ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপক নিয়োগকে কেন্দ্র করে অস্বচ্ছতা, বিধি লঙ্ঘন ও চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ উপেক্ষার প্রশ্নে নতুন বিতর্ক উঠে এসেছে। বিভাগের কো-অর্ডিনেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিঅ্যান্ডডি) কমিটির সভা থেকে চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মুমিত আল রশিদকে বের করে দিয়ে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ থাকা প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ঘটনায় সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত প্রার্থীর বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ, বিভাগে পাঠানো লিখিত আপত্তি এবং সিলগালা নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও সেগুলো সিঅ্যান্ডডি কমিটির আলোচনায়ই আনা হয়নি।
এ ঘটনায় বিভাগীয় চেয়ারম্যান ঢাবি প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে এর প্রতিকার চেয়েছেন। অন্যদিকে রেজিস্ট্রার দপ্তর জানিয়েছে, চেয়ারম্যানকে ছাড়া অনুষ্ঠিত সভায় কোনো বিধি লঙ্ঘন হয়নি। নিয়োগসংক্রান্ত রেজল্যুশন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের বিজ্ঞাপিত অধ্যাপক পদে প্রার্থীদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্দেশ্যে গত ৩০ মার্চ সিঅ্যান্ডডি কমিটির সভা হয়। বিভাগীয় চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মুমিত আল রশিদ নিজেও ওই পদে আবেদনকারী হওয়ায় নিজের বিষয়ে আলোচনার সময় সভা থেকে বিরত থাকেন। তবে অন্যান্য প্রার্থীর বিষয়ে তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে সভা পরিচালনা করেন এবং মতামত দেন।
সভায় আরেক প্রার্থী ড. আবু মুসা মো. আরিফ বিল্লাহর আবেদন যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তি না হওয়ায় সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠানো হয়। পরে রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে মৌখিকভাবে জানানো হয়, তিনি আবেদন করার যোগ্য।
এরপর ১২ মে একই বিষয়ে পুনরায় সভা ডাকা হলেও তা স্থগিত হয়। পরে ১৪ মে নতুন করে সিঅ্যান্ডডি কমিটির সভা হয়। কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার বিভাগীয় চেয়ারম্যানকে সভাকক্ষ ত্যাগের নির্দেশ দেন। চেয়ারম্যান বের হতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে কক্ষের বাইরে পুরো সময় বসিয়ে রাখা হয় এবং তার উপস্থিতিকে ‘বিধিবহির্ভূত’ উল্লেখ করা হয়। পরে সভায় সভাপতিত্ব করেন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. কে এম সাইফুল ইসলাম খান।
ঘটনার তিনদিন পর ১৭ মে বিভাগীয় চেয়ারম্যান রেজিস্ট্রারের কাছে চিঠি দিয়ে জানতে চান— চেয়ারম্যানকে বাদ দিয়ে সিঅ্যান্ডডি সভা আদৌ বৈধ ও স্বচ্ছ ছিল কি না এবং এমন সভার রেজুলেশন রেজিস্ট্রার দপ্তরে পাঠানো উচিত হবে কি না।
একই চিঠিতে চেয়ারম্যান ড. মুমিত আল রশিদ আরো অভিযোগ করেন। তিনি জানান, অধ্যাপক পদের অন্যতম প্রার্থী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আতাউল্যাহর ১৬টি গবেষণা প্রবন্ধের মধ্যে অন্তত ছয়টি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। ওই ছয়টি প্রবন্ধ বাদ দিলে তার গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০টি, যা অধ্যাপক পদে আবেদনের জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করে না।
তিনি জানান, চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ সংবলিত ই-মেইল বিভাগীয় অফিসের সরকারি ই-মেইলে আসে। সেখানে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রবন্ধ এবং যেসব থিসিস থেকে হুবহু নকল করা হয়েছে বলে অভিযোগ, তার তুলনামূলক নথিও সংযুক্ত ছিল। তিনি সভার আগেই সব সিঅ্যান্ডডি সদস্যকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু ই-মেইলই নয়, একই অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য ও প্রমাণসহ একটি সিলগালা প্যাকেট বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও সিঅ্যান্ডডি সভার আগেই বিভাগীয় অফিসে পৌঁছায়। চেয়ারম্যানের অভিযোগ, ওই প্যাকেট যাতে খোলা না হয় এবং অভিযোগগুলো সভায় আলোচিত না হয়, সে কারণেই তাকে সভাকক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে ১৫ জুলাই রেজিস্ট্রার দপ্তরে পাঠানো পৃথক মতামতপত্রে চেয়ারম্যান আবারও উল্লেখ করেন ড. আতাউল্যাহর বিরুদ্ধে ছয়টি গবেষণা প্রবন্ধে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ এলেও সেগুলো সিঅ্যান্ডডি কমিটির রেজুলেশনে কোনোভাবেই প্রতিফলিত হয়নি।
ড. মুমিত আল রশিদ জানান, অভিযোগসংবলিত ই-মেইল সভার কয়েকদিন আগেই সব সদস্যের কাছে অফিসিয়াল ই-মেইল থেকে পাঠানো হয়েছিল। একই সঙ্গে বিভাগে জমা পড়া সিলগালা প্যাকেট খুলে পর্যালোচনার অনুরোধ জানানো হলেও কমিটি সে বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
চিঠিতে তিনি আরো দাবি করেন, অধ্যাপক পদের বিজ্ঞাপনে যে পরিমাণ ইনডেক্সড বা ডিওআইযুক্ত গবেষণা প্রবন্ধের শর্ত ছিল, তা ড. আতাউল্যাহ পূরণ করেন না।
কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম হলো, আমি যদি চেয়ারম্যান হই এবং নিজেই যদি আবেদনকারী হই কিংবা আবেদনকারী যদি আমার নিকটাত্মীয় হন, তাহলে আমি সিঅ্যান্ডডি মিটিংয়ে থাকতে পারব না। যেহেতু এটি ওপেন পোস্ট এবং তিনি নিজেই প্রার্থী, তাই বিধি অনুযায়ী তাকে বলা হয়েছে যে, তিনি সভায় থাকতে পারবেন না। চেয়ারম্যান হিসেবে তার কোনো বক্তব্য থাকলে আগে দিতে পারেন, কিন্তু মিটিংয়ে উপস্থিত থাকতে পারবেন না।’
তিনি আরো দাবি করেন, সিঅ্যান্ডডি কমিটির চার সদস্যই চেয়ারম্যানকে সভাকক্ষ থেকে বের করে দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
তবে এ বক্তব্যের সঙ্গে চেয়ারম্যানের লিখিত অভিযোগের মিল নেই। সেখানে বলা হয়েছে, সভায় উপস্থিত দুজন সাবেক চেয়ারম্যান তার অনুপস্থিতির বিরোধিতা করলেও ডিন জোরপূর্বক তা নাকচ করেন।
নিজের দাবির পক্ষে অতীতের উদাহরণও তুলে ধরেছেন বিভাগীয় চেয়ারম্যান। তিনি লিখেছেন, এর আগে একই বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. মুহসিন উদ্দিন মিয়া এবং অধ্যাপক ড. তারিক জিয়াউর রহমান সিরাজী সিঅ্যান্ডডি সদস্য থাকা অবস্থায় নিজেরাও অধ্যাপক পদে পদোন্নতির প্রার্থী ছিলেন। তারা নিজ নিজ এজেন্ডার সময় নীরব থাকলেও অন্য প্রার্থীদের বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন এবং চেয়ারম্যান হিসেবেই সভা পরিচালনা করেন। ফলে বর্তমান ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে তিনি দাবি করেন।
চিঠিতে তিনি আরো অভিযোগ করেন, চৌর্যবৃত্তিতে অভিযুক্ত প্রার্থীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করতেই তাকে সভা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে তার আইনসম্মত অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে, সম্মানহানি ঘটেছে এবং তিনি অপমানিত বোধ করছেন। এ বিষয়ে প্রতিকার চাওয়ার অধিকার রয়েছে কি না, সেটিও রেজিস্ট্রারের কাছে জানতে চান তিনি।
এদিকে চেয়ারম্যানের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সিঅ্যান্ডডি কমিটির অন্য সদস্যরা ৪ জুন পাল্টা চিঠি দিয়ে দাবি করেন, ১৪ মে অনুষ্ঠিত সভাটি বৈধ ছিল এবং চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে কোনো নিয়ম লঙ্ঘিত হয়নি।
পরে দুই পক্ষের চিঠির পর্যালোচনা শেষে গত ৯ জুলাই রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠিতে জানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিজ্ঞাপিত পদে বিভাগীয় চেয়ারম্যান নিজে প্রার্থী হলে সেই পদের আবেদন বিবেচনার জন্য সিঅ্যান্ডডি কমিটির সভায় তিনি সভাপতি হলেও উপস্থিত থাকতে পারবেন না। একই সঙ্গে বলা হয়, ১৪ মে অনুষ্ঠিত সভায় চেয়ারম্যান উপস্থিত না থাকায় কোনো বিধিভঙ্গ হয়নি। তাই সিঅ্যান্ডডি কমিটির মতামতসহ অধ্যাপক নিয়োগের রেজুলেশন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর জন্য চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানানো হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার দপ্তরের প্রশাসন-১ শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার জি এম মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে জানি না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক অধ্যাপক বলেন, চেয়ারম্যান উপস্থিত থাকায় যদি ৩০ মার্চের সভা বৈধ হয়, তাহলে ১৪ মে’র সভা অবৈধ। আবার ১৪ মে’র সভা যদি বৈধ হয়, তাহলে প্রথম সভা অবৈধ। দুটি অবস্থান একসঙ্গে সত্য হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী চেয়ারম্যান কেবল নিজের এজেন্ডার সময় নিজেকে প্রত্যাহার করবেন, অন্য প্রার্থীদের বিষয়ে তিনি মতামত দিতে পারবেন এবং সভাপতিত্বও করবেন। এ ক্ষেত্রে যা হয়েছে, তা বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘চেয়ারম্যানকে জোর করে বের করে দেওয়া গুরুতর প্রশাসনিক অনিয়ম। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসি শামস উদ্দিন আহম্মদ লিটন বলেন, ‘সিলেকশন বোর্ড যদি লোয়ার বোর্ড হয়, তাহলে প্রো-ভিসি বিষয়টি দেখবেন, আর হায়ার বোর্ড হলে ভিসি দেখবেন। ফাইলটি যখন তাদের কাছে যাবে, তখন তারা সিদ্ধান্ত নেবেন।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



