চুপ্পুসহ যেসব রাষ্ট্রপতি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি

চুপ্পুসহ যেসব রাষ্ট্রপতি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি
শেখ মুজিবুর রহমান, আবু সাঈদ চৌধুরী, মুহম্মদুল্লাহ, খন্দকার মোশতাক আহমদ, আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, জিয়াউর রহমান, আবদুস সাত্তার, আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসান উদ্দীন চৌধুরী, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ছবি: সংগৃহীত

তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালনের পর পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও, মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার এক বছর নয় মাস বাকি থাকতেই সরে দাঁড়ালেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে অনেক রাষ্ট্রপতিই তাদের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। কেউ রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষমতা হারিয়েছেন, কারো বিদায় এসেছে সামরিক হস্তক্ষেপে, কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, আবার কেউ নিহত হয়েছেন সামরিক অভ্যুত্থানে। সেই ধারায় সর্বশেষ যুক্ত হলেন মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।

আ’লীগ আমল থেকে বিএনপি সরকার

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল শপথ নিয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও তিনি পদে থেকে যান এবং তার কাছেই শপথ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যরা।

পরবর্তী দেড় বছরে কয়েকবারই তার পদত্যাগের দাবি ওঠে। তবে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কায় বিএনপি ওই সময় তার বহাল থাকার পক্ষে অবস্থান নেয়।

গত বছরের ডিসেম্বরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কারণে তিনি ‘অপমানিত’ বোধ করছেন এবং পরবর্তী নির্বাচনের পর পদত্যাগ করতে চান।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি নতুন সরকারের সদস্যদের শপথ পড়ান। এরপর গত ২৪ জুলাই ‘গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার’ কারণ দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন তিনি।

যারা মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি

শেখ মুজিবুর রহমান

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকারের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান (অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম)। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন এবং রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) প্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি পুনরায় রাষ্ট্রপতি হন। তবে বাকশাল প্রবর্তনের মাত্র সাত মাসের মাথায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি সপরিবারে নিহত হন।

আবু সাঈদ চৌধুরী

১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তবে ক্ষমতা ও দায়িত্বের পরিধি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মানসিক দূরত্ব তৈরি হওয়ায় ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।

মুহম্মদুল্লাহ

আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর স্পিকার মুহম্মদুল্লাহ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান। ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে ছিলেন। বাকশাল কায়েমের মধ্য দিয়েই তার মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে।

খন্দকার মোশতাক আহমদ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। মাত্র ৮১ দিন ক্ষমতায় থাকার পর একই বছরের ৫ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।

বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম

১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। একই সঙ্গে তিনি নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন। তবে কার্যত ক্ষমতা ছিল তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের হাতে। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি সরে দাঁড়ান। পরবর্তীতে লিখিত বইয়ে তিনি চাপের মুখে পদত্যাগের কথা উল্লেখ করেন।

জিয়াউর রহমান

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হন জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন।

বিচারপতি আবদুস সাত্তার

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর উপ-রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার প্রথমে অস্থায়ী এবং পরে নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র চার মাসের মাথায়, ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।

আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসান উদ্দীন চৌধুরী

১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখলের পর জেনারেল এরশাদ বিচারপতি আহসান উদ্দীন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে বসান। তবে সামরিক আইনের কারণে তার কোনো প্রকৃত ক্ষমতা ছিল না। ২০ মাস পর ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর এরশাদ তাকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির পদ নেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

১৯৮৩ সাল থেকে সামরিক শাসক হিসেবে এবং ১৯৮৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এরশাদ। তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলন ও ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ

১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৬তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২০০১ সালে সাফল্যের সঙ্গে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেন।

এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী

২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হন অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তবে নিজের দল বিএনপির সঙ্গেই নানা বিষয়ে মতবিরোধ তৈরি হওয়ায় মাত্র সাত মাসের মাথায়, ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করেন।

অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমেদ

২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকটকালে তিনি একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে বিতর্কিত হন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (ওয়ান-ইলেভেন) জরুরি অবস্থা জারি করে তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়লেও ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বহাল ছিলেন।

জিল্লুর রহমান

২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা জিল্লুর রহমান। মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছর আগে, ২০১৩ সালের ২০ মার্চ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

(উল্লেখ্য, জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেওয়া মো. আবদুল হামিদ একমাত্র ব্যক্তি, যিনি টানা দুই মেয়াদে সফলভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।)

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন