এসএসসির ফল প্রকাশের পর ১০ মৃত্যু, শিক্ষার্থীদের জন্য ৮ দফা সুপারিশ

এসএসসির ফল প্রকাশের পর ১০ মৃত্যু, শিক্ষার্থীদের জন্য ৮ দফা সুপারিশ
আঁচল ফাউন্ডেশন। ফাইল ছবি

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা ২০২৬-এর ফলাফল প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। যা খুবই উদ্বেগজনক। তাই শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলোকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার, সমাজ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছে আঁচল ফাউন্ডেশন। একই সঙ্গে আট দফা দাবি তুলে ধরেছে সংগঠনটি।

রোববার (১৬ আগস্ট) আঁচল ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক শারমিন আক্তার মীম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

সংগঠনটি বলছে, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া বা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর মানসিক চাপে এসব ঘটনা ঘটেছে বলে পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য থেকে জানা গেছে।

আঁচল ফাউন্ডেশন মনে করে, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সময় শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও ঝুঁকি মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশভিত্তিক গবেষণাতেও পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সময়কে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধির একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মানসিক পরামর্শসেবা এবং ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১০ আগস্ট ফলাফল প্রকাশের পর রাজশাহী, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, শেরপুর, গোপালগঞ্জ, মেহেরপুর, কুমিল্লা ও চুয়াডাঙ্গা থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত দশজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে উল্লিখিত দশজনের মধ্যে সাতজন মেয়ে এবং তিনজন ছেলে শিক্ষার্থী। অর্থাৎ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত এসব ঘটনার প্রায় ৭০ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং ৩০ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থী। এছাড়াও পরীক্ষা আশানুরূপ না হওয়াও পরীক্ষা চলাকালীন গত মে মাসে ভোলার এক নারী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা করার ঘটনাও সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে। প্রতিনিয়ত এসব আত্মহত্যার ঘটনা আমাদের মুখস্থ ও ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার অসারতা প্রমাণ করছে। তাই বাস্তবমুখী, কর্মমুখী, দক্ষতাভিত্তিক আনন্দময় শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রতি সরকারের মনোনিবেশ করতে হবে। ফলাফল নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা অর্জনের সুযোগ থাকা দরকার।

এতে আরো বলা হয়, ২০২৫ সালে প্রকাশিত ইউএনডিপির বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে ১৯৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১০তম। উন্নত বিশ্বের আঙিনায় প্রবেশ করার জন্য বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে প্রথম সারির বিশটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অনুকরণ করা যেতে পারে।

আঁচল ফাউন্ডেশনের সমন্বয়কৃত তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে অন্তত ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যাটি ছিলো ৩১০ জন, ২০২৩ সালে ছিলো ৫১৩ জন এবং ২০২২ সালে ছিলো ৫৩২ জন। যেসব কারণে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার দিকে পা বাড়ায়, তাদের মাঝে পড়াশুনার চাপ এবং পরীক্ষার ফলাফল অন্যতম নিয়ামক। একটি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া কিংবা প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়া কোনোভাবেই একজন শিক্ষার্থীর জীবনের মূল্য বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে নির্ধারণ করে না। কিন্তু ফলাফলকে জীবনের সাফল্য-ব্যর্থতার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করা হলে হতাশা, লজ্জা, ভয় ও সামাজিক চাপ সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে আঁচল ফাউন্ডেশন সরকারের প্রতি আট দফা সুপারিশ জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: পরিবার থেকে পরীক্ষার সময় এবং ফলাফল প্রকাশের পরবর্তী অন্তত দুই সপ্তাহ শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ ও নজরদারি জোরদার করা।

প্রতিটি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগে ও পরে শিক্ষার্থীদের জন্য হটলাইন বা বিশেষ মানসিক পরামর্শ ও সহায়তা কার্যক্রম চালু করা।শিক্ষক ও অভিভাবকদের শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট, আচরণগত পরিবর্তন এবং আত্মহত্যার সম্ভাব্য ঝুঁকির লক্ষণ শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। পরীক্ষার ফল খারাপ হলে শিক্ষার্থীদের অপমান, শাস্তি, ভয় দেখানো এবং অন্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে তুলনা না করার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে অভিভাবক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। ফলাফল প্রকাশের পর মানসিকভাবে ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের শনাক্ত, পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর সহায়তা ও সংযোগ ব্যবস্থা চালু করা। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহত্যার ঘটনা প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল সংবাদ পরিবেশন নিশ্চিত করা এবং অতিরঞ্জিত, চাঞ্চল্যকর বা অনুকরণে উৎসাহিত করতে পারে এমন উপস্থাপন পরিহার করা।

এছাড়া গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহত্যার ঘটনা দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীলভাবে প্রচারের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন