রিমান্ডে ১/১১-এর কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন লে. জে. খালেদের

ওয়াসিম সিদ্দিকী

রিমান্ডে ১/১১-এর কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন লে. জে. খালেদের

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায় ‘ওয়ান-ইলেভেন’ বা এক-এগারো। দীর্ঘ দুই দশক পর সেই অসাংবিধানিক শাসনের নেপথ্য কারিগরদের মুখোশ উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি রিমান্ডে থাকা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক প্রধান লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদের দেওয়া তথ্যে বেরিয়ে আসছে বিভিন্ন চিত্র। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, এসব তথ্য এখন যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।

মামুন খালেদের দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’, প্রভাবশালী দুই সংবাদপত্র (একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি), সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের কিছু ব্যক্তির অশুভ আঁতাত কীভাবে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, রিমান্ডে মামুন খালেদ একাধিক সংবেদনশীল বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির প্রেক্ষাপট, তৎকালীন সেনাসমর্থিত সরকারের উত্থান, সে সময়ের ওই দুই প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম ইত্যাদি।

ষড়যন্ত্রের ব্লু-প্রিন্ট : সেনানিবাস থেকে দাতা সংস্থা

রিমান্ডে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এক-এগারোর পরিকল্পনা হুট করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একটি বিশেষ চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। ২০০৬ সালের শুরু থেকে দেশের প্রভাবশালী একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিক সুপরিকল্পিতভাবে সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার শুরু করে। তথাকথিত ‘যোগ্য প্রার্থী’ বাছাইয়ের নামে এনজিও ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে দেশব্যাপী সেমিনার এবং গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল রাজনীতিবিদদের প্রতি সাধারণ মানুষের ঘৃণা সৃষ্টি করা।

মামুন খালেদ দাবি করেন, ওই সময় কিছু প্রভাবশালী মহল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নির্দিষ্ট দিকে নিতে কাজ করেছিল। তার ভাষ্যমতে, একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিক তৎকালীন বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সমালোচনার আড়ালে এমন একটি জনমত তৈরি করেছিল, যেখানে রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। তিনি অভিযোগ করেন, এ প্রক্রিয়ায় ‘বিরাজনীতিকরণ’ ধারণাটি সামনে আনা হয় এবং সেটিকে জনপ্রিয় করতে সংবাদ পরিবেশন ও বিশ্লেষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘ওয়ার এগেইনস্ট টেরর’ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আধিপত্যবাদী নীতির সুযোগকে কাজে লাগিয়েছিল এই দুষ্টচক্র।

অভিযোগ উঠেছে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর তৎকালীন ঢাকা-প্রধানের সঙ্গে এ দুই পত্রিকা সম্পাদকের ছিল পারিবারিক ও গভীর সখ্য। এমনকি ১/১১-পরবর্তী সময়ে জেনারেল মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে প্রায় প্রতি রাতে সেনানিবাসে বৈঠক করতেন ওই দুই সম্পাদক, যেখানে পরবর্তী দিনের রাজনৈতিক ছক আঁকা হতো।

গোয়েন্দা ‘ফিড’ ও মিডিয়া ট্রায়ালের অন্ধকার অধ্যায়

এক-এগারো পরবর্তী দুবছর দেশের ওই প্রভাবশালী দুটি পত্রিকা কেবল সংবাদমাধ্যম হিসেবেই কাজ করেনি, বরং তারা ছিল ডিজিএফআইয়ের অঘোষিত মুখপত্র। গোয়েন্দা সেলে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা বানোয়াট ও কল্পিত তথ্যগুলোকে কোনোপ্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই ‘বিশেষ প্রতিবেদন’ হিসেবে ছেপে দেওয়া হতো। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১/১১-এর সরকার আসার পর আগের ধারাবাহিকতায় পত্রিকা দুটি এমন পরিবেশ তৈরি করেছিল, যাতে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক নেত্রী, বিশেষ করে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়ন করা সহজ হয়। পরিকল্পনাকে জনসমর্থনযোগ্য করে তুলতে বিভিন্ন প্রতিবেদন, কলাম ও টকশোতে ধারাবাহিকভাবে একটি নির্দিষ্ট বয়ান প্রচার করা হয়েছিল।

বিদেশি কানেকশন ও চন্দন নন্দী ফ্যাক্টর

রিমান্ডে মামুন খালেদ জানান, ভারতীয় এজেন্ট চন্দন নন্দী ও তার বাবার সঙ্গে ওই দুই সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তৎকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ও দেশের একজন প্রবীণ আইনজীবী (আ.লীগের সাবেক মন্ত্রী), শেখ হাসিনা সরকারের একজন মন্ত্রী (দেশেই রয়েছেন) ও কয়েকজন তথাকথিত সুশীল সমাজের ব্যক্তির মাধ্যমে তারা বিদেশি শক্তির বার্তা ও পরামর্শ সেনাসমর্থিত সরকারের কাছে পৌঁছে দিতেন। সাধারণ মানুষের আস্থা ভাঙতে নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কল্পিত চিত্র এমনভাবে আঁকা হতো, যেন আদালত রায় দেওয়ার আগেই জনগণ তাদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করে। রিমান্ডে থাকা নেতাদের ‘স্বীকারোক্তি’কে মসলাদার খবর হিসেবে উপস্থাপন করে তারা মূলত একটি ‘অসাংবিধানিক’ শাসনব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করার পথ সুগম করেছিলেন।

বিরাজনীতিকরণ ও ‘সংস্কারপন্থি’ কার্ড

সূত্র বলছে, পত্রিকা দুটি কেবল নেতিবাচক খবরই ছাপত না, বরং তারা রাজনৈতিক দলের ভেতর বিভেদ তৈরির কারিগর হিসেবেও কাজ করেছিল। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী ও তথাকথিত ‘সংস্কারপন্থি’ নেতাদের ব্যাপকভাবে প্রমোট করা হতো ওই দুই পত্রিকায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপি নেতাদের যখন রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছিল, তখন এই পত্রিকাগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বিরাজনীতিকরণের নীলনকশা বাস্তবায়নে ব্যস্ত ছিল। রিমান্ডে খালেদ মামুন বলেছেন, বিভিন্ন সরকারের কঠোর সমালোচনা করলেও কোনো সরকারই তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে আঘাত করেনি, বরং তাদের সম্পদ ও প্রভাব ক্রমশ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।

ইতিহাসের কাঠগড়ায় ‘সুশীল’ কলম

সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান সময়ের তদন্ত ও রিমান্ডে প্রাপ্ত তথ্যগুলো প্রমাণ করে, মুক্ত সংবাদপত্রের আড়ালে একপাক্ষিক প্রোপাগান্ডা চালিয়ে কোনো রাজনৈতিক আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করা যায় না। ইতিহাসের আদালতে যখনই এক-এগারোর প্রসঙ্গ তোলা হবে, তখনই ওই দুই পত্রিকার নাম আসবে একটি অগণতান্ত্রিক শক্তির প্রধান সহযোগী হিসেবে। সময়ের আবর্তে আজ এটি স্পষ্টÑসেদিন যা করা হয়েছিল তা সাংবাদিকতা ছিল না, ছিল স্রেফ একপাক্ষিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন। রিমান্ডে সাবেক দুই জেনারেল বলেছেন, এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিচার হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক কাঠামো বারবার এমন ‘ইনভিজিবল’ বা অদৃশ্য শক্তির হুমকিতে পড়বে। মামুন খালেদ বলেছেন, এক-এগারোর মাস্টারমাইন্ডদের বিচার হওয়া উচিত। রিমান্ডে মামুন খালেদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত সংস্থাগুলো এখন আরো গভীর অনুসন্ধান চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব বক্তব্য যাচাই করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন