ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) এক বছর পূর্তি উপলক্ষে নিজেদের কার্যক্রমের হিসাব তুলে ধরেছেন নির্বাচিত নেতারা। জবাবদিহির অংশ হিসেবে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে পরিবহন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গবেষণা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, শিক্ষার্থীদের আইনি সহায়তা, ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতে গত এক বছরে পরিচালিত ১,০০০ কার্যক্রমের তথ্য তুলে ধরা হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার ডাকসু ভবনের সামনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সহসভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এসএম ফরহাদ এক বছরের কার্যবিবরণীর বিভিন্ন দিক সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন। এ সময় ডাকসুর অন্যান্য নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় নির্বাচনের আগে দেওয়া ইশতেহারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে স্বীকার করেছেন ডাকসু নেতারা। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বিএনপি সরকারের অসহযোগিতার কারণে এসব উদ্যোগের একটি অংশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
অনুষ্ঠানে সাদিক কায়েম দায়িত্ব পালনের সময় ডাকসুর অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে ক্যাম্পাসকে সহিংসতামুক্ত রাখাকে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এবারের ডাকসুর সবচেয়ে বড় অর্জন সহিংসতামুক্ত ক্যাম্পাস। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর বছরজুড়ে কাউকে এক সেকেন্ডের জন্যও ক্ষমতা প্রদর্শন করিনি।
আবাসন সংকট নিরসনে ডাকসুর নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে সাদিক কায়েম বলেন, আবাসন সমস্যা সমাধানে ২,৮৪১ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নারী শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা বাড়াতে চীনের অর্থায়নে ২৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১,৫০০ আসনের নতুন একটি হল নির্মাণের অনুমোদন করা হয়েছে বলেও জানান ভিপি। তিনি বলেন, হলটির জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আগামী এক বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ এগোচ্ছে।
হলে অছাত্রদের অবস্থান বন্ধে নতুন সিট নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান সাদিক কায়েম। তার ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে বুয়েটের আদলে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সিট বরাদ্দের বিষয়ে প্রশাসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এছাড়া ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি হলের জরুরি সংস্কারের জন্য অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের জন্য প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের জন্য ৮১ লাখ টাকা এবং শহীদুল্লাহ হলের জন্য ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ আনা হয়েছে।
পরিবহন ও অবকাঠামো
পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সেবার পরিসর বাড়াতে পাঁচটি নতুন হল ও ১০টি ভবন নির্মাণ, শাটল সার্ভিস চালু এবং পরিবহন সেবার উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান ডাকসু নেতারা। ক্যাম্পাসে চলাচলকারী বিভিন্ন বাহনের চালকদের তালিকা, নির্ধারিত পোশাক ও ভাড়ার চার্ট তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা।
ক্যাম্পাসের আটটি গেটে ট্রাফিক সহায়তার জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সঙ্গে সমন্বয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে সরকার পরিবর্তনের পর ওই প্রকল্প স্থগিত করে রাখা হয়েছে বলে জানান তারা। এছাড়া রেজিস্টার্ড রিকশা চালু, পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ এবং পুরোনো যানবাহন নিলামে দিয়ে দুটি মিনিবাস ও দুটি মাইক্রোবাস কেনার উদ্যোগ অনুমোদনের পরও বাস্তবায়ন হয়নি বলে দাবি করেন ডাকসু নেতারা।
আইনি সহায়তা সম্প্রসারণ
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবায় মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়ন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানান ডাকসু নেতারা। এক বছরে চার শতাধিক শিক্ষার্থীকে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ডাকসু ভিপি।
এছাড়া ১৩টি হলের রিডিংরুমে এসি স্থাপন ও আধুনিকায়ন, মাতৃত্বকালীন ছুটি, ডে-কেয়ার ও জিমনেসিয়াম স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান সাদিক কায়েম। ব্রেস্টফিডিং রুম ও ডে-কেয়ারের জন্য বাজেট আনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে ডিএমপি কমিশনারের কাছে বিভিন্ন করণীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী শতাধিক শিক্ষার্থীকে আইনি সহায়তা দেওয়া এবং কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তারা।
শিক্ষা, গবেষণা ও শিক্ষক মূল্যায়ন
শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানান ডাকসু নেতারা। কমনরুম আধুনিকায়ন এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে এ সময়।
শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর বিষয়ে ডাকসু নেতারা জানান, বিষয়টি এসএমটি ও একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদনের পর সিন্ডিকেটে উত্থাপন করা হয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো এটি বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ কারণে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ডাকসুর নিজস্ব উদ্যোগে শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য অনলাইন সাইট চালু করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি সম্প্রসারণ, বিভিন্ন লাইব্রেরিতে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এবং রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের সেবা সহজীকরণেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অ্যালামনাইদের বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার কথাও তুলে ধরেন ডাকসু নেতারা।
ক্রীড়া, খাদ্য ও পরিবেশ
ক্রীড়া খাতে শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রের আধুনিকায়ন এবং বিভিন্ন ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজন করা হয় হয়েছে বলে জানান ডাকসু নেতারা। এছাড়া ক্যাফেটেরিয়া ও ক্যান্টিনের খাবারের মান উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
টিএসসিতে স্বল্পমূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলেও স্বল্পমূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রিসহ কয়েকটি উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানান তারা।
গ্রিন ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে ডাস্টবিন স্থাপন, পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সুফিয়া কামাল হলের ঝুঁকিপূর্ণ ফুটওভার ব্রিজ ও একটি যাত্রী ছাউনি অপসারণ এবং আরেকটি যাত্রী ছাউনি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংস্কৃতি, প্রকাশনা ও সামাজিক কার্যক্রম
সংস্কৃতি ও প্রকাশনা খাতে বিষয়ভিত্তিক ৩০টির অধিক সাহিত্য, সাময়িকী ও বই প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান ডাকসু নেতারা। হল সংসদ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম সমন্বয়, জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ দিবস উদযাপন এবং জুলাই বিপ্লবের বার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
এছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ডাকসুর অবস্থান তুলে ধরা, বিভিন্ন রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করা হয়। ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তুলে ধরেন ডাকসু নেতারা।
আটকে আছে যেসব উদ্যোগ
এক বছরে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের পাশাপাশি বেশ কিছু উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানান ডাকসু নেতারা। সাদিক কায়েম বলেন, সব হলে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন, এআই ও প্রোগ্রামিং প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, সার্টিফিকেশন সহায়তা, ইনোভেশন হাব ও জব ফেয়ার আয়োজনের মতো উদ্যোগ আটকে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহযোগিতায় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সংস্কার প্রকল্প ও ডিজিটাল সার্ভের কাজও বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় এএফ রহমান হলের প্রবেশ গেইট, ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া সংস্কার, পুকুরপাড় বাঁধাই, ওয়াকওয়ে, লাইটিং ও সৌন্দর্যবর্ধনসহ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানান তারা।
এছাড়া রেজিস্টার্ড রিকশা, পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ এবং পুরোনো যানবাহন নিলামে দিয়ে নতুন যানবাহন কেনার উদ্যোগ অনুমোদনের পরও বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানান ডাকসুর ভিপি ও জিএস। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বিএনপি সরকারের অসহযোগিতা অভিযোগ তুলে ধরেন তারা।
কার্যবিবরণী উপস্থাপনের শেষ পর্যায়ে ডাকসু নেতারা বলেন, দায়িত্ব পালনের এক বছরে ক্যাম্পাসের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে এক দিনের জন্যও ক্লাস বা পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়নি। পাশাপাশি ডাকসু ভবনের ব্যাপক সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তারা।
ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, আগে ছাত্র সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতিতে হল সংসদ ও কেন্দ্রীয় সংসদের মধ্যে বিভাজন ছিল। বর্তমান ডাকসু নির্বাচিত হওয়ার পর ক্যাম্পাসের পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের দায়িত্ব পালনকালে ক্যাম্পাসে সহিংসতা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ক্ষমতার পালাবদলের পর নানা চেষ্টা করেও বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে কোনো ছাত্র সংগঠন দখল নিতে পারেনি।
ডাকসু জিএস এস ফরহাদ বলেন, এক বছরে দুবার ডাকসুর সব সদস্য ও হল সংসদের সদস্যরা একসঙ্গে বসে নিজেদের কার্যক্রমের বিবরণ দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব, জবাবদিহি ও কল্যাণকেন্দ্রিক কার্যক্রমের পাশাপাশি যেসব উদ্যোগ প্রশাসনিক অনুমোদন ও সরকারি সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল, সেগুলো বাস্তবায়নে এখনো কাজ করছি। সামনেও আমাদের কাজ অব্যাহত থাকবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

