ভ্যাপসা গরম দিশাহারা দেশবাসী, বৃষ্টির জন্য দোয়া

সরদার আনিছ

ভ্যাপসা গরম দিশাহারা দেশবাসী, বৃষ্টির জন্য দোয়া

টানা তাপপ্রবাহ আর অসহনীয় ভ্যাপসা গরমে রাজধানীসহ সারাদেশে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাপমাত্রার পারদ যতটা না উপরে, তার চেয়েও বহুগুণ বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে শরীরে। তাপদাহের সঙ্গে বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ভ্যাপসা গরমে মানুষ দিশেহারা। কখন ভারী বৃষ্টি আবহাওয়া শীতল হবে- চাতক পাখির মতো সেই অপেক্ষাতেই সময় পার করছেন দেশবাসী। বৃষ্টির জন্য শুক্রবার দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদে মসজিদে দোয়া করেছেন মুসল্লিরা।

গতকাল শুক্রবার কেরানিগঞ্জ শহীদনগর মসজিদে জুমাআর নামাজের পর দোয়ায় বৃষ্টির জন্য মুসল্লিদেরকে মহান আল্লাহর কাছে আহাজারি করতে দেখা গেছে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াক্তিয়া নামাজেও বৃষ্টি জন্য দোয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

শনিবার রাজধানীতে বৃষ্টি হয়নি; সারাদেশেও বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমেছে। এতে তাপমাত্রা বেড়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে; এতে ভ্যাপসা গরমের তীব্রতা বেড়ে গেছে। টানা আট দিনের ভ্যাপসা গরমের রাজধানীবাসী অনেকটাই দিশেহারা।

আবহাওয়া দপ্তর বলছে, মে মাসের প্রথম দিনের মতো শনিবার রাজধানীতে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। এর আগে গত বুধবারও তাপপ্রবাহ ছিল রাজধানীতে। ওই দিন এ রাজধানীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শনিবার রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

অন্যদিকে শুক্রবার ১৩ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেলেও শনিবার খুলনা বিভাগের জেলাগুলোসহ দেশের ২০ জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপ্রবাহ যায়। অর্থাৎ আগের কয়েকদিনের তুলনায় তাপপ্রবাহের পরিধি আরো বেড়েছে। আরো কয়েকদিন তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

শনিবার বিকালে আবহওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক আমার দেশকে বলেন, জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশজুড়ে তাপপ্রবাহ এবং ভ্যাপসা গরম অব্যাহত থাকতে পারে। কেন এতো গরম অনুভুত হচ্ছে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৃষ্টির পরিমাণ বেশি না হলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যায়; এতে গরম আরো বেশি অনুভুত হয়। কেননা ঘায়ের ঘাম সহজে শুকাতে দেয় না। রাজধানীসহ সারাদেশে গরম কমার সম্ভাবনা সহসাই দেখা যাচ্ছে না।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে সর্বোচ্চ ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, ঢাকা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে এ সময় রাজধানীতে কোনো বৃষ্টি হয়নি। সারাদেশেও আগের কয়েকদিনের তুলনায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমেছে।

শনিবার যশোরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ দশমিক ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এর আগের দিন শুক্রবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল রাজশাহী, লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও বাগেরহাটের মোংলায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এদিকে তাপমাত্রার পারদ যতটা না উপরে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি উত্তাপ অনুভূত হচ্ছে শরীরে। তাপদাহের সঙ্গে বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে গত আটদিন ধরে রাজধানীজুড়ে বিরাজ করছে এক অসহনীয় ভ্যাপসা গরম। সকালের দিকে আকাশে হালকা মেঘ জমলেও তা স্বস্তি তো আনছেই না, উল্টো গরমের তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েকগুণ। ঘরে-বাইরে কোথাও মিলছে না এতটুকু শান্তি।

সাধারণত তাপমাত্রা বেশি হলে বাতাস শুষ্ক থাকলে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যায়। কিন্তু মে মাসের এই সময়ে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় মানুষের শরীরের ঘাম সহজে শুকাচ্ছে না। ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে অনুভূত তাপমাত্রা ৫ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি মনে হচ্ছে।

শনিবার দুপুরের দিকে রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তান, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ ও ফার্মগেট ঘুরে দেখা যায় শ্রমজীবী মানুষের সীমাহীন কষ্ট। তীব্র রোদে পিচঢালা পথ থেকে যেন আগুন বের হচ্ছে। যান্ত্রিক এই শহরের গণপরিবহনগুলোতে যাতায়াত করা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি পৌঁছেছে চরমে। বাসের ভেতরে গরমে অনেককেই হাতপাখা বা রুমাল দিয়ে ঘাম মোছার আপ্রাণ চেষ্টা করতে দেখা গেছে।

কারওয়ানবাজার এলাকায় রিকশাচালক এখলাস উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, ‘কোনো বাতাস নাই। রিকশা চালাইলে গা দিয়া টপটপ কইরা পানি ঝরছে, শরীর এক্কেবারে ছাইড়া দেয়। একটু পরপর পানি খাইয়াও তৃষ্ণা মেটে না। গরমের চোটে দুপুরে রিকশা চালানোই অসম্ভব হয়া পড়ছে।’

ফুটপাতের হকার থেকে শুরু করে দিনমজুর—সবাই এই ভ্যাপসা গরমে নাকাল। তীব্র রোদের কারণে দুপুরের দিকে রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচল কিছুটা কমে যাওয়ায় দৈনিক আয়ের ওপরও এর বড় প্রভাব পড়ছে।

চরম এই প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে রাজধানীতে ডায়রিয়া, ডিহাইড্রেশন (পানিশূন্যতা), হিট স্ট্রোক, জ্বর ও সর্দি-কাশির মতো গরমজনিত রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। মহাখালীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত ডায়রিয়া ও পেটের পীড়ায় আক্রান্ত রোগী ভর্তি হচ্ছেন।

চিকিৎসকদের মতে, এই সময়ে সুস্থ থাকতে হলে সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলতে হবে। শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি, ডাবের পানি বা খাবার স্যালাইন পানের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। একই সাথে রাস্তার ধারের খোলা শরবত বা বাসি খাবার খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের কোথাও কোথাও স্থানীয়ভাবে মেঘ তৈরি হয়ে হালকা বৃষ্টি হলেও, এই ভ্যাপসা গরম থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেতে আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে। একটি বড় অঞ্চলজুড়ে টানা ও ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়া পর্যন্ত বাতাসের এই আর্দ্রতা এবং ভ্যাপসা ভাব কমবে না।

আকাশ মেঘলা হলেও গুমোট এই পরিস্থিতি কখন কাটবে, আর কখন এক পশলা ভারী বৃষ্টি পুরো শহরকে শীতল করবে—চাতক পাখির মতো এখন সেই অপেক্ষাতেই দিন গুনছে দেশবাসী।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন