ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি (বাস র্যাপিড ট্রানজিট) প্রকল্প দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বল তার কারণে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হলেও এটি বাতিল না করে দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্স (বিআইপি)।
সংগঠনটির পরিকল্পনাবিদরা বলেছেন, এটি কেবল একটি পরিবহন প্রকল্প নয়, বরং সমন্বিত নগর উন্নয়ন ও আঞ্চলিক বিকেন্দ্রীকরণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিআরটি চালুর মাধ্যমে যানজট, যাতায়াত সময়, জ্বালানি ব্যয় ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি গাজীপুর ও আশপাশের অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও নগর উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরির কথা তুলে ধরা হয়। একইসঙ্গে বিআরটি কোম্পানিকে শক্তিশালী করে পেশাদার পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।
সোমবার রাজধানীর বিআইপি কনফারেন্স হলে ‘গণপরিবহন নির্ভর নগর: ঢাকা-গাজীপুর বিআরটির ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রকল্পটির অবকাঠামোগত কাজের মাত্র তিন শতাংশ বাকি থাকলেও এটি চালু না করে উল্টো ‘প্রোপাগান্ডা’ ছড়ানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বিআরটি করিডোর ভেঙে অন্য যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। ভাঙতে গেলেও স্টেশন, র্যাম্প ও এস্কেলেটর অপসারণ এবং ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি চালু হলে যাত্রাসময় ৩০ শতাংশ কমবে। একই সঙ্গে করিডোর ও আশপাশের সড়কে রিকশা ও ছোট যানবাহনের ব্যবহার কমবে, জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে এবং নারী ও বয়স্কদের জন্য নিরাপদ ও আরামদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত হবে।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক ও পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, আমাদের কিছু প্রস্তাব আছে বিআরটি নিয়ে সেগুলো হলো, আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে ডেডিকেটেড লেনসহ বেসিক বিআরটি চালুর দাবি জানাই। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করে বিআরটি বোর্ড পুনর্গঠন, গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোকে ঘিরে টিওডি প্রকল্প নেওয়া এবং ভবিষ্যতে গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান অনুযায়ী বিআরটি নেটওয়ার্ক আরও সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এছাড়া ঢাকা-গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের জন্য সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বিআইপি প্রণীত ন্যাশনাল স্পেশাল প্ল্যানিং ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী বিভাগীয় ও বড় জেলা শহরগুলোতে পর্যায়ক্রমে বিআরটি চালুর সুপারিশ করা।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে শুরু হওয়া ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প ২০১৬ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ১৪ বছরেও তা চালু হয়নি। বর্তমানে প্রকল্পটির অব্যবহৃত অর্থ দিয়েই বাস কিনে বেসিক বিআরটি চালু করা সম্ভব। তুলনামূলক উন্নত বাস কিনতে অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা এবং আধুনিক বৈদ্যুতিক বাস চালু করতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে বিআরটি একটি কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৪ সালে ব্রাজিলের কুরিচিবা শহরে চালুর পর বর্তমানে বিশ্বের ১৯১টি শহরে বিআরটি চালু রয়েছে। তুলনামূলক কম খরচ, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতে সহজ সম্প্রসারণের সুযোগ থাকায় বিআরটির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। ২০০০ সালের পর বিশ্বে বিআরটির বিস্তার বেড়েছে ৩৮৩ শতাংশ।
আরও বলা হয়েছে, আধুনিক বিআরটির পাঁচটি মূল বৈশিষ্ট্য হলো ডেডিকেটেড লেন, প্রিপেইড বোর্ডিং, প্ল্যাটফর্ম সমতলে যাত্রী ওঠানামা, উচ্চ ধারণক্ষমতার আর্টিকুলেটেড বাস এবং ভূমি ব্যবহার ও পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়। বিআরটি মেট্রোরেলের প্রায় অর্ধেক যাত্রী বহন করতে পারে, তবে এর নির্মাণ ব্যয় মেট্রোরেলের প্রায় এক-দশমাংশ। বিআইপি অভিযোগ করে, প্রকল্পটিকে পরিবহনসেবা হিসেবে না দেখে অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে পরিণত করা হয়েছে। তারা জানায়, প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ফ্লাইওভার ও র্যাম্প নির্মাণ করা হলেও বাস কেনার কাজ আটকে রাখা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিআরটি কোম্পানিকে শুরু থেকেই দুর্বল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় বিআরটি কোম্পানিকে শক্তিশালী করা, বোর্ড পুনর্গঠন করে সেখানে পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, জনপ্রতিনিধি ও পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির সাবেক সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দেশে বাসভিত্তিক গণপরিবহন দুর্বল হওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে রিকশা, অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ২০০৫ সালের স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানে ঢাকার যানজট সমাধানে বিআরটির প্রস্তাব থাকলেও প্রায় দুই দশকেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বরং শুরু থেকেই প্রকল্পটিকে সীমিত ও দুর্বল করা হয়েছে।
তার অভিযোগ, বিআরটির মূল ধারণা ছিল ডেডিকেটেড বাস লেন। কিন্তু পরে সেখানে ব্যক্তিগত গাড়ির লেন যুক্ত করায় প্রকল্পের ব্যয় ও জটিলতা বেড়েছে। একই সংস্থা আগে বিআরটিকে সম্ভাবনাময় বললেও এখন সেটিকে অকার্যকর বলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিআইপির প্রস্তাবণাগুলোর মধ্যে রয়েছে— আগামী ৬- ১২ মাসের মধ্যে ডেডিকেটেড লেনসহ ন্যূনতম চালু করা; আগামী ৬ মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের ও বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে BRT বোর্ড পুনর্গঠন করা; ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোর জন্য এখনই Transit Oriented Development (TOD) প্রকল্প নেয়া; গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান এর প্রস্তাব অনুযায়ী এ বিআরটি-কে ভবিষ্যতে আরো সম্প্রসারণ করার প্রকল্প নেয়া; ঢাকা-গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জ নগর অঞ্চলের জন্য বিশেষ সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা করে একাধিক BRT প্রকল্প গ্রহণ করা; বিআইপি কর্তৃক প্রণীত National Spatial Planning Framework (SPF) এর আলোকে দেশের বিভাগীয় ও বড় জেলা শহরগুলোতে পর্যায়ক্রমে বিআরটি চালু করা।
বিআইপির সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসানের সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান, গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন সংগঠনের সভাপতি প্রকৌশলী শামসুল হক ও বিআইপি সদস্য পরিকল্পনাবিদ মুনতাসির মামুন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন বিআইপির বোর্ড সদস্য (একাডেমিক এফেয়ার্স) পরিকল্পনাবিদ শুভ কান্তি পোদ্দার।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

