‘আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি, হাওয়ার ওপর ভেসে এসে এখানে বসিনি’

‘আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি, হাওয়ার ওপর ভেসে এসে এখানে বসিনি’

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন “আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। হাওয়ার ওপর ভেসে এসে এখানে বসিনি। এই সরকার একটি নির্বাচিত সরকার। তাই সরকারকে প্রয়োজনীয় শ্রদ্ধা ও সম্মান দেওয়া উচিত। আমরা ভুল করলে সেই ভুলের মাসুল দেব, কিন্তু সবাই মিলে ভুল সংশোধন করতে চাই।”

বিজ্ঞাপন

বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও আলোচনা’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

তিনি বলেন, “আজকের এই অনুষ্ঠানটি যেভাবে শেষ হলো, তা একেবারেই অভিপ্রেত ছিল না। জাতীয় অনুষ্ঠানে আমরা জাতীয় ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারিনি। ভুল তো মানুষ করেই। সেই ভুল সবাই মিলে শুধরে নেওয়া উচিত।”

বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে সৃষ্ট পরিস্থিতি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে বলেও মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, “আমি ভেবেছিলাম, বিদেশি অতিথিরা যেহেতু উপস্থিত আছেন, তাই ইংরেজিতে ভাষণ দেব। তারা দেখুক, ১৬ বছর আমরা কীভাবে কাটিয়েছি। কিন্তু তারা এরই মধ্যে চলে গেছেন। বিদেশি অতিথিদের সামনে এভাবে অপদস্থ হওয়া আমাকে খুবই ব্যথিত করেছে। এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন, যিনি পাশের দেশে বসে আছেন।”

সকালের অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “সকালের অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত চমৎকার। প্রফেসর ইউনূস নিচে বসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে ডেকে পাশে বসিয়েছেন, মঞ্চে তুলে সম্মান দেখিয়েছেন। এটাই তো আমরা দেখতে চাই। সবাইকে সম্মান করতে চাই, কাউকে অপমান করতে চাই না।”

রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বক্তব্যের সময় ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, “রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বক্তব্যের সময় ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দেওয়া কি মানায়? কবে আমরা এসব শিখব?”

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আহত জুলাই যোদ্ধাদের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, “একজন মা তাঁর অন্ধ ছেলেকে নিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন। ছেলেটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য চোখ হারিয়েছে। তারা যদি আজও মর্যাদা না পায়, যদি ছোটখাটো প্রয়োজনে মন্ত্রীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তাহলে সেটি জাতির জন্য লজ্জার।”

উপস্থিত দুই মন্ত্রীর প্রশংসা করে তিনি বলেন, “জুনায়েদ সাকী চমৎকার বক্তব্য দিয়েছেন। এই সরকার আপনাদের নির্বাচিত সরকার। আমরা ভুল করলে আমাদের শুধরে দেবেন। আমরা কোনোভাবেই আওয়ামী লীগ হতে পারব না, হতেও চাই না।”

আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “এত অন্যায়, অবিচার, খুন, গুম, অর্থ পাচার, নির্যাতন, আয়নাঘরের মতো ঘটনা ঘটানোর পরও তাদের কোনো অনুশোচনা নেই। আবার তারা বলে, ডিসেম্বর মাসে দেশে আসবে। আসুক দেশে, রাজপথে দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ।”

নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “২৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এখন ৮২ বছর বয়সে প্রয়োজন হলে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি যুদ্ধও করব। বাংলাদেশের জনগণের শাসন ও গণতন্ত্রকে চিরস্থায়ী করে যাব। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে আহত হয়েছিলাম, এই ধরনের বাংলাদেশ দেখার জন্য নয়।”

তিনি বলেন, “জুলাইয়ের ইতিহাস গৌরবের ইতিহাস। পৃথিবীতে এমন সাহসী জাতি খুব কম আছে, যারা সঙ্গীনের সামনে আবু সাঈদের মতো বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারে। আমরা সেই জাতি, এ নিয়ে আমরা গর্ব করি।”

জুলাই যোদ্ধাদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, “মন খারাপ করবেন না। ১৯৭১ সালের শহীদরাও অনেক কিছু পাননি। আপনারাও হয়তো সবকিছু পাবেন না। কিন্তু এই সরকারের কাছ থেকে সম্মান অবশ্যই পাবেন।”

তিনি বলেন, “গরিব দেশ হিসেবে আমাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে, সবটুকু দিয়েই জুলাইয়ে আত্মাহুতি দেওয়া পরিবারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এই সরকারের সবচেয়ে পবিত্র দায়িত্ব।”

রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করবে।”

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন