেন। স্লিপ দেখে সন্দেহ হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা শুরু হয়। পরে একের পর এক গ্রাহক একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে আসতে থাকেন। ইতোমধ্যে গত ১৩ জুলাই থেকে শিহাব মৃধা নিখোঁজ রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ জানান, শিহাবকে চাপ দেওয়ার পর এক গ্রাহকের দুই লাখ টাকা পরিশোধ করে। জানাজানির পর গ্রাহক আসতে থাকলে ১২ জুলাই ১৩ গ্রাহকের ২০ লাখ টাকা ফেরত দেয়। এভাবে গ্রাহক বাড়তে থাকলে সে গা ঢাকা দেয়। পোস্ট অফিসের রানার রেজাউলের ভাগনে হচ্ছে শিহাব মৃধা। তার সুপারিশে লেটার রাইটারের কাজ পায় শিহাব। শিহাবের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য জানতে গ্রামের বাড়িতে গেলে তার স্ত্রী এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

শিহাবের ছোট ভাই মাহবুব মৃধা বলেন, আমার ভাই প্রায় এক সপ্তাহ আগে অফিসে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়। তারপর আর বাড়িতে ফেরেনি। অফিসে কী হয়েছে বা টাকা-পয়সার বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। আমাদের সঙ্গেও তার কোনো যোগাযোগ নেই।

রাজবাড়ী শহরের রেলগেট এলাকার চা দোকানি প্রণব সাহা। দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত এক লাখ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন ভবিষ্যতের কথা ভেবে। গত ৬ মে সেই টাকা রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য জমা দিতে যান। ডাকঘরে গিয়ে তাকে জানানো হয়, সার্ভারে সমস্যা থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে এসএমএস যাবে না। পরে দেওয়া হবে বলে একটি জমা রসিদ ধরিয়ে দেন লেটার রাইটার শিহাব মৃধা। প্রণব সাহা বলেন, আমার অনেক কষ্টের জমানো টাকা। এক লাখ টাকা ফেরত পাব কি না জানি না।

গতকাল ৮০ গ্রাহক টাকা না দেওয়ার প্রতিবাদে রাজবাড়ী প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। পরে তারা পোস্ট অফিসের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে।

প্রণব সাহার মতো এমন অন্তত ৭৬ গ্রাহক রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে টাকা জমা দিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কেউ জমা দিয়েছিলেন এক লাখ, কেউ দুই লাখ, আবার কেউ তিন লাখ টাকা।

সবার কাছ থেকেই টাকা নিয়েছিলেন ডাকঘরের লেটার রাইটার শিহাব মৃধা। অভিযোগ উঠেছে, কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করে তিনি এখন পলাতক। শিহাব মৃধা রাজবাড়ী সদর উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের রশোড়া বাঘিয়া গ্রামের আয়ুব আলী মৃধার ছেলে।

এদিকে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় গত ১৬ জুলাই খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সভাপতি, খুলনা সার্কেল অফিসের সুপারিনটেনডেন্টকে (তদন্ত) সদস্য সচিব এবং ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল (তদন্ত) খুলনা ও কুষ্টিয়া বিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সদস্য করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির সদস্য কুষ্টিয়া ডাকঘরের পরিদর্শক (প্রশাসন) শহিদুল ইসলাম বলেন, যারা লিখতে-পড়তে পারেন না, তারা অনেক সময় লেটার রাইটারের সহযোগিতা নেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকের টাকা গ্রহণ করার এখতিয়ার লেটার রাইটারের নেই। ঘটনাটি যখন ঘটেছে, তখন দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায় এড়াতে পারেন না। আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী অন্তত ৭৬ গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। টাকার পরিমাণ কোটি টাকার মতো হতে পারে। আমরা তদন্ত করছি। পাশাপাশি কীভাবে পুরো টাকা উদ্ধার করে ভুক্তভোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টাও করছি।

এ বিষয়ে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের সাবেক পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র মুঠোফোনে বলেন, গ্রাহক কীভাবে টাকা জমা দিয়েছেন বা কীভাবে আত্মসাৎ হয়েছে, তা আমি জানি না। কেউ আমার কাছে টাকা জমা দেয়নি। আমরা সব সময় গ্রাহকদের কাউন্টারে অথবা ট্রেজারারের কাছে টাকা জমা দিতে বলি। আমার কোনো গাফিলতি নেই। আমার অজান্তেই ঘটনা ঘটেছে।

ঘটনার পর প্রতারণার শিকার গ্রাহকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা দ্রুত টাকা উদ্ধার করে ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন