সন্ধ্যার পর ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে রিপোর্ট আনার পর যা দেখা গেল, তার জন্য ঘরের কেউই প্রস্তুত ছিল না মানসিকভাবে। ডায়াবেটিস বেশি হলেও তেমন ভয় ছিল না। ইনসুলিন দিয়ে, ওষুধ খেয়ে সেটা কন্ট্রোলে আনা সম্ভব। কিন্তু সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হলো, মিলির ডেঙ্গু পজিটিভ রিপোর্ট এসেছে। রক্তে প্লেটলেটের পরিমাণও কমতির দিকে। ডাক্তারের পরামর্শে স্যালাইন দেওয়াসহ তরলজাতীয় খাবার খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ডায়াবেটিক রোগীদের ডেঙ্গু হলে বিপদের মাত্রাটা বেশি থাকে। স্যালাইন দিলে ডায়াবেটিস বেড়ে যায়, ইচ্ছেমতো ডাবের পানি, ফলমূলের জুস খাওয়া যায় না।
স্যালাইন লাগাতার চললেও মিলিকে কিছুই খাওয়ানো যাচ্ছে না। সে কিছুই মুখে তুলতে চাইছে না। মুখে অনেক অরুচি। এভাবে না খেয়ে খেয়ে পরপর দুদিন কেটে যায়। ডেঙ্গু আক্রান্ত স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি চোখের সামনে দেখে স্থির থাকতে পারছেন না ওমর। বাসায় তিনটি মাত্র প্রাণী; ওমর, মিলি এবং পুত্র আরমান। এ অবস্থায় আগে কখনো পড়েনি তারা। বুয়া এসে রান্নাবান্না করে দিয়ে গেছে বটে। কিন্তু কারোই খাওয়ার ইচ্ছে বা রুচি নেই। রাতে মিলির শারীরিক অবস্থা আরো অবনতি ঘটায় দুশ্চিন্তার মাত্রা বেড়ে যায় তাকে ঘিরে। বাথরুমে যেতে গিয়ে পড়ে গিয়ে পায়ে ব্যথা পায়। দাঁড়াতে পারছে না সে কারো সাহায্য ছাড়া। ওমর রোগীর শারীরিক অবস্থা জানিয়ে কয়েকজন ডাক্তার বন্ধু ও আত্মীয়ের সঙ্গে আলাপ করেছে। প্রায় সবাই এ অবস্থায় মিলিকে কোনো একটি হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করানোর পরামর্শ দেয়। রাতটা কোনোভাবে পার করার পর সকালের দিকে জ্ঞান হারানোর অবস্থা হয় মিলির। দ্রুত তাকে কোনো হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নিতেই ব্যাপারটা কোনোভাবে মেনে নিতে চায় না সে। তার একটাই কথা, ‘বাসায় স্যালাইন দিলেও অন্যান্য ওষুধপত্র খেলে তার সব অসুস্থতা কেটে যাবে। সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।’ এদিকে রক্তে প্লেটলেটের পরিমাণ এরই মধ্যে আরো অনেক কমে গেছে। বেশ দ্রুতই কমছে প্লেটলেটের পরিমাণ। একজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর জন্য এটা মারাত্মক বিপদের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। আজকাল ডেঙ্গুকে অবহেলা ও অবজ্ঞা করা মানে বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনা। আশেপাশে অনেকেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
বাসার সবার আকুতি আর তাগিদ উপেক্ষা করতে পারে না শেষ পর্যন্ত। বিকেলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে রাজি হয় মিলি। কারণ নিজের শারীরিক অবস্থার ক্রমানবতি সে টের পেয়েছে ইতোমধ্যে। বাসাবো থেকে কাকরাইল হাসপাতালের উদ্দেশে বের হয়ে রাজারবাগ ফ্লাইওভারে গাড়ি কিছুদূর এগোতেই রাস্তাজুড়ে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কাকরাইলের দিকে কোনো গাড়ি যেতেই দিচ্ছে না পুলিশ। জানা গেল, কাকরাইল, পল্টন ও বিজয়নগর এলাকায় ছাত্র-জনতার বড় ধরনের বিক্ষোভ চলছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়েছে।
জুলাইয়ের শুরু থেকে শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরুর পর থেকে গত ১৫-১৬ দিনে এটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ মিছিল হচ্ছে। সড়ক অবরোধ করে সমাবেশ করছে শিক্ষার্থীরা। শুরুতে এটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজকেন্দ্রিক ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনে সীমাবদ্ধ থাকলেও ক্রমেই তা ছড়িয়ে পড়ছে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা যেখানে আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কখনো নিজেদের জড়ায় না, এখন তারাও শামিল হয়েছে বৈষম্যবিরোধী এই আন্দোলনে। সরকারের একগুঁয়ে, স্বেচ্ছাচারী, স্বৈরাচারী এবং অত্যাচারী মনোভাব ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। তারাও ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে প্রতিদিন সভা-সমাবেশ করে সরকারের অন্যায়-অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারের অবসান চাইছে। এভাবে তো দিনের পর দিন চলতে পারে না।
কাকরাইলের দিকে এগোতে না পেরে গাড়িটা ঘুরিয়ে মিলিদের নিয়ে শাহজাহানপুরের দিকে এগিয়ে যায়। আশেপাশে কাছে হাসপাতাল রয়েছে ওই একটাই। সন্ধ্যের আগেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয় মিলিকে। তিনতলায় একটা কেবিন পাওয়া যায় তার জন্য। ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। কয়েক ধরনের টেস্টের নির্দেশনা দেন। রাত ৮টায় কয়েকটি টেস্টের রিপোর্ট চলে আসে। রক্তে প্লেটলেটের পরিমাণ আরো অনেক পরিমাণে কমেছে। ক্রমাগত স্যালাইন দেওয়ার কারণে ডায়াবেটিস বেড়েছে। এ মুহূর্তে চিকিৎসাকৌশল কী হবে, তা নিয়ে কয়েকজন ডাক্তার আলোচনায় বসেন। ওমর এমনিতেই হার্টে রিং লাগিয়ে এসেছে মাত্র কিছুদিন আগে। তার পক্ষে বেশি মেন্টাল প্রেশার নেওয়া উচিত হচ্ছে না। এতে তার বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। ছেলে আরমান হাসপাতালে কিছুক্ষণ থেকে বাসায় চলে গেছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় আত্মীয়স্বজন কাউকে পাশে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য পাওয়া যাচ্ছে না। ভীষণ অসহায় বোধ হচ্ছে নিজেকে। শহরজুড়ে পরিস্থিতি দিনে দিনে ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। কয়েক দিন আগে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দিয়েছেন; তার এই বক্তব্য আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ করেছে, প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে সবাই। নিজেদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত মনে করেছে। তারা প্রতিক্রিয়া জানাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল করে স্লোগান দিয়েছে—‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার, রাজাকার।’ সরকার শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী তথা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে দিনে কঠোর পন্থা অবলম্বন শুরু করেছে।
শিক্ষার্থীরাও তাতে পিছিয়ে না গিয়ে না দমে আরো বেশ বিক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী হচ্ছে। আন্দোলনের পরিসর দেশের কোনো একটি জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই, এটা এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশ জুড়ে, একাত্তরে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলন ও কর্মকাণ্ড শহর-গ্রাম সবখানে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ওমর একদিকে ডেঙ্গু এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত স্ত্রী মিলিকে নিয়ে হতাশা ও দুশ্চিন্তায় ক্রমেই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে, তেমনিভাবে ছেলে আরমানকে নিয়েও ভীষণ ভাবনা তার। তাদের ভার্সিটি বাড্ডা, আফতাবনগর ও রামপুরা এলাকায় প্রতিদিন গন্ডগোল, মারামারি, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলছে। ছেলেকে কয়েক দিন ভার্সিটি যেতে মানা করলেও সে নিষেধ মানছে না। ক্লাস আছে এবং বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি রয়েছে প্রতিদিনই। কোনো দিন কী ঘটে যায়, তাকে আবার কোনো বিপদে পড়তে হয়—এসব নিয়ে ভাবনা পিতা ওমরের। তার মাথায় কিছুই আসছে না, কী করবে সে। রাস্তাঘাটে ঝামেলা, গন্ডগোল ইত্যাদির ঝুঁকি মাথায় নিয়েও হাসপাতালে মিলিকে দেখতে কয়েকজন আত্মীয়স্বজন এসেছেন। তারা মিলির শারীরিক অবস্থা দেখে ভড়কে গেছেন। সারা শরীর ফুলে গেছে তার। পেটে পানি এসেছে। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হচ্ছে। তার মানে ফুসফুসে পানি জমেছে। ওদিকে প্লেটলেট কমতে কমতে ১৬ হাজারে নেমে এসেছে। এটা নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক অবস্থা। যেকোনো সময় রোগীর ব্লিডিং শুরু হতে পারে। রক্ত দেওয়া লাগতে পারে তার। এজন্য ডোনারের ব্যবস্থা রাখতে পরামর্শ দিয়েছেন ডাক্তার। এরই মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ডোনারের খোঁজ লাগানো হয়েছে। পাওয়া গেছে কয়েকজনকে; কিন্তু সমস্যা হয়েছে কারো বাসা মিরপুর, আবার কেউ উত্তরা, টঙ্গী থাকেন। চারদিকে বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থা চলছে। এ অবস্থায় তারা রক্ত দিতে এখানে কীভাবে আসবেন? তাদেরও তো বিপদে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। পুলিশ সন্দেহভাজন সবাইকে আটক করছে।
গতকাল রংপুরে কারমাইকেল কলেজের ছাত্র আবু সাঈদকে পুলিশ সরাসরি গুলি করে হত্যা করেছে। কী অসীম সাহস নিয়ে বুক চিতিয়ে ছেলেটি পুলিশের অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়েছিল! তার চোখেমুখে ছিল অদ্ভুত দৃঢ়তা, প্রত্যয়ের উজ্জ্বল প্রকাশ। স্বৈরাচারী শাসকের অন্যায়, অনিয়ম, বৈষম্য, অমানবিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে নিজের জীবন বিপন্ন করে পুলিশের অস্ত্রের গুলির সামনে নিজের বুক পেতে দিয়েছে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তের ছবি। আরমান তার বাবাকে দেখিয়েছে আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার মুহূর্তের ভিডিও, যা দেখে আরো কাতর হয়ে পড়েছে ওমর। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠেছে। ‘এ কোন স্বাধীন দেশে আছি আমরা? এটা কি স্বাধীন দেশের নমুনা?’—ক্ষোভে ফেটে পড়তে পড়তে বলেছে সে।
ছেলে আরমানকে ঘিরে ভয়টা আরো জেঁকে বসেছে। কীভাবে কখন বাসা থেকে ভার্সিটির দিকে চলে যায় ছেলেটা, তাকে পাহারা দিয়ে আগলে রাখবে কে? বাসায় তো এখন কেউ নেই? সে নিজে রয়েছে হাসপাতালে মুমূর্ষু স্ত্রীর পাশে। এমন দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে আগে কখনো পড়েনি সে। মিলির শারীরিক অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। কোনো রকম উন্নতির লক্ষণ নেই। এই হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে ভরসা হারিয়ে ফেলেছে ওমর। দ্রুত আরো ভালো হাসপাতালে তাকে শিফট করাটা একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে শহরের কোনো ভালো হাসপাতালে মিলিকে নিয়ে যাওয়া কি সম্ভব? শহরজুড়ে চলছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মিছিল, প্রতিবাদ ও সমাবেশ। আর সেখানে সরকারের বিভিন্ন বাহিনী নির্বিচারে হামলা চালাচ্ছে—গুলিবর্ষণ করছে এবং রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ছে। উত্তরায় ভার্সিটির ছাত্র টগবগে তরুণ মুগ্ধ পুলিশের গুলিতে মৃত্যুবরণ করেছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, আন্দোলনকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার পর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন অবস্থার মধ্যে চোখ মেলে তাকাতে না পারলেও সবার জন্য পানির বোতল নিয়ে ছুটোছুটি করছে মুগ্ধ। তার মুখে শোনা যাচ্ছে, ‘পানি লাগবে, পানি। কারো পানি লাগবে।’ এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশের গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হয় প্রাণবন্ত সম্ভাবনাময় এই তরুণ ছেলেটা। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে উত্তরায় মুগ্ধসহ আরো বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর দৃশ্য। ধানমন্ডির ২৭ নম্বরে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ফারহান ফাইয়াজের বেদনাদায়ক মৃত্যুর দৃশ্য দেখে ওমর দিশাহারা হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে মৃত সন্তানের লাশ জড়িয়ে মায়ের আহাজারির দৃশ্য তাকে অস্বাভাবিক করে তুলছে ক্রমেই। সে নিজেও তো সন্তানের বাবা। সন্তান হারানোর কষ্ট কতটা ভারী এবং অসহ্য এটা সে উপলব্ধি করে।
২
মিলিকে অন্য হাসপাতালে শিফট করতে হলে অ্যাম্বুলেন্স দরকার। কিন্তু শহরের পরিস্থিতি এতটাই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে যে কেউ গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামার সাহস পাচ্ছে না। অ্যাম্বুলেন্স চালকরাও ভরসা করতে পারছে না রোগী নিয়ে কোথাও যেতে। অনেক বলে-কয়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স চালককে বেশি টাকা ভাড়ার বিনিময়ে রাজি করানো গেল শেষ পর্যন্ত। দ্বিগুণ ভাড়ায় সে যেতে রাজি হয়েছে ধানমন্ডি যেতে।
মিলিকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে ধানমন্ডির দিকে যাত্রা করার পর দেখা গেল রাস্তায় জনমানুষের চিহ্ন নেই। মনে হয় শহরে কারফিউ চলছে। ঘরের বাইরে বেরোলেই যেন গুলি করা হবে, তেমন একটা অবস্থা বিরাজ করছে শহরজুড়ে। একটা গাড়িও চোখে পড়ল না কোথাও। ধানমন্ডির শংকর পৌঁছাতেই হঠাৎ আকাশে হেলিকপ্টার ওড়ার শব্দ কানে এলো। ওমর ভাবল, হেলিকপ্টার আকাশে উড়ে হয়তো শহরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই হঠাৎ হেলিকপ্টার থেকে মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণসহ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাস শেল নিক্ষেপ শুরু হলো, যার জন্য তারা কেউ প্রস্তুত ছিল না। এ রকম পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষ কখনো পড়েনি। মনে হলো, বিদেশি কোনো রাষ্ট্র যেন আক্রমণ করেছে এ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর। একাত্তর সাল নিজের চোখের সামনে দেখেছে ওমর। ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় এখানে-ওখানে ছুটোছুটির মধ্যেও পড়েছে বেশ কয়েকবার। তখন মরতে মরতে বেঁচে গেছে তারা। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা মনে পড়ে গেল ওমরের। মুমূর্ষু স্ত্রী মিলিকে নিয়ে ধানমন্ডির হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য রওনা দিয়ে তার চেয়েও বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে। যেভাবে গুলিবর্ষণ করা হচ্ছে, সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দে কাঁপছে চারদিক আর টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে চারপাশ, সেক্ষেত্রে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। অ্যাম্বুলেন্সের যাত্রীদের সবাই দোয়া-দরুদ পড়ছে, যাতে কোনোভাবে হাসপাতালে রোগীকে অক্ষত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। অ্যাম্বুলেন্সচালক মাঝবয়সি হলেও বেশ সাহসী ও দক্ষ। সব গুলিবর্ষণ, সাউন্ড গ্রেনেডের তাণ্ডব আর কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁঝালো বাতাস উপেক্ষা করে অবশেষে হাসপাতাল কম্পাউন্ডে ঢুকে পড়ে গাড়িটা।
সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রেচারে করে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয় মুমূর্ষু মিলিকে। তার শ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। আর পথে আসতে সরকারি বাহিনীর হেলিকপ্টারের গুলি ও বোমা হামলার মধ্যে পড়ে আরো বেশি ভয় পেয়েছে সে। চিকিৎসকরা তার প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ সারছিল তখন। আশেপাশে গুলিবিদ্ধ অসংখ্য রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত মানুষের আর্তনাদ ও আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। কয়েকজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছে, দেখা গেল। কারো চোখ ভেদ করে গুলি ঢুকে মাথার আরেক দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। কারো কারো পা ছররা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। অবিরাম রক্ত ঝরছে। প্রচুর রক্ত দরকার আহতদের জন্য।
ততক্ষণে মিলিকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে এইচডিইউতে নেওয়া হয়েছে। ডায়াবেটিস, নিউমোনিয়া ও রক্তের প্লেটলেটের স্বল্পতা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে তাকে। ডাক্তাররা রক্তের জন্য ডোনারের ব্যবস্থা করে রাখতে বলেছেন।
আজ ১৯ জুলাই। ঢাকা শহর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। অনেক জায়গায় ব্যাপক সংখ্যায় মানুষ হতাহত হয়েছে। রক্ত দিতে আগ্রহী হলেও এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কেউ ধানমন্ডি আসার সাহস করছে না। তাহলে শেষ পর্যন্ত কী হবে অসুস্থ মিলির। প্লেটলেটের পরিমাণ ভয়াবহ নিম্নস্তরে পৌঁছে গেছে। ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত নেওয়া যায়; কিন্তু সেটা কতটা নিরাপদ? আর এখন রক্ত কেনা, ওষুধ কেনা, হাসপাতালে কিছু টাকা জমা করার জন্য বেশ কিছু টাকাপয়সা জরুরি। কিন্তু সঙ্গে তো নগদ এত টাকা নেই। বিকাশ দিয়ে অনেকের কাছ থেকে টাকা আনা যায়। কিন্তু সেটাও এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। সরকার ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিকাশের মাধ্যমে টাকার লেনদেনও করা যাচ্ছে না। ব্যাংকে টাকা থাকলেও তা ট্রান্সফার করে আনা যাচ্ছে না। এ রকম বিপদে এর আগে কখনো পড়েনি সে। কিন্তু এই মুহূর্তে ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব নয়। অস্থিরতার মধ্যে দ্রুত সময়গুলো বয়ে যায়। ওমর ভেবেছিল, ছেলে আরমানকে হাসপাতালে রেখে বাসায় এসে নগদ টাকাপয়সা জোগাড়যন্ত্রের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু এর মধ্যে কখন যে রাত ১২টা বেজে গেছে। ততক্ষণে টিভি পর্দার স্ক্রলে ব্রেকিং নিউজ ভেসে উঠেছে—‘সরকার রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি করেছে। এ সময় কাউকে ঘরের বাইরে না যাওয়ার জন্য নির্দেশ জারি করা হয়েছে।’ ওই মুহূর্তে যারা হাসপাতালে বিভিন্ন রোগীর আত্মীয়স্বজনরা ছিলেন, তারা সবাই এমন একটা পরিস্থিতির কথা আগে ভাবতেও পারেননি। সারা রাতের জন্য আটকে পড়ে যাওয়ায় সবার মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এখন কে কোথায় যাবেন তারা? রাতটা কীভাবে কাটবে, চিন্তাভাবনা শুরু করলেন প্রত্যেকেই। ওমরও তাদের মধ্যে একজন।
সকালে এইচডিইউর ডাক্তাররা ব্রিফিংয়ে জানান, মিলির শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো। তার রক্তে প্লেটলেটের পরিমাণ বাড়ছে দ্রুত। এটা একটা পজিটিভ লক্ষণ। তাকে আর রক্ত দেওয়া লাগবে না। তবে ডায়াবেটিস এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও অ্যালবুমিন স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কম থাকায় ওষুধ দিতে হচ্ছে। সকালে কারফিউ উঠে গেলে হাসপাতালে এইচডিইউতে অসুস্থ স্ত্রীকে রেখে অনেকটা বাধ্য হয়ে ধানমন্ডি শংকর থেকে বাসার উদ্দেশে রওনা হয় ওমর। হাসপাতালে ছেলেটা একা রয়েছে। সকালে দোকানপাট খুলেছে কয়েকটা। সেখানে গিয়ে নাশতা পেয়েছে কি না কে জানে। নাকি না খেয়ে আছে এখনো?
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


কবি আল মুজাহিদী ও ড. আবু হেনা ছিলেন বাংলা সাহিত্যের আলোকবর্তিকা