এবারের ঈদুল আজহার আগে-পরে ১৩ দিনে (২১ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত) দেশে ২৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৮৩৭ জন। নিহতের মধ্যে নারী ৩৪, শিশু ৪৮।
১৪১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১২৪ জন, যা মোট নিহতের ৪৪.১২ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৪৮.২৮ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ৩৭ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ১৩.১৬ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৩৩ জন, অর্থাৎ ১১.৭৪ শতাংশ।
এই সময়ে ১৩টি নৌ-পথ দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত ও ১৫ আহত হয়েছেন। এই সাথে ২৪টি কোরবানীর গরু মারা গেছে। ২২টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ৯ জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
যানবাহনভিত্তিক নিহতের চিত্র
দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়- মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১২৪ জন (৪৪.১২ শতাংশ), বাস যাত্রী ২১ জন (৭.৪৭ শতাংশ), ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রলি আরোহী ৩২ জন (১১.৩৮ শতাংশ), প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স আরোহী ১১ জন (৩.৯১ শতাংশ), থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান) ৪৮ জন (১৭.০৮ শতাংশ) এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-মাহিন্দ্র) ৮ জন (২.৮৪ শতাংশ) নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনা সংঘটিত সড়কের ধরন
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৯৭টি (৩৩.২১ শতাংশ) জাতীয় মহাসড়কে, ১১২টি (৩৮.৩৫ শতাংশ) আঞ্চলিক সড়কে, ৪২টি (১৪.৩৮ শতাংশ) গ্রামীণ সড়কে এবং ৩৭টি (১২.৬৭ শতাংশ) শহরের সড়কে এবং ৪টি (১.৩৬ শতাংশ) অন্যান্য স্থানে সংঘটিত হয়েছে।
দুর্ঘটনার ধরন
দুর্ঘটনাসমূহের ৭৩টি (২৫ শতাংশ) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১২৭টি (৪৩.৪৯ শতাংশ) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ৩৮টি (১৩ শতাংশ) পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেয়া, ৪২টি (১৪.৩৮ শতাংশ) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ১২টি (৪.১০ শতাংশ) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহন
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে- ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রলি-লরি-ড্রাম ট্রাক-ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি-গ্যাসবাহী লরি ২২.০৯ শতাংশ, বাস ১৫.৫৮ শতাংশ, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স-পাজেরো জীপ ৪.৩৩ শতাংশ, মোটরসাইকেল ৩০.৯৬ শতাংশ, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান) ১৮.৩৪ শতাংশ, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন (নসিমন-ভটভটি-মাহিন্দ্র) ৩.৫৫ শতাংশ, প্যাডেল রিকশা-বাইসাইকেল ২.৩৬ শতাংশ এবং অজ্ঞাত যানবাহন ২.৭৬ শতাংশ।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ৫০৭টি। (বাস ৭৯, ট্রাক ৬১, কাভার্ডভ্যান ১১, পিকআপ ২৪, ট্রলি ৫, লরি ২, ড্রাম ট্রাক ৭, ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ১, গ্যাসবাহী লরি ১, মাইক্রোবাস ৫, প্রাইভেটকার ১১, অ্যাম্বুলেন্স ৪, পাজেরো জীপ ২, মোটরসাইকেল ১৫৭, থ্রি-হুইলার ৯৩ (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ১৮ (নসিমন-ভটভটি-মাহিন্দ্র), প্যাডেল রিকশা-বাইসাইকেল ১২ এবং অজ্ঞাত যানবাহন ১৪টি।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ
সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ৬.১৬%, সকালে ২৩.৬৩%, দুপুরে ১৭.৮০%, বিকালে ২১.২৩%, সন্ধ্যায় ১১.৬৪% এবং রাতে ১৯.৫২%।
দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান
দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ৩২.৫৩ শতাংশ, প্রাণহানি ৩৫.৯৪ শতাংশ , রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১৭.৮০ শতাংশ, প্রাণহানি ১৮.৫০ শতাংশ, চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৩ শতাংশ, প্রাণহানি ১২.০৯ শতাংশ, খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ৯.৯৩ শতাংশ, প্রাণহানি ১০.৩২ শতাংশ, বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৮.৯০ শতাংশ, প্রাণহানি ৭.১১ শতাংশ, সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৩.০৮ শতাংশ, প্রাণহানি ২.৪৯ শতাংশ, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ১০.৬১ শতাংশ, প্রাণহানি ৭.৮২ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৪.১০ শতাংশ, প্রাণহানি ৫.৬৯ শতাংশ ঘটেছে।
ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ৯৫টি দুর্ঘটনায় ১০১ জন নিহত। সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ৯টি দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত হয়েছেন। একক জেলা হিসেবে ফরিদপুর জেলায় সবচেয়ে বেশি ১৯টি দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত হয়েছেন।
ঈদযাত্রা ও দুর্ঘটনা পর্যালোচনা
এবারের ঈদুল আজহায় রাজধানী ঢাকা থেকে ১ কোটির অধিক মানুষ ঘরমুখী যাত্রা করেছেন এবং দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ৪ কোটি মানুষ যাতায়াত করেছেন। ঘরমুখী ও ফিরতি ঈদযাত্রায় একমাত্র ট্রেন ব্যতীত সড়ক ও নৌ-পথে ভোগান্তি তুলনামূলক কম হয়েছে। উত্তর বঙ্গের পথে যানজট হয়েছে। অব্যবস্থাপনার কারণে সড়ক, রেল ও নৌ-পথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়েছে, যা সরকার রোধ করতে পারেনি। টিকেট কেটেও কিছু যাত্রী নির্ধারিত ট্রেনে উঠতে পারেননি। ঢাকার সদরঘাটে যাত্রীদের প্রচন্ড ভিড় ছিল, তবে দুর্ঘটনা ঘটেনি।
এবারের ঈদযাত্রার টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষ নিহত হয়েছেন, যাঁরা ছিলেন তাঁদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এক্সপ্রেসওয়ে এবং অন্যান্য মহাসড়কে থেমে থাকা বিকল যানবাহনের পেছনে অন্য যানবাহন ধাক্কা দেয়ায় ১৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে।
২০২৫ সালের ঈদুল আজহার আগে-পরে ১২ দিনে ৩১২ জন নিহত হয়েছিলেন। প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছিলেন ২৬ জন। এবছরে প্রতিদিন গড়ে ২১.৬১ জন নিহত হয়েছেন। এই হিসাবে গত বছরের তুলনায় প্রাণহানি কমেছে ১৬.৮৮ শতাংশ। তবে প্রাণহানি কমার এই হার কোনো উন্নতির সূচক নির্দেশ করছে না। কারণ পরিবহন খাতে কোনো প্রকার ব্যবস্থাপনাগত উন্নতি ঘটেনি। কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ১১ জন পথচারী নিহত হয়েছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মধ্যে ৫৭ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছর।
ঈদ উদযাপনকালে মাত্র ৪/৫ দিনে বিপুল সংখ্যাক মানুষেকে পরিবহন করার মতো মানসম্পন্ন নিরাপদ গণপরিবহন আমাদের নেই। ফলে মানুষ অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে যাত্রা করে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হন। আসলে একটি, সুস্থ- স্বাভাবিক ও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে কমপক্ষে ৩ বছর মেয়াদি একটি টেকসই ও সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই পরিকল্পনার অধীনে রেলপথ সংস্কার এবং সম্প্রসারণ করে ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে সড়ক পথের মানুষকে ট্রেনমুখী করতে হবে। নৌ-পরিবহন উন্নত ও জনবান্ধব করতে হবে।
বিআরটিসি’র রুট বিস্তৃত করে বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে। পুলিশ, বিজিবি, আনসার-সহ সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহের যেসব বাস রয়েছে সেগুলো সরকার বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ঈদযাত্রায় ব্যবহার করলে দেশে মানসম্পন্ন গণপরিবহনের ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব হবে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। ঈদযাত্রায় মহাসড়কে টোলপ্লাজার কারণে যানজট তৈরি হয়। এজন্য শুধুমাত্র ঈদযাত্রায় টোলপ্লাজা উন্মুক্ত করে দিলে এই যানজট এড়ানো সম্ভব হবে। এতে খুব বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হবে না। ঈদযাত্রায় পোশাক শ্রমিকরা যাতে পর্যায়ক্রমে ছুটি উপভোগ করতে পারেন সেজন্য পরিকল্পনা সাজাতে হবে। পোশাক শ্রমিকদের জন্য অঞ্চলভিত্তিক যানবাহনের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করলে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ হবে।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ
১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; ২. বেপরোয়া গতি; ৩. চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা; ৪. বেতন-কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকা; ৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; ৬. তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; ৭. জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; ৮. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; ৯. বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি; ১০. গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।
সুপারিশসমূহ—
১. জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল (NRSC) পুনর্গঠন করে এই কাউন্সিলের অধীনে BRTA, BRTC এবং DTCA পরিচালনা করতে হবে। কাউন্সিলের হাতে আইন, বিধি ও নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা থাকতে হবে।
২. BRTA, BRTC এবং DTCA এর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং এসব টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। ৩. মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। ৪. সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার করতে হবে। ৫. রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানীভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করতে হবে।
৬. বিআরটিসির বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিবহন সেবা উন্নত করে সরকারের পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ৭. দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বৃদ্ধি করে তাদের বেতন, কর্মঘন্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। ৮. স্বল্প গতির ছোট যানবাহনের জন্য সকল মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ-সহ নিরাপদ রোড ডিজাইন করতে হবে। ৯. সকল রেল ক্রসিংয়ে গেইট-কীপার নিয়োগ করতে হবে। ১০. সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতন করতে ও দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।
১১. প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ, তাঁরা জনপ্রশাসন পরিচালনা ও নীতিমালা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেন। ১২. টেকসই পরিবহন কৌশলের অধীনে সড়ক, রেল ও নৌ-পরিবহন একত্রিত করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে। এতে করে সমন্বিত, পরিকল্পিত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য শিক্ষা-সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


