সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড-ডে মিল’ বা স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় পচা বা কাঁচা কলা, নিম্নমানের রুটি ও নষ্ট সেদ্ধ ডিম বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম- অব্যবস্থাপনার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কঠোর নির্দেশনার প্রেক্ষিতে ‘গার্ডিয়ান কমিটি’ এবং তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আজ সোমবার মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সভাকক্ষে মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে এক জরুরি সভায় এ নির্দেশনা দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
শিক্ষার্থীদের খাদ্যনিরাপত্তা ও সেবার মান তদারকিতে বিদ্যালয় পর্যায়ে মায়েদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ‘গার্ডিয়ান কমিটিতে’ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ব্যবস্থাপনা কমিটির একজন সদস্য এবং তিনজন অভিভাবক মা সদস্য হিসেবে থাকবেন। এছাড়া মিড-ডে মিল কার্যক্রমে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম, গাফিলতি ও অনৈতিক কার্যক্রম উদঘাটনে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সভার পর মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচিতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য তিনি সোমবার জরুরি সভা আহ্বান করেন।
সভায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মিড-ডে মিল কার্যক্রম বাস্তবায়নে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছেন এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম, গাফিলতি বা মানহীনতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকারমূলক দায়িত্ব।
প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সভায় পাঁচ দফা নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন, মিড-ডে মিল কার্যক্রম বাস্তবায়নে অনুমোদিত নমুনা অনুযায়ী নির্ধারিত প্যাকেজিং কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে এবং পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো ধরনের পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য হবে না। সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পণ্য সরবরাহকারী চালক এবং জাতীয় পরিচয়পত্রধারী ব্যক্তি একই হতে হবে এবং সরবরাহের সময় বাধ্যতামূলকভাবে পরিচয় যাচাই করা হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো অবস্থাতেই সাব-কন্ট্রাক্ট বা উপ-ঠিকাদারি প্রদান করা যাবে না এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে স্বাক্ষরিত অঙ্গীকারনামা জমা দিতে হবে। মিড-ডে মিল কার্যক্রমের মান ও গুণগতমান নিশ্চিত করতে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও) এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিড়িইও) প্রতি মাসে দুইবার আকস্মিকভাবে কারখানা পরিদর্শন করবেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের খাদ্য নিরাপত্তা ও সেবার মান তদারকিতে বিদ্যালয় পর্যায়ে মায়েদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ‘গার্ডিয়ান কমিটি’ গঠন করা হবে। এ কমিটিতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটির একজন সদস্য এবং তিনজন অভিভাবক মা সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
সভায় প্রতিমন্ত্রী পরবর্তীতে মিড-ডে মিল কার্যক্রমে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম, গাফিলতি ও অনৈতিক কার্যক্রম উদঘাটনে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য পরিচালিত এ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। তদন্ত কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযোগসমূহ যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ সময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ সাখাওয়াৎ হোসেন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী, মিড-ডে মিলের প্রজেক্ট ডিরেক্টর সহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, পুষ্টিহীনতা ও ক্ষুধা প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম বড় বাধা—এই বাস্তবতা মাথায় রেখে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড-ডে মিল’ তথা স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু করা হয় গত বছরের সেপ্টেম্বরে। দেশের ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি বিদ্যালয়ে প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে এই খাবার দেওয়া হয়। এই কর্মসূচির লক্ষ্য শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বাড়ানো, ঝরে পড়া কমানো এবং শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা। খাবারের তালিকায় রয়েছে বানরুটি, সেদ্ধ ডিম, কলা, ইউএইচটি দুধ ও ফর্টিফায়েড বিস্কুট (বাড়তি পুষ্টিসমৃদ্ধ)। একসময় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের বিস্কুটজাতীয় খাবার দেওয়া হতো। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে গরম খাবার (খিচুড়ি) দেওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও পরে খাবারের ধরনে পরিবর্তন আনা হয়। স্কুল ফিডিং কর্মসূচি আওতায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিশুদের সপ্তাহে ৫ দিন দেওয়া হচ্ছে বনরুটি, ডিম ও কলা। ডিম-রুটি-কলা পেয়ে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা।
এখন শনি থেকে বৃহস্পতিবার ছয় দিন খাবার দেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী শনি, রবি, বুধ ও বৃহস্পতিবার বানরুটি ও সেদ্ধ ডিম দেওয়া হয়। সোমবার বানরুটি ও ইউএইচটি দুধ এবং মঙ্গলবার দেওয়া হয় ফর্টিফায়েড বিস্কুট ও কলা। ইউএইচটি (আলট্রা হাই টেম্পারেচার) হলো দুধ সংরক্ষণের পদ্ধতি। এই দুধ প্যাকেট খুলে সরাসরি পান করা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতিটি ডিম ১৪ টাকা, কলা ১০ টাকা, বানরুটি ২৫ টাকা, দুধ ২৯ টাকা ও বিস্কুট ১৯ টাকা ধরে হিসাব করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, বানরুটি, কলা ও ডিমের বিতরণ পর্যায়ে অনিয়ম হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে এসব খাবার সংগ্রহ করে সরবরাহ করা হয় এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো এজেন্টদের মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন করে। এ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দামে বরাদ্দ বেশি হলেও কোথাও কোথাও ১৪-১৫ টাকায় বানরুটি কেনা হয়। ডিম অনেক আগে থেকেই সেদ্ধ করে রাখা হয়। আবার কলা কাঁচা বা পচাও থাকে। এসব খাবার খেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে স্কুলশিক্ষার্থী অসুস্থ হওয়ার ঘটনাও ঘটে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

