আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি চলতি মাসেই

কবিতা

বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি চলতি মাসেই

মার্কিন উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চূড়ান্ত দরকষাকষিতে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মাসেই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হতে পারে।

বিমান সূত্রে জানা গেছে, বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১০টি ড্রিমলাইনার (৭৮৭-৯ ও ৭৮৭-১০ সিরিজ) এবং ৪টি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজ কেনার প্রাথমিক দাম চাওয়া হয়েছে প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। দামের বিষয়ে সর্বোচ্চ ছাড় আদায়কে অগ্রাধিকার দিলেও বোয়িংয়ের কাছে আরো অন্তত ২০টি শর্ত দিয়েছে বিমান।

বিজ্ঞাপন

সূত্র জানায়, ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাবে সরকারের সম্মতি এবং বিমান পরিচালনা পর্ষদের নীতিগত অনুমোদনের পর বর্তমানে দরকষাকষি চলছে। এ ছাড়া বোয়িংয়ের কাছে অন্তত ১৯টি ইস্যুতে প্রস্তাব দিয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ।

অন্যদিকে বোয়িংও দামে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে একটি সংশোধিত খসড়া প্রস্তুত করেছে, যা শিগগিরই বিমানের কাছে পাঠানো হবে। খসড়ায় উভয় পক্ষ একমত হলে দ্রুত চুক্তি সইয়ের দিন-ক্ষণ নির্ধারণ করা হবে। চলতি মাসেই সেটি সম্পন্ন হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে বিমানের শীর্ষ মহল।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন গত মঙ্গলবার আমার দেশ-কে বলেন, বোয়িংয়ের সঙ্গে নেগোসিয়েশন চলছে। এখনো চুক্তির তারিখ চূড়ান্ত হয়নি।

বিমান সূত্র জানায়, ড্রিমলাইনার ৭৮৭-৯ সিরিজের প্রতিটির দাম চাওয়া হয়েছে ১৭৫ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের ডলারের বাজারমূল্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। ডেলিভারির সময়—২০৩১ ও ২০৩৫ সালে তৎকালীন ডলারের মূল্য অনুযায়ী পরিশোধ করতে হবে এবং এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সমন্বয় যুক্ত হবে।

বিমানের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি ড্রিমলাইনারের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দুই হাজার ১৫০ কোটি টাকা ধরা হলেও ন্যূনতম ৬০ শতাংশ ছাড় দিলে দাম দাঁড়ায় প্রায় ৮৬০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ডেলিভারি বছরের মূল্যস্ফীতির কারণে অতিরিক্ত প্রায় ৪০ কোটি টাকা যোগ হলে প্রতিটি ড্রিমলাইনারের চূড়ান্ত দাম হবে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।

একইভাবে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজের প্রতিটির দাম চাওয়া হয়েছে ৬৩ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৭৩ কোটি টাকা। ৬০ শতাংশ ছাড়ে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩১০ কোটি টাকা, তবে এখানেও মূল্যস্ফীতির প্রভাব যুক্ত হবে। চূড়ান্ত দরদামে বড় ধরনের পার্থক্য নির্ভর করবে বোয়িং প্রদত্ত কমিশনের ওপর, যা সাধারণত ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে।

বিমান সূত্র জানায়, দরকষাকষি প্রক্রিয়ায় সক্রিয় রয়েছে ন্যাশনাল নেগোসিয়েশন কমিটি। এতে পররাষ্ট্র, পরিকল্পনা, অর্থ ও বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। কমিটির পক্ষ থেকে বোয়িংয়ের কাছে অন্তত ২০টি ক্ষেত্রে ছাড় চেয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বোয়িং সেই অনুযায়ী কিছু ছাড় দিয়ে তাদের পাল্টা প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে, যা শিগগিরই ঢাকায় পৌঁছাবে বলে জানা গেছে।

বিমানের একজন পরিচালক আমার দেশকে বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দাম। আমরা বোয়িংয়ের প্রস্তাবিত মূল্য কমানোর জন্য জোরালো দাবি জানিয়েছি। এর পাশাপাশি পেমেন্ট পদ্ধতিতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বোয়িং চুক্তির সময় মোট দামের এক শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ চাইলেও বিমান তা কমিয়ে শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে। একইভাবে বোয়িংয়ের ডেলিভারির দুই বছর আগে ২৪ শতাংশ পরিশোধের প্রস্তাবের বিপরীতে বিমান ১০ শতাংশ পরিশোধের প্রস্তাব দিয়েছে। বাকি পাওনা ডেলিভারির দিন পরিশোধের কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া বোয়িং বিমানের পাঁচজন প্রকৌশলীকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও বিমান সেটা দ্বিগুণ করে অন্তত ১০ জন প্রকৌশলীর প্রশিক্ষণ চেয়েছে। একই সঙ্গে যে কোনো মূল্যে অন্তত চারটি উড়োজাহাজ ২০৩০ সালের আগেই ডেলিভারি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিমান। বোয়িং এ বিষয়ে লিখিত প্রতিশ্রুতি না দিলেও মৌখিক আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছে, চুক্তিমোতাবেক নির্ধারিত সময়ের আগেই দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। অতীতেও বিমানের কাছে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ১০টি উড়োজাহাজ ডেলিভারি দেওয়া হয়েছিল।

বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বোয়িং দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করতে আগ্রহী এবং প্রতিটি প্রস্তাবে দ্রুত জবাব দিচ্ছে। বিমানও সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। দরদামে উভয়পক্ষ সম্মত হলে দ্রুত আইনি পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে, যাতে ভেটিং শেষ করে পর্ষদের অনুমোদনের পর চুক্তির জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া যায়।

বিমান সূত্র জানায়, চুক্তি চলতি মাসে সই হলেও সব উড়োজাহাজের ডেলিভারি শেষ হতে সময় লাগবে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে বর্তমান বহরের সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে জানিয়েছে বিমান। বিমানের বর্তমান বহরে যে প্লেন আছে তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। প্লেনের স্বল্পতার কারণে লাভজনক অনেক রুটে ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানো যাচ্ছে না এবং নতুন রুটও চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে অন্তত চারটি উড়োজাহাজ লিজে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে বোয়িংকে, যাতে অন্তর্বর্তী সময় সামাল দেওয়া যায়। বোয়িং তাতেও আশ্বস্ত করেছে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, দীর্ঘ আলোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিমান পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ মডেলের বিমান।

জানা গেছে- ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর বোয়িং আনুষ্ঠানিকভাবে উড়োজাহাজ বিক্রি ও ডেলিভারি সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠায়। পরে ২০ ডিসেম্বর সংশোধিত খসড়া চুক্তি পাঠানো হলে তা পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে প্রস্তাবিত মূল্য ও শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করে নীতিগতভাবে সম্মতি দেওয়া হয় এবং আনুষ্ঠানিক আলোচনায় এগিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়। বোর্ডসভায় সদস্যরা বলেন, দেশের বিমান চলাচল সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ জোরদার ও ভবিষ্যৎ যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় রেখে নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব বিমান যুক্ত হলে রাষ্ট্রীয় ও বাণিজ্যিক উভয় খাতেই বিমানের কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। ওই প্রতিশ্রুতির পর ইউরোপের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসও তৎপরতা বাড়ায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা কূটনৈতিকভাবে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ বিক্রির পক্ষে তৎপরতা চালালেও শেষ পর্যন্ত বোয়িংই চূড়ান্তভাবে এগিয়ে যায়। সব ধরনের সরকারি অনুমোদন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হলে বোয়িংয়ের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি সই হবে।

এ বিষয়ে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল হক বলেন, মার্কিন সরকারের বাণিজ্য শুল্কের পরিমাণ কমানোর লক্ষ্যে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আরো শক্তভাব বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন পণ্য আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি এবার মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে প্রাথমিকভাবে ১৪টি এয়ারক্রাফট কেনার প্রস্তুতি নিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রায় দীর্ঘ তিন বছর ধরে নিজ দেশের এয়ারক্রাফট বিক্রির লক্ষ্যে কূটনৈতিকভাবে তৎপর ছিল ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তির অংশ হিসেবে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার কথা জানিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। তার অংশ হিসেবেই দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর এবার নতুন ১৪টি প্লেন কেনা হচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...