বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেল পরিস্থিতি নিয়ে আপাতত স্বস্তিতে সরকার। টানা ছয়দিন দেশের কোথাও লোডশেডিং হয়নি। জ্বালানি তেলের জন্য পেট্রোল পাম্পগুলোয় ভিড় নেই বললেই চলে। ফলে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সরকার, যানবাহন মালিক, পেট্রোল পাম্পের মালিক-কর্মচারী সবাই সন্তুষ্ট।
মে মাস পর্যন্ত সব ধরনের জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা। গতকাল রোববার দেশে সরবরাহযোগ্য তিন লাখ ৫৫ হাজার ১৬৯ টন জ্বালানি তেলের মজুত ছিল। আগামী কয়েক দিনে মজুত আরো বাড়বে বলে জানান তারা।
লোডশেডিংমুক্ত দেশ
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ২৮ এপ্রিল আট বিভাগসহ দেশের ৯টি জোনে ‘জিরো আওয়ারে’ (রাত ১২টায়) বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১২ হাজার ১৮৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহও ছিল সমপরিমাণ। সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, ওই সময় দেশে কোনো লোডশেডিং হয়নি। একই দিন দুপুর ১২টায় এ চাহিদা ছিল ১০ হাজার ৬২০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১০ হাজার ৬২০ মেগাওয়াট। ওই দিন পিকআওয়ারে (সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা) সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদার (১১ হাজার ৪৭৫ মেগাওয়াট) পুরোটাই সরবরাহ করা হয়।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ সূত্র জানিয়েছে, গতকাল রোববার বেলা ৩টায় ১২ হাজার ৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল সমপরিমাণ। এতে এদিনও দেশের কোথাও লোডশেডিংয়ের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ১ মে সরকারি ছুটির দিন দুপুর ১২টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল আট হাজার ৮৯৪ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছিল আট হাজার ৮৯৪ মেগাওয়াট। ওই দিন পিক আওয়ারে (সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা) সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১০ হাজার ৪৬২ মেগাওয়াট আর সরবরাহও হয় সমপরিমাণ। ফলে ওই দিনও দেশে কোনো লোডশেডিং হয়নি। টানা ছয়দিন লোডশেডিং না হওয়ার পেছনে অসময়ের বৃষ্টিপাতকে আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাসহ এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সাধারণত এ সময় বৃষ্টিপাত হয় না। অন্যান্য বছর এ সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত। বৃষ্টিপাতের কারণে এবার বিদ্যুতের চাহিদা তেমন একটা বাড়েনি। দেশের কৃষি খাতসহ কয়েকটি খাতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে স্বস্তিতে রয়েছে দেশবাসী। এ পরিস্থিতি আগামী আরো কয়েক দিন চলতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
আগামী ১০ মে পর্যন্ত থেমে থেমে কমবেশি বৃষ্টি হতে পারে উল্লেখ করে আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন নেসা আমার দেশকে বলেন, এবার আগেই পশ্চিমা লঘুচাপ সক্রিয় থাকা এবং দখিনা বায়ু উপরের দিকে উঠে আসায় জলীয়বাষ্পের সংমিশ্রণে বাতাস সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ে বাধাগ্রস্ত হয়ে প্রচুর মেঘমালা তৈরি হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমের আগে বৃষ্টিপাত বেড়েছে।
এই আবহাওয়াবিদ আরো বলেন, মে মাসের অন্তত ১০ তারিখ পর্যন্ত থেমে থেমে বৃষ্টি হতে পারে। তাতে তাপমাত্রাও স্বাভাবিক থাকতে পারে। আবহাওয়ার এ পূর্বাভাস দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।
জ্বালানি তলের মজুত নিয়ে সন্তুষ্টি
দেশে জ্বালানি তেলের মজুত নিয়ে সন্তুষ্ট জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা। তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পুরো মে মাসের জন্য জ্বালানি তেলের মজুত নিশ্চিত রয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, সরবরাহযোগ্য তিন লাখ ৫৫ হাজার ১৬৯ টন জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেল রয়েছে দুই লাখ ৩৪ হাজার ৯৬৫ টন। মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার মধ্যে ডিজেলের চাহিদাই ৬৩-৭০ শতাংশ। বিপুল এ চাহিদার জোগান দিতে সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে বলেও জানান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা। তারা জানান, ডিজেলের মজুত বাড়ানোর জন্য সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন তিনটি জাহাজে আসা ৭৫ হাজার টন ডিজেল খালাস হচ্ছে। এছাড়া আরো ৩৩ হাজার টন পথে রয়েছে। মে মাসে ডিজেলের তিন লাখ ৭০ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে জোগানও সমপরিমাণ বলে জানান কর্মকর্তারা।
পেট্রোল পাম্পে নেই দীর্ঘ লাইন
জ্বালানি তেলের জন্য সারা রাতও পাম্পের সামনে কাটিয়েছেন-এমন ঘটনা মাত্র কয়েক দিন আগের। কেউ কেউ ২০টি পাম্প ঘুরে তেল না পেয়ে গাড়ি গ্যারেজে রেখে দিয়েছেন। পেট্রোল পাম্পের নিরাপত্তা দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও মোতায়েন করতে হয়েছে কোথাও কোথাও। তেল না পেয়ে পাম্পের কর্মচারীদের মারধরের ঘটনাও ঘটেছে অনেক জায়গায়। এ দৃশ্য এখন অতীত হয়ে গেছে। পাম্পগুলো থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি পেয়ে খুশি যানবাহন মালিকরাও। কোথাও কোথাও কর্মচারীদের গল্প করে অলস সময় কাটাতে দেখা যাচ্ছে। গতকাল রাজধানী ও আশপাশের পাম্পগুলো ঘুরে এ দৃশ্য দেখা যায়।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১১ দিনের মধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি তেল নিয়ে যানবাহন মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার কথা বলা হলেও বাস্তবে পেট্রোল পাম্পগুলোয় কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত লাইন তৈরি হয়। চারদিকে মজুতের হিড়িক পড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ডিসিদের তত্ত্বাবধানে পাম্পগুলোয় ট্যাগ অফিসার নিয়োগের পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে ৩৮৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। সরকারের এমন উদ্যোগের পরও দেশজুড়ে টানা ৫০ দিন হাহাকার অবস্থা চলতে থাক। জ্বালানি তেলের জন্য হামলা, সংঘাত ও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। গত ১৯ এপ্রিল সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ায় পাম্পগুলো থেকে যানবাহনের ভিড় উধাও হওয়ার পাশাপাশি সব হাহাকারও দূর হয়। পর্যাপ্ত সরবরাহ পেয়ে খুশি পেট্রোল পাম্পের মালিকরা। চাহিদামতো জ্বালানি তেল পেয়ে খুশি যানবাহন মালিকরাও।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

