রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের মত বিএনপিতে যোগ্য লোক রয়েছে: নাহিদ ইসলাম

সংসদ রিপোর্টার

রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের মত বিএনপিতে যোগ্য লোক রয়েছে: নাহিদ ইসলাম
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এনসিপির সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম বলেছেন, একজন দুর্নীতিবাজ, মিথ্যুক ও গণহত্যার দোসর এখনো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। গাধাকে দিয়ে হাল চাষ করিয়ে কোনো বাহাদুরি নেই। এটা সরকারের দেউলিয়াত্ব। নির্বাচিত সরকার বিএনপি চাইলে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারে। বিএনপিতে সে ধরনের যোগ্য ও আস্থাভাজন লোক রয়েছেন।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

সংসদে রাষ্ট্রপতির দেওয়া ভাষণ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রপতির বক্তব্য আমি শুনিও নাই, পড়িও নাই। তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগকে আমরা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। স্পষ্টভাবে বলেছিলাম রাষ্ট্রপতির অপসারণ ও গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রপতির কোনো অধিকার নেই বঙ্গভবনে থাকার, এখানে এসে বক্তব্য দেওয়ার।

রাষ্ট্রপতির ‘কুর্কীতি’ তুলে ধরার কথা জানিয়ে জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির সৈনিক নাহিদ ইসলাম বলেন, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের নিশ্চিত করা; পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ থেকে আওয়ামী লীগকে ক্লিনশিট দেওয়া এবং ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিন সরকারের সময় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে হওয়া দুর্নীতির মামলা বাতিল করতে তাকে দুদকের কমিশনার করা হয়েছিল। এমন একজন ব্যক্তিকে বিএনপি সরকার রাষ্ট্রপতি হিসেবে এখনো মেনে নিচ্ছে- তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ইসলামী ব্যাংককে এস আলমের হাতে তুলে দেওয়ার কারিগর। এস আলম দুই কোটি আমানতকারীকে পথে বসিয়েছিল। জুলাই গণহত্যার সময় তার (রাষ্ট্রপতি) ভূমিকা, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা সবকিছু আমরা জানি। আমাদের দুর্ভাগ্য, একজন দুর্নীতিবাজ, অপদার্থ, মিত্থ্যুক, গণহত্যার দোসর এখনো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।

রাষ্ট্রপতির কাছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের স্থিতিশীলার স্বার্থে তারা সে সময় সরকারে গিয়েছিলেন। তখনকার সময়, আর বর্তমান সময় এক নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে আমাদের সামনে দুইটা অপশন ছিল। আমরা বলেছিলাম জাতীয় সরকার করতে হবে। সেই প্রস্তাব বিএনপি নাকচ করে দিয়েছে। আরেকটা অপশন ছিল ক্ষমতা আর্মির হাতে তুলে দেওয়া। যদি আমরা সেই দিকে আগাতাম আজকে তারা (সরকারি দল) এখানে বসতে পারতাম কিনা সেটা সন্দেহ আছে।

'৭২-এর সংবিধানকে '৭১-এর সঙ্গে বিএনপি কোন বিবেচনায় মেলাচ্ছে, সেই প্রশ্ন তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ বাহাত্তরের সংবিধানকে একাত্তরের সঙ্গে মিলিয়েছিল। আমরা এর বিরোধিতা করেছি, বিএনপির বহুনেতাও বিরোধিতা করেছিল। মাওলানা ভাসানী, বদরুদ্দিন উমরসহ আরও অনেকে বিরোধিতা করেছিলেন। শুধু জামায়াত ৭২-এর সংবিধানের বিরোধিতা করেছিল বলেই কী বিএনপি আজ আওয়ামী লীগের অবস্থানে চলে গেছে?

বাহাত্তরের সংবিধানের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ওই সংবিধান স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রচনা করেননি। '৭২-এর সংবিধান রচনা করেছিল ৭০-এর নির্বাচনে আইয়ুব খানের এলএফওয়ের অধীনে যারা নির্বাচিত হয়েছিল, যা হয়েছিল পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনা করার জন্য। তখন থেকেই সংবিধানের সমালোচনা শুরু হয়েছিল।

নাহিদ বলেন, বাহাত্তরের সংবিধান উত্তরাধিকার সূত্রে অগণতান্ত্রিক। সে সময় শেখ মুজিবকে সামনে রেখে এ সংবিধান তৈরি করা হয়েছিল। স্বৈরতন্ত্রের বীজ বাংলাদেশে বাহাত্তরের সংবিধানে বপন করা হয়েছিল। এ সংবিধান মুজিববাদী আদর্শে রচিত। '৭১-এর সংবিধানের বিরুদ্ধে জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ করেছিলেন বলেও দাবি তিনি।

তিনি বলেন, সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে '৭২-এর সংবিধান বাতিলের সুযোগ এসেছিল। সেই সুযোগ আমরা মিস করেছি। সম্মান রেখেই বলছি, জিয়াউর রহমান সে ঐতিহাসিক ভুলটি করেছিলেন। '২৪ এও সুযোগ এসেছিল। এখনো সুযোগ মিস করে যাচ্ছি।

এ বিষয়ে বিএনপি তাদের অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে দাবি করে নাহিদ বলেন, বিএনপি যদি '৭২-এর পক্ষে অটল থাকে। তারা অবস্থান থেকে সরে গেলে, আমরাও আমাদের পূর্বের জায়গায় ফেরত যেয়ে সংবিধান পুনর্লিখনের দাবি জানাতে হবে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আর্থিক খাত নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলছেন, বিএনপির সময়ে আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলার কোনো রেকর্ড নেই। উনি কিছুক্ষণ আগে অস্বীকার করেছেন যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর একটা রাজনৈতিক নিয়োগ, তাদের দলের নির্বাচন কমিটির সদস্য।

তিনি বলেন, বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিশেষত্ব হচ্ছে ঋণ পুনঃতফসিল করা। এটাতে তিনি অভিজ্ঞ, ফলে তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কেন করা হয়েছে তা পরিষ্কার। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ যাতে তিনি পুনঃতফসিল করতে পারেন, সেই সুযোগ-সুবিধা করে দেওয়ার জন্যই দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করা হয়েছে। ফলে আর্থিক খাতের আরও নিয়োগ তারা কী বিবেচনায় দিবেন, তাদের উপর আর আস্থা রাখতে পারছি না।

প্রসঙ্গ জুলাই জাতীয় সনদ

জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপি 'নোট অব ডিসেন্ট' দেওয়ার সমালোচনা করে নাহিদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে 'নোট অব ডিসেন্ট' দিয়ে কলুষিত করে ফেলা হয়েছে। বল প্রয়োগ করে ঐকমত্য কমিশনকে চাপ দিয়ে জুলাই সনদে 'নোট অব ডিসেন্ট' লেখানো হয়েছে বলে দাবি করে নাহিদ বলেন, তিনি মনে করেন এ বিষয়ে এখন ঐকমত্য কমিশনের বলার সময় এসেছে।

গণভোটের প্রসঙ্গে তুলে এনসিপির নেতা বলেন, সবার সম্মতির ভিত্তিতেই সবাই মিলে গণভোটে অংশগ্রহণ করেছি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও সংস্কারের পক্ষে, গণভোটে 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে প্রচারণা করেছেন। কিন্তু নির্বাচনের পর বিএনপি ভিন্ন অবস্থান নেয়। নির্বাচনের আগে পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল যে গণভোট আপনারা মানেন না। এই গণভোটে হ্যাঁ বা না জিতুক এটার সাথে আপনাদের কোনো সম্পর্ক নাই। উনারা কিন্তু সেটা করেননি।

নাহিদ বলেন, এই সংসদে এই অধিবেশন একটি বিষয় বারবার এসেছে- মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যত্থান। মুক্তিযুদ্ধকে আমরা শ্রদ্ধা করি। আমরা মনে করি, জুলাই গণঅভ্যত্থানের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের নতুন রূপ তৈরি হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের নবায়ন হয়েছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সাথে জুলাই গণঅভ্থানের কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান নেই।

এটা নিয়ে অহেতুক বিতর্ক করা হচ্ছে জানিয়ের নাহিদ বলেন, আমরা কেউ বলি নাই যে জুলাই গণ-অভু্যত্থান মুক্তিযুদ্ধের থেকে বড় বা জুলাই গণঅভ্যত্থান '৯০- এর থেকে বড় বা '৯০-এর থেকে ছোট। জুলাই গণ-অভু্যত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিশেষ ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধ এক বিশেষ ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন। এটার ব্যাপারে আমরা আনকমপ্রমাইজ, এটা নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ নাই। তবে এই কথাটা উনারাই বারবার বলে মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করছেন, জুলাই অভ্যত্থানকে ছোট করছেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সবার অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, আমরা আন্দোলনের সময় থেকে এখন পর্যন্ত কখনো অস্বীকার করি নাই। এখন যদি বলা হয় যে অমুকের নেতৃত্বে গণঅভ্যত্থান হয়েছে, আমাদের লোকেরা এই গণঅভ্যুত্থান করেছে। এটা গণঅভ্যুত্থানের সাথে যারা সাধারণ মানুষ নেমেছিল, যারা শহীদ হয়েছে, তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।

তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সকলের অংশগ্রহণ ছিল। গণঅভ্যুত্থান আমরা একসাথেই করেছিলাম। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরে আমাদের রাস্তা রাজনৈতিকভাবে আলাদা হয়ে গেছে।

নাহিদ বলেন, আমরা ভারত এবং পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। এই সরকার আসার পরে একটা জিনিস বারবার আসছে ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রী- যিনি আগের সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি যে বিবৃতি দিয়েছেন সে বিবৃতি আমাদের কাছে স্পষ্ট না। আমরা কোন ভিত্তিতে ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলছি। ভারতের সাথে সম্পর্ক আমরা উন্নয়ন করতে চাই। ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। কিন্তু এই সম্পর্ক উন্নয়ন হতে হবে মর্যাদার ভিত্তিতে, সাম্যের ভিত্তিতে। ভারত শুধু আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে এই দেশকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে, সেই দিনকে কবর দিতে হবে।

আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে নাহিদ বলেন, দুই মাসে বিএনপির হাতে খুন হয়েছে ৩১ জন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৪টি, বিএনপির চাঁদাবাজির খবর এসেছে ৮৩টি। কিন্তু সরকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

নাহিদ বলেন, জঙ্গিবাদ নিয়ে নতুন করে কথা আসছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন জঙ্গিবাদ নেই, আবার প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বলছেন জঙ্গিবাদ আছে। সরকারের প্রতি অনুরোধ থাকবে আপনারা একটু সমন্বয় করে বক্তব্য দিন। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ বাংলাদেশের সিকিউরিটি প্রশ্ন এবং এটা সরকার এককভাবে ডিল করতে পারবে না। এতে জাতীয় ঐক্য লাগবে এবং সরকারকে আমরা সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করব। তবে বিগত আমলের মতো জঙ্গিবাদকে ওয়্যার অন টেরর প্রজেক্ট হিসেবে যাতে না দেখা হয়।

তিনি বলেন, সংসদে সরকারি দলের সদস্যরা যেভাবে স্তুতি করেছে, যেভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদকে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে, যেভাবে গণভোটকে অস্বীকার করেছে, তাতে আমি অনেক হতাশ হয়েছি। আশা করি, আমাদের এই হতাশা অতি দ্রুতই শেষ হবে এবং আমরা যেই কমিটমেন্ট জনগণের কাছে করেছি সেই সকল প্রতিশ্রুতি আমরা রক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।

এএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...