রাজধানীর গুলশানে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের দুই ফ্ল্যাটে ক্রোক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মালামালের তালিকা তৈরির কাজ শেষ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিশেষ টিম। সোমবার দ্বিতীয় দিনের মতো তার বাসায় তালিকা তৈরি করে দুদক।
গুলশানের ৬৬ নম্বর রোডে নর্থওয়েস্ট বি ব্লকের ১১ নম্বর প্লটের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মোট ২৬৯ ধরনের পণ্যসামগ্রী জব্দ করেছে টিম। সংখ্যা হিসাবে যার পরিমাণ দেড় হাজার ছাড়িয়ে যাবে। যেখানে ফ্ল্যাট এ-৭ থেকে প্রায় ১,১৩৫ এবং ফ্ল্যাট বি-৭ থেকে প্রায় ৪০০ পণ্যসামগ্রী জব্দ করা হয়েছে।
দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজির আহমেদ জানান, দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে একটি টিম অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছে। আদালতের নির্দেশনা মেনে গতকাল ও আজ ইনভেন্টরির কাজ করেছে। অভিযানে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ফ্ল্যাটে প্রবেশ ও ইনভেন্টরির কার্যক্রমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাওয়া গেছে।
দুদক জানায়, এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ৩০০টির বেশি কোট, ৫৩২টির বেশি টাই, ৮টি ঘড়ির বক্স (এর মধ্যে রোলেক্সের ৪টি), প্রায় ১০০টি কামিজ, মুক্তার (পার্ল) গহনা, ঝাড়বাতি, বেড, সোফা, এসি, সিলিং ফ্যান, ট্রেডমিল, ফ্রিজ, স্যুটকেস, চেয়ার ও টেবিল ইত্যাদি। বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া রোলেক্স ঘড়ির ক্রয়রসিদ অনুযায়ী, প্রতিটি ঘড়ির দাম হতে পারে ১৪ হাজার থেকে ১৭ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার।
২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সাইফুজ্জামানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানের শুরুতে দুদক, সিআইডি ও এনবিআরের সমন্বয়ে সাত সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। টিম লিডারের বদলিজনিত কারণে টিম পুনর্গঠন হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমানের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের টিম অনুসন্ধান ও তদন্তকাজ পরিচালনা করছে।
অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছে দুদক। মামলায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী ও ইউসিবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামানকে আসামি করা হয়েছে। এর সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও আসামি করা হয়েছে। গত ২ জুলাই আদালতের আদেশের পর সাইফুজ্জামানের গুলশানের দুটি ফ্ল্যাটের সঠিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা, তদারকি এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়ন্ত্রণে নেয় দুদক।
এর আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি সাইফুজ্জামান চৌধুরীর (জাবেদ) নামে যুক্তরাজ্যে থাকা ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রোকের নির্দেশ দেন আদালত। আর ১৩ জানুয়ারি সাইফুজ্জামানের সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আট দেশে থাকা বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেন আদালত।
সম্পদ জব্দ ও স্ত্রীসহ দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান ও তার স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের নামে থাকা দেশে-বিদেশের ৫৮০টি বাড়ি/অ্যাপার্টমেন্ট/জমিসহ স্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দেন আদালত। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২২৮টি এবং যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে ৯টি। আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি ব্যাংক হিসাব ও বাংলাদেশের একটি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশও দেওয়া হয়েছে। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৩৯টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেন আদালত। এসব হিসাবে তার পাঁচ কোটি ২৬ লাখ ৮৩ হাজার ৮৫ টাকা রয়েছে।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ২৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে করা এক মামলায় চলতি বছরের মার্চে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার স্ত্রীসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন চট্টগ্রামের একটি আদালত। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের উপনির্বাচনে চট্টগ্রাম-১২ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন সাইফুজ্জামান। এরপর ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের রাতের ভোটের নির্বাচনে তিনি একই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হলে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালের ডামি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে আবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জাবেদ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

