রাজনৈতিক সহিংসতায় দেশে গত তিন মাসে অন্তত ৪১ জন নিহত এবং ৯৭০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে এপ্রিলে ১৫, মে মাসে ১০ এবং জুনে ১৬ জন নিহত হন।
বৃহস্পতিবার মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর প্রকাশিত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে এই তিন মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) গুলিতে মৃত্যু, সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ এবং নারী ও শিশুদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজনৈতিক সহিংসতার বড় একটি অংশ ছিল ক্ষমতাসীন বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল। মূলত চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তিন মাসে বিএসএফ সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রাখে। বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে অন্তত সাত বাংলাদেশি নিহত এবং তিনজন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ছয়জনকে সরাসরি গুলি করে এবং একজনকে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মে মাসে ১০ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করার ঘটনাও ঘটায় বিএসএফ।
এই তিন মাসে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত আসার চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্তত ১৭ সাংবাদিক আহত, পাঁচজন লাঞ্ছিত, চারজন আক্রান্ত এবং সাতজন হুমকির শিকার হয়েছেন। এছাড়া সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর এসব হামলার ঘটনায় সরকারি দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় দুর্বৃত্তদের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার মাত্রা ছিল উদ্বেগজনক। এই তিন মাসে ২৫৫ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১৬১ জন শিশু (১৮ বছরের নিচে) এবং ৯৩ জন নারী রয়েছেন। একজনের বয়স জানা যায়নি। ধর্ষণের পর অন্তত ১৪ জনকে (১১ শিশু ও তিন নারী) হত্যা করা হয়েছে এবং একজন শিশু আত্মহত্যা করেছে। ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুর মধ্যে ৬১ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
এছাড়া যৌতুকের দাবিতে এই তিন মাসে ২৩ নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে। এর মধ্যে ১০ জনকে হত্যা করা হয়েছে এবং তিনজন নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ১০ নারী।
১৭ নারী ও শিশু যৌন হয়রানি শিকার হয়েছেন। এই হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে দুজন পুরুষ নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতার কারণে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে ৩৩ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। এছাড়া এই তিন মাসে কারাগারগুলোতে অসুস্থতাজনিত কারণে অন্তত ১৬ বন্দি মৃত্যুবরণ করেছেন।
প্রতিবেদনে অধিকার দেশে মানবাধিকার রক্ষা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও নিরপেক্ষ তদন্তের সুপারিশ করেছে। সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দাবি ও জুলাই জাতীয় সনদের দ্রুত বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও গতিশীল করা। একইসাথে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও হেফাজতে নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা এবং গুম ও নির্যাতনবিরোধী সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া প্রতিবেদনে গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার, কারাগারে বন্দিদের ওপর নির্যাতন বন্ধ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, পোশাক শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ, অভিবাসী নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক হত্যাকাণ্ড ও ভারতের অবৈধ ‘পুশইন’ বন্ধে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


