এবারের অমর একুশে বইমেলার দ্বিতীয় দিনেই শিশুরা পেয়েছে ‘শিশু প্রহর’। মেলায় শিশুদের আনন্দেরও যেন শেষ ছিল না। রঙিন বই, খেলনা ও প্রতিযোগিতাÑনানা আয়োজনের ভিড়ে ছোটদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে ছুটির দিনের বইমেলা। গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ছিল শিশু প্রহর। এ প্রহরে ছিল শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্ব। সেই সঙ্গে শিশু কর্নারে কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার মাতিয়ে রাখে শিশু-কিশোরদের। দিনব্যাপী থিয়েটারটির গল্প পাঠের আসর, ইন্টারেক্টিভ পাপেট শো, পুতুল নাটক, অপু ও দিপুর গল্প এবং বায়োস্কোপ প্রদর্শন শিশুদের জন্য ছিল বেশ আনন্দের।
দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট একটি বায়োস্কোপ ঘিরে ভিড় করছে শিশুরা। কৌতূহলী চোখে তারা একে একে চোখ রাখছে বায়োস্কোপের ছোট গোল জানালায়। ভেতরে কী আছেÑসেই রহস্য জানতেই তাদের এত আগ্রহ।
প্রথমবার বায়োস্কোপ দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় আট বছরের ইউসুফ আলম আয়ান। বাসাবো থেকে মামা রাসেল সরকারের সঙ্গে মেলায় এসেছে সে। বায়োস্কোপ দেখার পর আয়ান বলে ওঠে, ‘থ্যাংক ইউ মামা’। এরপর কেমন লাগল এবং কী দেখল জানতে চাইলে আয়ান আমার দেশকে বিস্ময়ে বলে ওঠে, ‘আমি প্রথমবার দেখলাম। এটা বায়োস্কোপ। এর ভেতর ঘুড়ি উড়ছে, চরকি ঘুরছেÑখুবই সুন্দর! আগে কখনো দেখিনি।’
বইমেলায় এসে কী কী কিনেছ জানতে চাইলে আয়ান মামার হাতে থাকা বই দেখিয়ে দেয়। এরপর বলল, ৪০ হাদিসের বই কিনলাম। বইয়ের নাম ৪০ হাদিস; শিশুতোষ গল্প।
আয়ানের মতো অনেক শিশু বায়োস্কোপ দেখে আনন্দে মেতে ওঠে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক শিশু নার্সারির শিক্ষার্থী মানহা জুনাইরা বলে, ভেতরে মনে হলো ছবিগুলো নাচছে। গানের মতো নাচছিল। জুনাইরা এসেছে বাবা সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। তার ফুফাতো বোন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া তাহরিমা আরিশাও তাদের সঙ্গে আসে। আরিশা বায়োস্কোপ সম্পর্কে আমার দেশকে বলে, ‘এটা কি ছোট একটা সিনেমা? এরকমই মনে হলো।’
আট বছরের আরিশা বায়োস্কোপ দেখে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানায়, ‘আমি ভেবেছিলাম ভেতরে শুধু ছবি থাকবে, কিন্তু মনে হলো সবকিছু নড়ছে! খুবই সুন্দর। এবার প্রথমবার মামার সঙ্গে এসেই এটা দেখলাম।’
শিশুদের এমন বিস্ময়ভরা প্রশ্ন শুনে বায়োস্কোপ পরিচালনার কাজে থাকা মোহাম্মদ রবিনও হাসিমুখে বুঝিয়ে দিচ্ছেন- এটি অনেক পুরোনো দিনের বিনোদন, যেখানে ছবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হয়।
কিছু শিশু আবার বায়োস্কোপ দেখে নিজের মতো করে গল্প বানিয়ে ফেলছে। কেউ বলছে সেখানে পাখি উড়ছে, কেউ বলছে মেলায় নাগরদোলা ঘুরছে। তাদের কল্পনার জগৎ যেন আরো রঙিন হয়ে উঠছে এ ছোট্ট যন্ত্রকে ঘিরে।
মেলায় সন্তানকে নিয়ে আসা অভিভাবকদেরও বেশ ভালো লাগছে এই দৃশ্য। সাইফুল ইসলাম বলেছেন, স্মার্টফোন আর ট্যাবের যুগে এমন পুরোনো বিনোদন দেখলে শিশুরা নতুন অভিজ্ঞতা পায়। তিনি বলেন, আমাদের ছোটবেলায় গ্রামে বায়োস্কোপ দেখতাম। আজ আমার সন্তানও সেটা দেখছে। ওকে দেখাতে পেরে ভালোই লাগল।
কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা আসাদুজ্জামান আশিক আমার দেশকে বলেন, পারস্পরিক বন্ধুত্ব, একে অপরকে সহযোগিতা করা, ঝগড়া থেকে বিরত থাকা এবং বই পড়ার বার্তা নিয়েই পুতুল নাটক অপু ও দিপুর গল্প প্রদর্শন করা হচ্ছে। আর সকাল থেকে পাঠের আসর, ইন্টারেক্টিভ পাপেট শো, পুতুল নাটক- অপু ও দিপুর গল্প এবং বায়োস্কোপ প্রদর্শন চলছে। এটি চলবে প্রতিদিনই।
শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি পাঠক-দর্শকদের উপস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, মানুষের উপস্থিতি বেশ ভালো। ভেবেছিলাম রমজান হওয়ায় কম হবে। কিন্তু ভালোই হলো। দিন দিন লোকসমাগম আরো বাড়বে বলে আশাবাদী তিনি।
শিশু-কিশোরদের আনন্দ শুধু থিয়েটার ঘিরেই ছিল না। ছিল তুমুল প্রতিযোগিতাও। সকাল সাড়ে ৯টায় বইমেলা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। এতে ক-শাখায় ৫৪০ জন, খ-শাখায় ৬২০ জন এবং গ-শাখায় ২৪৫ জন প্রতিযোগী অংশ নেয়। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ।
এক ঘণ্টা পরই শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় এই প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্ব। এতে ক-শাখায় ২১০ জন, খ-শাখায় ২৭৯ জন এবং গ-শাখায় ৯৭ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে।
দুপুরের পর মুনতাহা আফনানের সঙ্গে বই মেলায় আসেন পাঁচ বছরের শিশু আনাইশা আসমিন ফিহা। তারা বনশ্রী থেকে এসেছেন। ফিহা আসার পরই কাকতাড়ুয়া কিনেছেন। সেই সঙ্গে কিনেছেন শিশুতোষ বই পান্তাবুড়ি, পেচা ও ব্যাঙ।
বাবুই প্রকাশনীর স্টলের জান্নাত বিনতে আনিস আমার দেশকে বলেন, আমাদের স্টলের কাজ এখনো শেষ হয়নি। দুপুর ১২টার পর থেকে বিকাল পর্যন্ত তিনটি বই বিক্রি করলাম। আশাবাদী মেলা জমবে এবার। যে রকমটা সবাই ভাবছিল সে রকম হবে না। এবারও মেলা জমবে।
রিফাইন পাবলিকেশনের মার্কেটিং ম্যানেজার আয়াত আহমেদ সজল আমার দেশকে বলেন, কালকে পাঁচ থেকে সাতটি বই বিক্রি করেছি। আজকে তিন থেকে চারটি। প্রথমদিকের তুলনায় মানুষ ভালোই আসছে। তবে গতবারের তুলনায় কম হলেও প্রত্যাশার তুলনায় বেশি।
মেলার দ্বিতীয় দিন বিকালে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ : ফরিদা পারভীন’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোহাম্মদ রোমেল। আলোচনায় অংশ নেন ড. আবু ইসহাক হোসেন। সভাপতিত্ব করেন কবি ও দার্শনিক ফরহাদ মজহার। ফরহাদ মজহার বলেন, ভাষার মাসে শিল্পী ফরিদা পারভীনকে নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। লালনের গানের ভাষায় ভাবের যে শক্তি, তা ফরিদা পারভীনের হৃদয়কে স্পর্শ করেছিল। ফরিদা পারভীনের গায়কীর মধ্যদিয়ে লালন আবার নতুন করে আমাদের কাছে হাজির হয়েছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

