ভারত সরকারের অনুমতি ছাড়া দিল্লিতে কীভাবে প্রোগ্রাম করেন হাসিনা: রিজভী

ভারত সরকারের অনুমতি ছাড়া দিল্লিতে কীভাবে প্রোগ্রাম করেন হাসিনা: রিজভী

ভারত সরকারের অনুমতি ছাড়া দিল্লিতে আন্তর্জাতিক কোনো সংগঠনের অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা কীভাবে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি স্বতন্ত্র, তাই এ বিষয়ে সরকারের কিছু করার নেই। কিন্তু সরকারের অনুমতি ছাড়া দিল্লিতে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কি যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠান করতে পারে—এ প্রশ্নের উত্তরও দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

শনিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে গণঅভ্যুত্থান-২০২৪-এর দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন রিজভী।

রিজভী বলেন, সম্প্রতি দিল্লিতে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের অনুষ্ঠানে একজন ‘পলাতক ফ্যাসিস্টের’ বক্তব্য দেওয়ার আয়োজন করা হয়েছে। সংগঠনটির নাম সাউথ এশিয়ান ফরেন জার্নালিস্ট ক্লাব বা এ ধরনের কিছু বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ ঘটনায় বিএনপি প্রতিবাদ করেছে এবং সরকারও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

তবে ভারত সরকার জানিয়েছে, এটি একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান এবং এ বিষয়ে সরকারের কিছু করার নেই।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “সরকারের অনুমতি ছাড়া দিল্লিতে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কি যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠান করতে পারে? সেখানে একজন পলাতক ফ্যাসিস্ট বক্তব্য দেবেন এবং সরকার বলবে, ‘এখানে আমাদের কিছু করার নেই’—এটি কি গ্রহণযোগ্য?”

রিজভী বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনি মামলা পরিচালনার জন্য লন্ডন থেকে লর্ড কার্লাইল এসেছিলেন। কিন্তু তাকে বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এমনকি তিনি দিল্লিতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে চাইলেও তখন তাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে উল্লেখ করেন রিজভী।

তিনি বলেন, “সেই সময় যদি একটি বিদেশি ব্যক্তি বা সংগঠনের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকে, তাহলে এখন কেন বলা হচ্ছে, দিল্লিতে একজন পলাতক ফ্যাসিস্টের বক্তব্য দেওয়ার আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকারের কিছু করার নেই?”

ভারতের এমন অবস্থানকে ‘দ্বৈত অবস্থান’ হিসেবে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, বিষয়টি বিএনপিকে ভাবিয়ে তুলছে।

পররাষ্ট্রনীতির প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, বিএনপি সবসময় বলেছে, বিদেশে বাংলাদেশের বন্ধু আছে; কিন্তু কোনো দেশের কাছে বাংলাদেশের প্রভুত্ব মেনে নেওয়ার প্রশ্ন নেই।

তিনি বলেন, “আমাদের পররাষ্ট্রনীতির জায়গা থেকে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু কোনো দেশের কাছে প্রভুত্ব মেনে নেওয়া হবে না।”

রিজভী বলেন, বেগম খালেদা জিয়া কিংবা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কখনো বলেননি যে বিদেশে বাংলাদেশের প্রভু আছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আন্দোলন ছিল না; এর পেছনে ছিল সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ।

তিনি বলেন, “এই আন্দোলনে ১৫-২০ জন রিকশাচালক নিহত হয়েছেন। ৯৫ জন শ্রমিকও এই আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছেন। অর্থাৎ এটি ছিল সামগ্রিকভাবে জনগণের একটি বিরাট উত্থান।”

রিজভী বলেন, ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের একটি পরিণতি রয়েছে। এ দেশের মানুষ দীর্ঘদিন অন্যায়-অবিচার ধারণ করে রাখে না। আগ্রাসী শক্তি ও ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে জনগণ একপর্যায়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান সেই দীর্ঘ ক্ষোভ ও আন্দোলনেরই চূড়ান্ত পরিণতি।

তিনি বলেন, “এই জাতি সবসময় যেকোনো আগ্রাসী শক্তি ও ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে একটি পর্যায়ে ভয়ংকর রূপে আত্মপ্রকাশ করে। সেই ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে জুলাই।”

রিজভী বলেন, এখন যারা নরম সুরে কথা বলছেন এবং শেখ হাসিনার আমলেই ভালো ছিল বলে মন্তব্য করতে চাইছেন, তাদের বক্তব্যও গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমিরের বাসায় সরকারি ভাষায় একটি চিত্র প্রদর্শনী হয়েছে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের ছবি, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ছবি এবং জুলাইয়ের বিভিন্ন চিত্র ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর ও স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে যাকে তিনি উল্লেখ করেন, তার কোনো ছবি, বক্তব্য বা পোস্টার সেখানে ছিল না।

বিষয়টিকে তাৎপর্যপূর্ণ ও রহস্যজনক উল্লেখ করে রিজভী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ছবি বা বক্তব্য সেখানে না থাকা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ৫ আগস্টের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করে দেওয়ার যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি কি তারই কোনো সম্প্রসারণ কি না—এ বিষয়টি ভাবতে হবে।

রিজভী বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক উত্থান। সেই গণ-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, জুলাইয়ের আত্মত্যাগ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং দেশের সার্বভৌমত্ব—কোনোটিকেই খণ্ডিতভাবে দেখার সুযোগ নেই।

বিএনপির এই নেতা বলেন, “আমাদের মনে রাখতে হবে, এই দেশের জনগণ কখনো অন্যায়-অবিচার দীর্ঘদিন মেনে নেয়নি। আগ্রাসন, কর্তৃত্ববাদ কিংবা ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষ বারবার রুখে দাঁড়িয়েছে। জুলাই সেই দীর্ঘ সংগ্রামেরই একটি ঐতিহাসিক পরিণতি।”

এসআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন