জুলাই বিপ্লবে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর তার নিয়োগ করা স্পিকার শিরীন শারমীন চৌধুরী ও প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের পাশাপাশি জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা রুহুল আমিনও পালিয়ে যান। তবে থেকে যান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ও গ্রেপ্তারের জোরালো দাবি ওঠে ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকেও। ওইসব আন্দোলনের নেতৃত্বের পুরোভাগে ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদি।
জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা ওসমান হাদির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে ফ্যাসিস্ট সরকারের অবৈধ রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে ছাত্র-জনতার উত্তাল আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল। একটি পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে করা একটি মন্তব্যে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন ছাত্র-জনতা। সেখানেও নেতৃত্ব দেন শরীফ ওসমান হাদি। রাষ্ট্রপতির এই বিভ্রান্তিকর ও ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্য প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা বিপ্লবীদের রক্তের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে উল্লেখ করে বিক্ষোভের ডাক দেন তিনি। হাদি এ বিষয়ে একটি বক্তব্যে বলেন, হাজারো শহীদের রক্ত লেগে থাকা শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে যার ধোঁয়াশা সৃষ্টির দুঃসাহস হয়, সে কখনোই নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বে থাকার নৈতিক অধিকার রাখতে পারে না।
রাজপথের প্রতিটি সমাবেশ থেকে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ একের পর এক চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করেন ওসমান হাদি। ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজু ভাস্কর্য ও শহীদ মিনারের প্রাঙ্গণ থেকে হাজার হাজার ছাত্র-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে হাদি বঙ্গভবনের উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক পদযাত্রা শুরু করেন। এই আন্দোলনের সঙ্গে হাসনাত আবদুল্লাহ, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমসহ জুলাই আন্দোলনের অগ্রভাগের নেতারাও যুক্ত ছিলেন। আন্দোলনকারীরা বঙ্গভবনের মূল ফটকের সামনের সড়ক ও শাপলা চত্বর সংলগ্ন এলাকা অবরুদ্ধ করে রাখেন। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের আলটিমেটাম দেন তিনি। ওই সময় অন্তর্বর্তী সরকার বঙ্গভবনের নিরাপত্তা জোরদার করে। পরদিন ৪ অক্টোবর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশাল গণজমায়েত ডাকা হয়। সেখান থেকে ওসমান হাদি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগসহ সংস্কারের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঁচ দফা দাবি পেশ করেন।
ওই সমাবেশে ওসমান হাদি বলেন, আমরা কেবল স্বৈরাচারীর মুখ বদলে সন্তুষ্ট হতে আসিনি। আমরা এসেছি পুরো ফ্যাসিবাদী বন্দোবস্ত গুঁড়িয়ে দিতে। বঙ্গভবনে শেখ হাসিনার অনুচর বসে থাকা মানে বিপ্লব ও শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। তার এই নির্ভীক বক্তব্য রাজপথে লাখো তরুণকে সাহস জুগিয়েছিল এবং সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ এজেন্ডায় পরিণত করেছিল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন গত বছর ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন ওসমান হাদি। এর ছয়দিন পর ১৮ ডিসেম্বর তিনি সিঙ্গাপুরে ইন্তেকাল করেন। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা হাদিকে গুলিবর্ষণকারী হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতাকে শনাক্ত করে। হাদিকে গুলি করার পরপরই ভারতে পালিয়ে যায় সে হত্যাকারী। পরবর্তী সময়ে ভারতে গ্রেপ্তার হয় ছাত্রলীগের ওই সন্ত্রাসী। আর ওসমান হাদির হত্যার সাত মাস ছয় দিন পর পদত্যাগ করলেন রাষ্ট্রপতি চুপ্পু।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

