দেশের কারাগারে ৯৩ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী কয়েদি রয়েছে। তবে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো নারীর ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয়নি। ফাঁসি থেকে বাঁচতে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদনও করতে হয়নি।
সর্বশেষ রামিসা হত্যাকাণ্ডে স্বপ্না খাতুন নামে এক নারীর ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। আদেশের পরেই ওই নারী আসামিকে কনডেমড সেলে পাঠিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।
কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৯৩ নারীর মধ্যে ৫০ জনই আছেন কাশিমপুর মহিলা কারাগারের কনডেমড সেলে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের অধিকাংশই খুনের মামলার আসামি। প্রত্যেক সেলে তাদের বিজোড় করে রাখা হয়। কোনো সেলে একজন, তিনজন বা পাঁচজন রাখা হয়ে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারী আসামির আবেদন সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে গেলেই দণ্ড কমে যাবজ্জীবন হয়ে যায়।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, কনডেম সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনতে হয় ফাঁসির আসামিদের। কারাগারের অন্য নারী কয়েদি বা হাজতিদের বিভিন্ন কাজ করতে দেওয়া হলেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারীদের কোনো কাজ করতে দেওয়া হয় না। তারা সেলের মধ্যেই থাকে। যারা শিক্ষিত, তাদের অনেকেই বই পড়ে সময় কাটান।
আইনজ্ঞরা বলছেন, ফৌজদারি আইনে সাজা কার্যকরের বাধা না থাকলেও আছে বহু জটিলতা। আপিল বিভাগে গেলে ফাঁসির রায় আমৃত্যু বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারে সবাই আইনের ঊর্ধ্বে। কিন্তু বিচারক আপিলের রায়ে নারীদের ক্ষেত্রে সেটি চূড়ান্ত রায় কার্যকরের আদেশ দেন না। ২০০৭ সালে কাশিমপুরে দেশের একমাত্র মহিলা কারাগার উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু তাতে রাখা হয়নি ফাঁসির মঞ্চ। কারণ এর আগে দেশে কোনো নারী আসামির ফাঁসি কার্যকরের রেকর্ড নেই।
আইনজীবীরা বলছেন, কোনো খুনের ঘটনা এককভাবে নারীরা করেন না। অন্যরা জড়িত থাকে। নারীদের অংশগ্রহণ থাকে। যেহেতু এককভাবে নারী খুনের সঙ্গে জড়িত থাকে না, সেহেতু আদালত নারীদের বিষয়ে চূড়ান্ত রায় কার্যকরের আদেশ দেয় না।
এ বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের এআইজি (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ আমার দেশকে জানান, ‘দেশের কারাগারগুলোতে মোট ৯৩ জন ফাঁসির আসামি আছেন।’ এ বিষয়ে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন গতকাল মঙ্গলবার আমার দেশকে বলেন, নারীদের ফৌজদারি আইনে ফাঁসির আদেশের শাস্তি জারি করা নিয়ে জটিলতা নেই। আদেশ জারি করার আগে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য করতে বলা হয়েছে। তাহলো, ওই নারী যদি অসুস্থ হয় তাহলে ফাঁসি কার্যকরের আদেশ বাস্তবায়ন করা যাবে না। ওই নারীর শিশু থাকলে রায় রহিত থাকবে। যতদিন পর্যন্ত ওই নারী শিশু বড় না হবে, ততদিন রায় কার্যকর করা যাবে না।’
তিনি আরো বলেন, বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থায় ১৯৩টি দেশ একমত হয়ে স্বাক্ষর করেছে যে, ফাঁসি কার্যকরের ব্যাপারে নারীদের ব্যাপারে অনুকম্পা দেখানো হবে। এছাড়াও সামাজিকভাবে নারীর প্রতি মানবিক দুর্বলতাও আছে।
জানতে চাইলে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, আমেরিকা ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে ফাঁসি কার্যকরের নিয়ম উঠে যাচ্ছে। সেখানে দেশে নারীদের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। বর্তমানে মিন্নির জীবন কাটছে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কারাগারের কনডেম সেলে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া আসামি।
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদে নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর চারদিন পর ১০ এপ্রিল ঢাকায় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হয়। নুসরাত হত্যা মামলায় কামরুন্নাহার ও উম্মে সুলতানাসহ ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৯ মে ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্বপ্নাকে ফাঁসির সাজা দিল আদালত।
কনডেম সেলে নারীরা
দেশের কারাগারে ৯৩ নারীর জীবন কাটছে কনডেম সেলে। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদির জন্য আলাদা ভবন রয়েছে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখানেই আলাদাভাবে তাদের রাখা হয়। কনডেম সেলে পৃথক-পৃথক রুম আছে। পুরুষ ও নারীদের কনডেম সেল আলাদা আলাদা।
সূত্র জানায়, বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন নিতে হয়, যা ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) হিসেবে পরিচিত। হাইকোর্টের রায়ের পর সংক্ষুব্ধ পক্ষ আপিল বিভাগে আপিল করতে পারে। আর আপিলে আসা সিদ্ধান্তের পর তা পুনর্বিবেচনা চেয়ে সংক্ষুব্ধ পক্ষেরও আবেদন করার সুযোগ আছে। ডেথ রেফারেন্স শুনানির পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে পেপারবুক তৈরি করতে হয়। পেপারবুকে মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র, সাক্ষীদের বক্তব্য, বিচারিক আদালতের রায়সহ মামলার তথ্যাদি থাকে।
সূত্র জানায়, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া নারীরা সকালে, দুপুরে ও বিকালে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার জন্য কনডেম সেলের আঙিনা পর্যন্ত যেতে পারেন, তবে কারাগারে ঘুরে বেড়াতে পারেন না। মাসে একবার স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ আছে। এ ছাড়া মোবাইল ফোনে সপ্তাহে একবার কথা বলতে পারেন। কেউ চাইলে কক্ষে বসে সেলাইয়ের কাজ করতে পারেন। তবে বেশিরভাগই সময় কাটান শুয়ে-বসে। তাদের জন্য সার্বক্ষণিক পাহারা থাকে।
কনডেম সেলে একটি ছোট জানালা থাকে। কারাবিধি অনুযায়ী ৩৬ বর্গফুট স্থান বরাদ্দ থাকতে হবে একজন বন্দির জন্য। তবে কোথাও কোথাও সেল বড়ও হয়। মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হওয়া এসব আসামিকে দীর্ঘদিন কনডেম সেলে রাখার ফলে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

