হেজেমনি মোকাবিলায় গরুসহ ভারতীয় সব পণ্য বয়কট করুন: মাহমুদুর রহমান

স্টাফ রিপোর্টার

হেজেমনি মোকাবিলায় গরুসহ ভারতীয় সব পণ্য বয়কট করুন: মাহমুদুর রহমান

ভারতীয় হেজেমনি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মন্তব্য করেছেন আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, ভারতীয় হেজেমনি মোকাবিলায় বাংলাদেশের জনগণ, রাজনৈতিক দল ও সরকারকে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হতে হবে। অন্যথায় দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। একই সাথে সীমান্তে চোরাচালান বন্ধে সীমান্তবর্তী জনগণকে সোচ্চার এবং দেশবাসীকে ভারতীয় গরুসহ সব পণ্য বয়কটসহ ভারতীয় হেজেমনির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামার আহ্বান জানান তিনি।

শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ফ্রেন্ডস অব হিউম্যানিটির আয়োজনে ‘ভারতে মুসলিম নির্যাতন: রাজনীতি, পরিচয় ও সংখ্যালঘু অধিকার দ্বন্দ্ব’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

মাহমুদুর রহমান বলেন, বিশ্বে ইসরাইল, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই তিনটি দেশ একযোগে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। ইরান আক্রমণের দুই দিন আগে সফরে গিয়ে ইসরাইলকে নিজের ফাদারল্যান্ড এবং সপ্তাহখানেক আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে সেদেশকে নিজের দ্বিতীয় বাড়ি বলে ঘোষণা দেন নরেন্দ্র মোদি। এই তিনটি দেশ পরস্পর যোগসাজশে বিশ্বে অ্যান্টি-মুসলিম ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে আমার দেশ সম্পাদক বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনার ১৬ বছরে একশ্রেণির রাজনীতিবিদ, সুশীল বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া বয়ান তৈরি করেছিল যে, ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের বিষয়টি ভুল ছিল। যারা এমন বয়ানে বিশ্বাসী তারা দেশের শত্রু ও ভারতের দালাল। যারা এখনো এমন বয়ান তৈরির চেষ্টা করছেন তাদেরকে আজকের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম প্রদেশের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানান। নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে এক কোটি নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়; যার বেশির ভাগই ছিল মুসলিম ভোটার। চরম হিন্দুত্ববাদী বিজেপি পরিকল্পিতভাবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখলে নিতে মুসলিমদের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়।

তিনি আরো বলেন, ১৯০৫ সালে যে ভারতীয় বাঙালি হিন্দুরা বঙ্গবঙ্গের বিরোধিতা করেছিল; পরবর্তীতে ওই হিন্দু সাম্প্রদায়িকরাই ১৯৪৭ সালের দুই বাংলাকে এক থাকার বিরোধিতা করেছিল।

মাহমুদুর রহমান বলেন, ভারতের বিজেপির উত্থান ও মুসলিম নির্যাতনের ঘটনা এবং জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের উত্থানের তথ্য তুলে ধরে যারা সমান্তরাল বিষয় বলে বয়ান তৈরির চেষ্টা করছেন, তারা মূলত ভারতের দালাল।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে মুসলিম নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে সেদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে আমরা চুপ থাকতে পারি না। কেননা, ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়েছেন। এমতাবস্থায় আমাদের চুপ থাকার সুযোগ নেই।

এ জন্য তিনি দেশের জনগণ, রাজনৈতিক দল ও সরকারকে ভারতের হেজেমনির মোকাবিলায় নিজেদের অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী জনগণকে চোরাচালান বন্ধে ভূমিকা রাখতে হবে এবং অন্য অঞ্চলের সাধারণ জনগণকে ভারতীয় পণ্য বয়কটের আহ্বান জানান। সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ হলে মাদক আসাও বন্ধ হয়ে যাবে। মাদক আমাদের সমাজে এক মরণব্যাধিতে পরিণত হয়েছে; যার কারণে নৃশংস ঘটনাও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে চোরাচালান বন্ধ হলে আমাদের সমাজের অনেক সামাজিক ব্যাধি দূর হয়ে যাবে।

জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা ভারতীয় গরু কিনে কোরবানি দেবেন না, গরুসহ ভারতীয় সব পণ্য বর্জন করুন। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ভারতীয় হেজেমনি মোকাবিলায় এই দাবিগুলো নিয়ে রাস্তায় নামারও আহ্বান জানান তিনি।

রাজনীতিবিদদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা দেখে বিস্মিত হই; কারণ এনসিপি ছাড়া আর কোনো দলকে ভারতীয় হেজেমনির বিরুদ্ধে কথা বলতে শোনা যাচ্ছে না। কেননা, রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে ভারতের বিরুদ্ধে গিয়ে ক্ষমতায় আসা কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। এই ভাইরাস দূর হওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফরে গিয়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের সময় চাইলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়—তাকে সময় দেওয়ার সুযোগ নেই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি আসলে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ধরনের সাহস গত ৫০ বছরেও আমাদের দেশে কেউ দেখাতে পারেনি। এছাড়া ৫-৬ বছর আগে সীমান্তে নেপালের নাগরিক হত্যাকাণ্ডের পর সেদেশের জনগণ এমন আন্দোলন গড়ে তুলেছিল যে, শেষ পর্যন্ত ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নেপালিদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। ফলে ভারতীয় হেজেমনি মোকাবিলায় জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আরো সোচ্চার ভূমিকা রাখতে হবে।

ভারতীয় হেজেমনি মোকাবিলায় সরকারের কর্তব্য সম্পর্কে মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমানে ভারতে মুসলিম নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের আন্তর্জাতিক ফোরামে আওয়াজ তোলা উচিত। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ফোরাম বলতে ওআইসিকে বোঝাচ্ছি না; অনেক আগেই গাজায় ওআইসির অপমৃত্যু হয়েছে। ভারতে মুসলিম নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরতে পারলে মোদি বিশ্বের যেখানেই যাবেন, সেখানেই তোপের মুখে পড়বেন। সম্প্রতি নরওয়ে সফরে গিয়ে মোদি সেখানকার সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়েই মাথা নিচু করে চলে যান। তখন সাংবাদিকরা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের বিভিন্ন নেতিবাচক ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করতে দেখা গেছে। ফলে আমাদের সরকারকে ভারতের ঘটনাগুলো নিয়ে চুপ থাকলে চলবে না; তা আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।

মাহমুদুর রহমান আরো বলেন, আমাদের দেশে হিন্দু কিংবা সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা হয় না। অতীতে ১৯৬৫ সালের দাঙ্গার সময়ও দেখেছি এদেশের মুসলমানরা হিন্দুদের আশ্রয় দিয়েছে; তাদের মন্দির পাহারা দিয়েছে।

সেমিনারে অধ্যাপক ড. শাহজাহান খান বলেন, ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা শুধু মুসলমানদের ওপরই নির্যাতন কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেনি; খ্রিস্টানদের অনেক গির্জা ভেঙে দিয়েছে। ভারতের এসব মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ধর্ম অবমাননার ঘটনার বিরুদ্ধে আমরা চুপ থাকতে পারি না। প্রত্যেককেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সোচ্চার হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরতে হবে। তিনি ভারতে মুসলিমদের হত্যা করে গরুকে পূজা করারও কঠোর সমালোচনা করেন।

ভারতীয় মুসলমানদের ভূমিকার সমালোচনা করে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ভারতীয় মুসলমানরাই তো ঐক্যবদ্ধ নয়, তারা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আছে। তারা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এই মুসলিম নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তুলে ধরত; তাহলে সরকারের ছত্রছায়ায় এসব ঘটনা ঘটানোর সাহস পেত না। তিনি দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরে ভারতীয় সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন।

সংগঠনটির চেয়ারম্যান ড. খন্দকার রাশেদুল হকের সভাপতিত্বে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ মো. শাহ আলম। সেমিনারে আরো বক্তব্য দেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. শাহজাহান খান, মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মীর মনজুর মাহমুদ, ইতিহাসবিদ জিয়া-উল-হক, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান (বীর প্রতীক), সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. ফজলে রাব্বি সাদেক আহমেদ ও রাজনীতি বিশ্লেষক শাহ আব্দুল হালিমসহ বিশিষ্টজনেরা।

শিক্ষাবিদ মো. শাহ আলম তার প্রবন্ধে ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন