রাজধানীর দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ জামতলা এলাকায় নিজ বাসায় খুন হওয়া নারী চিকিৎসক সারাহ রোকসানা পিনু হত্যা মামলায় তার স্বামী মো. সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এ ঘটনার তদন্তে পারিবারিক বিরোধসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সোহেলের বিরুদ্ধে আদালতে রিমান্ড আবেদনও করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার ঢাকার দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ এলাকায় দন্তচিকিৎসক পিনু খুন হন।
ওই হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্তে নেমে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয় নিহত সারাহ রোকসানা পিনুর স্বামী সোহেল রানাকে। পিনুর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তার বোন সারাহ সুলতানা পলি শুক্রবার অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে এ মামলা করেন। নিহতের বোন পলি সাংবাদিকদের জানান, পিনু ফোনে কান্না করে বলতেন, সোহেল তাকে মেরে ফেলবে।
শনিবার সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণখান থানার এসআই হাবিবুর রহমান। ঘটনার পর পুলিশ জানিয়েছিল, বাসার গ্রিল কেটে ভেতরে ঢুকে দুর্বৃত্তরা ওই নারীকে হত্যা করে এবং ঘরের জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। তবে জানালার যে অংশে গ্রিল কাটা হয়, সেই জানালার ভেতরের অংশের বারান্দায় একটি জুতার ছাপ পান সিআইডির সদস্যরা। এরপর বাসায় পাওয়া একজোড়া জুতার ছাপের সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায়। ওই জুতা ছিল সোহেল রানার। পরে পুলিশ সোহেল রানাকে তাদের হেফাজতে নেয়।
পুলিশ সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন করে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাৎ আসামিকে কারাগারে পাঠিয়ে সোমবার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
পিনুর বড় বোন পান্না জানান, পিনুর স্বামী সোহেল রানা উত্তরা পশ্চিম থানার ৭ নম্বর সেক্টরে একটি ডেভেলপার কোম্পানিতে সহকারী ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করেন। সোহেল পরকীয়া করতেন। এমনকি পিনুর মেয়ের বান্ধবীর মাকেও তিনি প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে পিনু সংসারে টিকে ছিলেন। আমরা সোহেলের শাস্তি চাই।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে পিনু ছিলেন সবার ছোট। পিনুর ষোলো বছরের ছেলে সালেহীন ওহি মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। দশ বছরের মেয়ে হাসিন ওয়ামী তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই হাবিবুর রহমান বলেন, ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে নিহত নারীর স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খুনের কারণ এখনো শনাক্ত করতে পারিনি। জিজ্ঞাসাবাদ করলে খুনের কারণ জানা যাবে।
তিনি আরও জানান, ঘটনার সময় সকাল ১১টা ২০ মিনিট থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। যে জানালার গ্রিল কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়, সেটি অন্য একটি ছাদের সাথে লাগানো। ওই ছাদ বেশ প্রশস্ত ও খোলা। ওই সময় দিনের আলো ছিল। আশপাশের বাড়িতে জিজ্ঞাসা করে জানা যায়, কেউ ওই সময় ঘটনাস্থলের জানালার পাশে কোনো ব্যক্তিকে গ্রিল কাটতে দেখেননি বা গ্রিল কাটার শব্দ পাননি। জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল রানা তার স্ত্রীর প্রতি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
পুলিশ জানায়, নিহত নারীর বাসায় পাওয়া একজোড়া জুতার ছাপের সঙ্গে তার মিল খুঁজে পান সিআইডির সদস্যরা। ওই জুতা সোহেল রানা নিজের বলে স্বীকার করেন। তবে জানালার গ্রিলের বাইরের অংশের ছাদে কোনো জুতা বা পায়ের ছাপ পাওয়া যায়নি।
পাশের কক্ষের জানালার গ্রিল কাটা ছিল এবং বাসা থেকে প্রায় ৮ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ৫০ হাজার টাকা খোয়া যায়। নিহতের মেয়ে হাসিন ওয়ামী পুলিশকে জানিয়েছে, তার মা প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় বিছানা থেকে উঠে তার ইউনিফর্মের দিকে তাকাতেন এবং তারপর ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে আবার বিছানায় ঘুমাতে যেতেন। কিন্তু ঘটনার দিন তার মা বিছানা থেকে ওঠেননি। তার বাবা তাকে বলেছিলেন, তার মা পরে উঠে দরজা লাগিয়ে দেবেন। সেদিন স্কুলে যাওয়ার আগে ওয়ামী তার মায়ের কোনো নাড়াচাড়া বা কথা বলতে শোনেনি বা দেখতে পায়নি।
মামলার এজাহারে উল্লেখ আছে, বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ২০ মিনিটের দিকে সোহেল রানা পিনুকে একা বাসায় রেখে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে অফিসে যান। কেউ আনতে না যাওয়ায় বিকেলে ওয়ামী বাসায় চলে আসে। বাসায় এসে দেখে ঘরের দরজা খোলা, তবে চাপানো। এজাহারে আরও বলা হয়, ওয়ামী দেখতে পায় তার মা খাটের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন। তার মুখের ওপর বালিশ রাখা। মাকে ডাকাডাকি করে কোনো শব্দ না পেয়ে মুখের ওপর থেকে বালিশ সরিয়ে দেয়। মায়ের হাত-পা ঠান্ডা ও শ্বাস বন্ধ আছে বুঝতে পেরে বাসা থেকে স্কুলে যায়। প্রিন্সিপালের মোবাইল ফোন থেকে তার বাবাকে ঘটনা জানায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


