ফিরে দেখা জুলাই বিপ্লব

মাদরাসা ছাত্রদের প্রতিরোধ, সারা দেশে নিহত ২৬

মাদরাসা ছাত্রদের প্রতিরোধ, সারা দেশে নিহত ২৬
ছবি: সংগৃহীত

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার মধ্যেই ২০২৪ সালের ২১ জুলাই সরকারি চাকরিতে নিয়োগে কোটা পুনর্বহালসংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। তবে রায়ের পরও আন্দোলন থামেনি। দেশব্যাপী কারফিউ চলাকালে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং গোলাগুলির ঘটনায় সরকারি হিসাবে ২৬ জন নিহত হন। বিভিন্ন বেসরকারি সূত্রে নিহতের সংখ্যা আরো বেশি বলে দাবি করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিন বাহিনীর প্রধান এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেন পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রাষ্ট্রপক্ষের করা লিভ টু আপিলের শুনানি শেষে ২১ জুলাই দুপুরে আপিল বিভাগ রায় ঘোষণা করে। রায়ে সরকারি চাকরিতে নিয়োগে হাইকোর্টের কোটা পুনর্বহালসংক্রান্ত রায় সামগ্রিকভাবে বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ৯৩ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য পাঁচ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য এক শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের জন্য এক শতাংশ কোটা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদ সাধারণ মেধাতালিকা থেকে পূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ অনুযায়ী দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির জন্য সরকারকে নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ।

বিজ্ঞাপন

রায়কে স্বাগত জানিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, শিক্ষার্থীরা আপিল বিভাগের রায়কে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। তবে তারা নির্বাহী বিভাগের প্রজ্ঞাপনকেই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করছেন। রায়ের পর শাটডাউন কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হলেও চার দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার সময় দেওয়া হয়। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল কারফিউ প্রত্যাহার, ইন্টারনেট পরিষেবা পুনরায় চালু, বিশ্ববিদ্যালয় ও আবাসিক হল খুলে দেওয়া এবং আন্দোলনের সমন্বয়কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি আন্দোলনে নিহতদের বিচারসহ আট দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে ২২ জুলাই গায়েবানা জানাজার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির কারণে ২১ জুলাই সারা দেশে পোশাক কারখানাসহ অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। ওই দিনও টানা চতুর্থ দিনের মতো কারফিউ ও ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। এদিন ভোরে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে ঢাকার পূর্বাচল এলাকা থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি দাবি করেন, আন্দোলনে আমি যাতে নেতৃত্ব বা নির্দেশনা দিতে না পারি, সে কারণেই হয়তো আমাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। এর আগে ১৯ জুলাই মধ্যরাতে রাজধানীর খিলগাঁও থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। পরে সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও হাসিব আল ইসলামকেও তাদের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে তৎকালীন ডিবি পুলিশ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

টানা কারফিউ ও সেনা মোতায়েন করে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, বাড্ডা, মিরপুর ও উত্তরা—এসব এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক নির্মমতা চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যাত্রাবাড়ীতে মাদরাসা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা গড়ে তুলেছিলেন ঐতিহাসিক প্রতিরোধ। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে ব্যবহার করা হয় সাউন্ড গ্রেনেড, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও প্রাণঘাতী অস্ত্র। পরবর্তী সময়ে ২১ জুলাইকে ‘মাদরাসা শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ দিবস’ এবং ‘যাত্রাবাড়ী প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।

২১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৪ জনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে ছিল নারায়ণগঞ্জের ছাত্র ইমাম হাসান তায়িম, কিশোর শুভ ও যুবক আব্দুল্লাহ আবিরসহ আরো অনেকে। একই দিন সিদ্ধিরগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১৯টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

সেদিন বিক্ষোভ দমন করতে সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন, কারফিউ জারি এবং মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ রাখে। টানা কয়েক দিন ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় জরুরি সেবা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সন্ধ্যার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নিহতদের তথ্য গণমাধ্যমকে দেওয়া বন্ধ করা হয়। একই দিন সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ৩১ জুলাই পর্যন্ত সব ধরনের পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেয়।

আন্দোলনের সমন্বয়কদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ৩০০ জনের বেশি নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে এবং সরকারের মিথ্যা বিবৃতি, সেনা-মিডিয়া ব্যবস্থাপনায় এ গণহত্যা আড়াল করা যাবে না। জাতিসংঘ, ইইউ ও যুক্তরাজ্য এ সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে।

২১ জুলাই রাতে গণভবনে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামরিক ও বেসামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার উপস্থিত ছিলেন।

তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, ২২ জুলাইও কারফিউ বহাল থাকবে। তবে দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হবে। ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে কারফিউ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য জেলায় জেলা প্রশাসকরা পরিস্থিতি অনুযায়ী নেবেন।

চলমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই পরিস্থিতিতেও এদিন রাজধানীর বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, কুড়িল ও মিরপুর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে কয়েক দিনের সহিংসতার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক মামলা হয়। এসব মামলায় পাঁচ দিনে ঢাকায় প্রায় ২০০ জনসহ সারা দেশে অন্তত ৫৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়াদের বেশিরভাগ ছিলেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন