আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

অধিকাংশ পাম্প বন্ধ, কোথাও অতিরিক্ত দামে মিলছে তেল

আমার দেশ ডেস্ক

অধিকাংশ পাম্প বন্ধ, কোথাও অতিরিক্ত দামে মিলছে তেল
রাজধানীর মানিকদিতে মঙ্গলবার একটি পেট্রোল পাম্পের সামনে জ্বালানির জন্য গাড়ির লম্বা সারি। আমার দেশ

চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে দেশজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। দেশের বেশিরভাগ পাম্পে জ্বালানি তেল বিক্রিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেককে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহর ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

রাজশাহীর বেশিরভাগ পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ

বিজ্ঞাপন

রাজশাহীর বেশিরভাগ পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষ ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে। এমন অবস্থায় গত সোমবার সকাল থেকে সব পেট্রোল পাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

রাজশাহী জেলা পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান শিমুল জানান, পাম্পগুলোয় যে পরিমাণ তেল মজুত ছিল, রোববারই তা শেষ হয়ে গেছে। ফলে সোমবার থেকে কোনো পাম্পেই পেট্রোল ও অকটেন নেই।

বাঘাবাড়ী ডিপোতে সরবরাহ প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রত্যেক লরিতে সাড়ে ১৩ হাজার লিটার তেল ধারণক্ষমতা থাকলেও মাত্র তিন হাজার লিটার দেওয়া হচ্ছে। যে পরিমাণ তেল আসছে, তা সঙ্গে সঙ্গে পাম্পগুলোয় সরবরাহ করা হচ্ছে।

তেল বিক্রি শুরুর সময় উদ্ভূত সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এড়াতে পাম্পগুলোয় সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়ে আনিসুর রহমান বলেন, পুলিশ দিয়ে কাজ হয় না। এজন্য আমরা জেলা প্রশাসককে বলেছি, পাম্পগুলোয় যেন সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। তা না হলে তেল বিক্রি করা সম্ভব হবে না।

সোমবার সকাল থেকেই নগরীর সাহেব বাজার, সাগরপাড়া, শিরোইল, কোর্ট এলাকা, তালাইমারীসহ বিভিন্ন পাম্পে শত শত মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও গণপরিবহন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অধিকাংশ চালক তেল সংগ্রহ করতে পারেননি।

তবে পাম্প মালিকরা আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামীকাল (বুধবার) থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। সমিতি প্রশাসনের কাছে জ্বালানি তেলের ন্যায্য বণ্টন ও বিশৃঙ্খলা রোধে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে।

‘তেল নেই’ প্ল্যাকার্ড ঝুলছে খুলনায়

খুলনা মহানগরীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় তেল সংকটের কারণে পেট্রোল পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অধিকাংশ পাম্পেই ‘তেল নেই’ লেখা প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক পাম্পে বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। সীমিত পরিমাণে তেল সরবরাহের কারণে মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ দুই লিটার এবং প্রাইভেট কারে ১০ লিটার করে দেওয়া হলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।

নগরীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের। ঈদের আগে থেকেই শুরু হওয়া এ সংকট এখনো অব্যাহত রয়েছে।

নগরীর নিউ মার্কেট এলাকার মেট্রোপলিটন ফিলিং স্টেশনে সোমবার সন্ধ্যায় দেখা যায়, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন শতাধিক মোটরসাইকেলচালক। শওকত হোসেন বাবু নামে এক প্রাইভেট কার চালক বলেন, প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর তিনি মাত্র ১০ লিটার অকটেন সংগ্রহ করতে পেরেছেন।

রংপুরে টাকা হলেই মিলছে জ্বালানি

রংপুরে পাম্পে তেল সংকট দেখানো হলেও খোলা বাজারে বেশি টাকা দিয়ে মিলছে জ্বালানি। পাম্প মালিকরা অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কালোবাজারে তেল বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা ড্রামে জ্বালানি তেল রেখে খোলা বাজারে প্রকাশ্যে বেশি দামে বিক্রি করছেন। পাম্প মালিকদের দ্বিমুখী আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ।

নগরীর পেট্রোল পাম্পগুলোয় জ্বালানি কিনতে আসা ক্রেতারা অভিযোগ করে বলেন, রংপুর অঞ্চলের অধিকাংশ পেট্রোল পাম্প থেকে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। কিছু পাম্পে পাওয়া গেলেও চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

মঙ্গলবার সকালে নগরীর শাপলা চত্বর, চারতালা মোড়, মডার্ন মোড়, টার্মিনাল এবং ব্যাংকের মোড়ে তেলের জন্য মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে সঠিকভাবে জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না ।

জ্বালানি সংকটের কারণে মহাভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা। দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটছে জ্বালানিনির্ভর মানুষের। পাম্পগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মজুত না থাকায় তারা তেল সরবরাহ করতে পারছেন না। এরই মধ্যে পাম্পগুলোয় অভিয়ান পরিচালনা করছে জেলা প্রশাসন ও বিএসটিআই।

কুমিল্লা ফিলিং স্টেশনে নেই অকটেন

কুমিল্লার পাম্পগুলোয় ডিজেল ও পেট্রোল সরবরাহ কমে যাওয়ায় চালক ও সাধারণ গ্রাহকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে গ্রাহকরা ক্লান্ত। তবুও অনেককে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। মোটরসাইকেলের চালকরা বাধ্য হচ্ছেন অকটেনের পরিবর্তে পেট্রোল নিতে।

গতকাল দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আলেখারচর বিশ্বরোড থেকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড পর্যন্ত কয়েকটি পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, কোনোটিতেই অকটেন দেওয়া হচ্ছে না। শুধুমাত্র পেট্রোল পাওয়া যাচ্ছে। কবে নাগাদ অকটেন পাওয়া যাবে, তা জানেন না পাম্পের কর্মচারীরা।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার মেঘনা অয়েল কোম্পানি থেকে এক লাখ ৪৪ হাজার লিটার ডিজেল এবং ১৩ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন দেওয়া হয়েছে। পদ্মা কোম্পানি থেকে দেওয়া হয়েছে ৬৭ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল এবং ২২ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন । যমুনা কোম্পানি থেকে দেওয়া হয়েছে ২৭ হাজার লিটার পেট্রোল, দুই লাখ এক হাজার লিটার ডিজেল এবং ৩০ হাজার লিটার অকটেন । জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, যে পরিমাণ জ্বালানি তেল দেওয়া হয়েছে তাতে ঘাটতি থাকার কথা নয়।

জ্বালানি সংকটে বরিশালের ফিলিং স্টেশন

বরিশালের ফিলিং স্টেশনগুলোয় জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। ঈদযাত্রার মধ্যেই জ্বালানি তেল সংকটে পরিবহন খাতে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

বরিশাল নগরীসহ জেলার চাহিদার তুলনায় কম জ্বালানি সরবরাহ করায় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন পাম্প থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে যানবাহনকে। তবে চাহিদার তুলনায় ডিপো থেকে কম জ্বালানি সরবরাহ করায় কিছুটা সংকট রয়েছে বলে দাবি ফিলিং স্টেশনগুলোর।

বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকার সুরভী ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার ইমরান হোসেন আমার দেশকে বলেন, ডিপো থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোয় প্রয়োজনের তুলনায় কম জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এ কারণে কিছুটা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ফিলিং স্টেশনে দৈনিক ২৪ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন। গতকাল ডিপো থেকে ১৬ হাজার লিটার ডিজেল দেওয়া হয়। ঈদের সময় যানবাহন বেশি চলাচল করছে। তাই জ্বালানির চাহিদাও বেশি। এ কারণে হিসাব করেই জ্বালানি বিক্রি করতে হচ্ছে।

কক্সবাজারে পাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি

সারা দেশের মতো কক্সবাজারেও জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানি স্বল্পতার চেয়েও গ্রাহকদের মধ্যে বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এতে পেট্রোল পাম্পগুলোয় গাড়ির সারি দীর্ঘ হচ্ছে।

এ সংকটের বেশি শিকার হচ্ছে পর্যটনসংশ্লিষ্ট হোটেল, মোটেল এবং সাগরে মাছ শিকারে যাওয়া নৌযানগুলো। বিদ্যুৎ সংকট থাকায় হোটেলগুলোয় ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে জেলার চার হাজার মাছ ধরার ট্রলার জ্বালানি সংকটের কারণে সাগরে যেতে পারছে না।

কক্সবাজার পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক উত্তম কুমার জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে রেশনিং করে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে যেভাবে পেনিক (আতঙ্ক) সৃষ্টি করা হয়েছে, সেভাবে তেলের সংকট তৈরি হয়নি।

ময়মনসিংহে ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ বন্ধের নোটিস

সারা দেশের মতো ময়মনসিংহেও পেট্রোল এবং অকটেন সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে পেট্রোল এবং অকটেন না থাকায় অনেক স্টেশন কর্তৃপক্ষ ‘সরবরাহ বন্ধ’-সংক্রান্ত নোটিস টাঙিয়ে দিয়েছে। এতে পরিবহন খাতসহ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে চরম ভোগান্তি তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতি অনিশ্চিত। অনেক স্থানে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও জ্বালানি সংগ্রহ করতে না পেরে ফিরে যেতে দেখা গেছে। এতে নগরজুড়ে পরিবহন সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আমেরিকা-ইসরাইলের ইরানে হামলার পর থেকেই এ সংকটের শুরু। জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যানবাহনের ধরন অনুযায়ী তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়। এতে পাম্পগুলোয় তেলের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। এর মধ্যে সরবরাহ-স্বল্পতার কারণে অনেক পাম্প বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দেশের জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...