আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

রাশিয়ার শ্রমবাজার ভারতের দখলে, উদাসীন বাংলাদেশ

পীর জুবায়ের

রাশিয়ার শ্রমবাজার ভারতের দখলে, উদাসীন বাংলাদেশ

আয়তনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ রাশিয়া। বিপরীতে দেশটির জনসংখ্যা সাড়ে ১৪ কোটিরও কম। কৃষি, শিল্পকারখানা, অবকাঠামো নির্মাণ ও জাহাজ নির্মাণশিল্পে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক কর্মীর চাহিদা রয়েছে সেখানে।

এতে করে দেশটিতে বেড়েছে বিদেশি কর্মীর চাহিদা। এ অবস্থায় রাশিয়ার শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে এশিয়ার দেশগুলোর রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এমন বাস্তবতায় চলতি বছর রাশিয়ায় ৭০ হাজার ভারতীয় শ্রমিক নেওয়ার চুক্তি হলেও এর ধারেকাছেও নেই বাংলাদেশ। এতে করে দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের গুরুত্ব খুবই নাজুক পর্যায়ে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নতুন বাজার খোঁজার ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনা না থাকাকে বড় সংকট হিসেবে দেখছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শ্রমবাজার খোঁজা নিয়ে যেসব প্রস্তাব বা পরিকল্পনা থাকে সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয় না। তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দাবি রাশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার নিয়ে চুক্তি করতে প্রক্রিয়া চলমান ।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ডয়চে ভেলে’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে রুশ সংবাদমাধ্যম ‘রিয়া নভস্তি’-এর রেফারেন্স দিয়ে বলা হয়, ২০২৬ সালে রাশিয়ায় অন্তত ৪০ হাজার ভারতীয় নাগরিক কাজ করতে আসবে। আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা বিষয়ে রাশিয়ার বিশেষ দূত বরিস টিটভ এ তথ্য জানিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তথ্যনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে পুতিন ও মোদির মধ্যে শ্রমিক রপ্তানি বিষয়ে একটি চুক্তি করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৬ সালে ৭০ হাজার ভারতীয় নাগরিককে রাশিয়ায় পাঠানোর কথা রয়েছে। এর কারণ হিসেবে রয়েছে রাশিয়ায় শ্রমিকস্বল্পতা। ফলে তারা ভারত থেকে কর্মী নিয়ে আসছে। এছাড়া স্বল্পদক্ষ ভারতীয় শ্রমিকদের রাশিয়ায় ৫৫৫ থেকে এক হাজার ১১১ ডলার মাসিক মজুরি দেওয়া হয় ।

বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর তথ্যনুযায়ী, বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য রাশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার পর সরকারিভাবে জাহাজ নির্মাণ, নির্মাণ ও পোলট্রি খাতে এখন পর্যন্ত ৩২৫ জন শ্রমিক পাঠানো হয়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর তথ্যনুযায়ী, বর্তমানে রাশিয়ায় গেছেন এমন শ্রমিকের সংখ্যা ছয় হাজার ২৬৬ জন।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, রাশিয়া বেশি ঠান্ডার দেশ, স্নো (বরফ) পড়ে। এমন তাপমাত্রায় বাংলাদেশিরা কাজ করতে অভ্যস্ত নয়। আমাদের শ্রমিকরা চায় কোম্পানির ভেতরে কাজ করতে। কিন্তু রাশিয়ানরা যখন বাইরে কাজ করতে বলে, তখন বাঙালি শ্রমিকরা অনীহা প্রকাশ করে। এজন্য রাশিয়ার শ্রমবাজার ধরতে বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে এটি একটি। ফলে চাইলেও অনেক কিছু করা সম্ভব নয়।

তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা জানান, সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার ধরতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের দূতাবাসের অনেক কর্মকর্তা একটু ভিন্ন আইডিয়া নিয়ে শ্রমবাজার ধরার চেষ্টা করতে হবে। কারণ আমাদের দেশে যে দক্ষ শমিক আছে এটা তাদের বোঝাতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমন্বয় থাকতে হবে।

তারা আরো বলেন, শুধু বিদেশে গেলে-আসলে হবে না। শ্রমবাজার অনুসন্ধান কিংবা চুক্তির ক্ষেত্রে প্রাইভেট সেক্টরে অভিজ্ঞদেরও পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন অথবা এ সেক্টরে কাজ করেছে অবসরপ্রাপ্ত এমন কর্মকর্তাদের নিয়েও কাজ করা প্রয়োজন। তখন সবার সমন্বিত অভিজ্ঞতায় আমাদের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করা সহজ হবে।

এ বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর আমার দেশকে বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালযয়ের মধ্যে একটা সমন্বয়ের দরকার। এ সমন্বয়টা সব সময় ঠিকভাবে হয় না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার মতো করে চিন্তা করে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় তার মতো করে চিন্তা করে। ফলে আমাদের গ্যাপটা এখানেই তৈরি হয়।

এছাড়া শ্রমখাতে উন্নতির জন্য স্থায়ীভাবে একটি শ্রমবাজার গবেষণা কেন্দ্র দরকার। যেখানে নিয়মিত শ্রমবাজার নিয়ে গবেষণার কাজ করা হবে। সে অনুযায়ী দক্ষতা বৃদ্ধি করা নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাবনা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করা হবে। এ গবেষণা পরিচালনায় সরকারও থাকতে পারে।

তিনি আরো বলেন, অতীতে যেটা হয়েছে, বিদেশ ভ্রমণ হয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের সেটাতে আসলে কোনো কাজ হয়নি। কারণ সেখানে যারা গেছেন, তারাও এ ব্যাপারে খুব একটা দক্ষ না। এছাড়া এসব টিমে রিক্রুটিং এজেন্সিদের প্রতিনিধিরা থাকেন না। তারা তাদের মতো করে হয়তো মার্কেট খোঁজে। সবকিছু নিয়ে শ্রমবাজার অনুসন্ধান ও দখলে একটি গ্যাপ থেকে যায়।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব শহিদুল ইসলাম চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, রাশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের কথাবার্তা হচ্ছে। একটা সমাঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের জন্য উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে এর একটা ড্রাফট (খসড়া) রাশিয়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।

তিনি বলেন, এসবের মধ্যে একটা সমস্য হলো, রাশিয়া প্রত্যাবর্তন চুক্তি চায়। যারা অবৈধ তাদের ফেরত পাঠাতে চায়, এগুলো নিয়ে একটু জটিলতা আছে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়ে গেলে ভালো কিছু হবে। এসব বিষয় নিয়ে দূতাবাসের সঙ্গেও আমাদের আলাপ হয়েছে। আশা করা যায় আমাদের জন্য ভালো কিছু হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন