তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনকে সামনে রেখে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বাস্তবতা ও দাবিগুলো বাংলাদেশের জাতীয় নীতিতে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে ২০ দফা সনদ প্রকাশ করেছেন দেশের শতাধিক তরুণ জলবায়ুকর্মী। একই সঙ্গে ৬৪ জেলার তরুণদের দাবি এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মানুষের সরাসরি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি এই ‘যুব জলবায়ু অবস্থানপত্র ২০২৬’ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত এক এক মিলনায়তনে একশনএইড বাংলাদেশ ও ব্রাইটার্স আয়োজিত চার দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ কপ ২০২৬’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে এই সনদ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন ও প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত এই অবস্থানপত্রে জলবায়ু প্রশমন, স্থানীয় নেতৃত্বাধীন অভিযোজন, পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি ও ন্যায়সংগত অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, জলবায়ু শিক্ষা ও সচেতনতা, জেন্ডার সমতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং নীতি নির্ধারণে তরুণদের নেতৃত্বের মতো ৭টি মূল ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘প্যারিস থেকে আনতালিয়া: এক দশকের জলবায়ু প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা’।
এই অবস্থানপত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় দেশের ৬৪ জেলার তরুণদের পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মতামত নেওয়া হয়। ফোকাস গ্রুপ আলোচনা, গল্প বলার আসর, অংশগ্রহণমূলক মানচিত্রায়ন ও কমিউনিটি স্কোরকার্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের পাশাপাশি দেশের ৭টি সুনির্দিষ্ট সংকটাপন্ন এলাকার ভুক্তভোগীদের মতামত এবং ৬টি ঝুঁকিপূর্ণ ক্লাস্টারের ৩ বছরের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে সনদটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
সমাপনী দিনের প্রথম পর্বে ‘ফেসিং দ্য ফ্রন্টলাইনার্স: সিএসও অ্যান্ড এক্সপার্টস’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সিসিজে-বি পরিচালক এম হাফিজুল ইসলাম খান, সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা, ইউএনডিপির শারমিন ইসলাম, ইউএন উইমেনের দিলরুবা শারমিন এবং প্রান্তিক এলাকার প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন একশনএইড বাংলাদেশের ইয়ুথ, রেসিলিয়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট জাস্টিস লিড মো. নাজমুল আহসান।
পরবর্তীতে ‘চিলড্রেনস ভয়েস অন ক্লাইমেট’ টকশোতে পথশিশু ও হ্যাপি হোমসের শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আহমেদ রেজা। এছাড়া ক্লাইমেট পলিসি নেগোশিয়েশন ফেলোশিপ-এর ১৯ জন তরুণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আদলে এক ছায়া নীতি-আলোচনায় অংশ নেন। সেখানে ক্ষয়ক্ষতি, জলবায়ু অর্থায়ন, ন্যায়সংগত রূপান্তর ও কপ৩১ সম্মেলনে দরকষাকষিতে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে চর্চা করা হয়।
বিকেলের ইন কনভারসেশন উইথ ডিপ্লোম্যাটস পর্বে উপস্থিত কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা তরুণদের তৈরি অবস্থানপত্রটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় যুবদের সক্রিয় ভূমিকার ওপর জোর দেন। এ পর্বে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা এবং নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
পরবর্তীতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অবদান স্মরণ করে বলেন, প্রকৃতপক্ষে, একা সরকারের পক্ষে এই বৈশ্বিক ও সর্বগ্রাসী সংকট সামাল দেওয়া অসম্ভব। পরিবেশ রক্ষায় তরুণরাই হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রহরী। দূষণ চিহ্নিত করা, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় রোধ এবং জলবায়ু ঝুঁকির কথা তুলে ধরার পাশাপাশি তারা সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরিতে এক বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (জলবায়ু, পরিবেশ ও আন্তঃমীমান্ত পানিসম্পদ অনুবিভাগ) কাজী এহসানুল হক জলবায়ু বিষয়ে নেওয়া বর্তমান সিদ্ধান্তগুলো তরুণদের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে। তাই জলবায়ু নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তরুণদের এখন থেকেই আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া এবং বাস্তু-চ্যুতির কারণে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মানুষ ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন অস্ট্রেলিয়ার হাই কমিশনার সুজান রাইল। তিনি বলেন, কার্যকর জলবায়ু পদক্ষেপের জন্য সরকার, স্থানীয় কমিউনিটি, তরুণ সমাজ ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে একসাথে কাজ করতে হবে। কপ৩১ সম্মেলনে বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করতে হবে।চ্ডেনিশ দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন অ্যান্ডার্স বি. কার্লসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো সীমানা নেই। তাই স্থানীয় কমিউনিটি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক নীতি-নির্ধারক - সবার যৌথ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। নীতি নির্ধারণ ও স্থানীয় বাস্তবতার সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।
অনুষ্ঠানে মালদ্বীপের হাই কমিশনার শিউনীন রশিদ বলেন, "জলবায়ু পদক্ষেপের কেন্দ্রে তরুণদের থাকা জরুরি, কারণ আজকের গৃহীত সিদ্ধান্তই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।"
অন্যদিকে নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে আসা প্রান্তিক যুব প্রতিনিধি নিজাম উদ্দিন দ্বীপাঞ্চলের নির্মম বাস্তব তুলে ধরে বলেন, ঝড় ও জলাবদ্ধতা আমাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। যাতায়াত ও চিকিৎসাসেবা ভেঙে পড়ে, যা অন্তঃসত্ত্বা নারী ও জরুরি রোগীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে। জলবায়ু অভিযোজন নীতিতে আমাদের মৌলিক সেবা ও স্থানীয় সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
একশনএইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবিরের সঞ্চালনায় এ পর্বে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের দাবি তুলে ধরার তাগিদ দেওয়া হয়।
সমাপনী অধিবেশনে তরুণদের পক্ষ থেকে ব্রাইটার্সের চেয়ারপারসন ফারিহা অমি ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ পজিশন ২০২৬’ উপস্থাপন করেন। সনদটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম।
একশনএইড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সোসাইটির চেয়ারপারসন ইব্রাহিম খলিল আল-জায়াদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ পর্বে জানানো হয়, গৃহীত সুপারিশগুলো কপ৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের সরকারি নীতিমালার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হবে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ্তুইয়ুথ অ্যাসপিরেশনস্থ-এর মাধ্যমে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

