নৈশপ্রহরী নেন ক্লাস

শিক্ষকদের ফাঁকিবাজিতে ধ্বংসের মুখে চরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা

শওকত জামান, জামালপুর

শিক্ষকদের ফাঁকিবাজিতে ধ্বংসের মুখে চরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা

যমুনার বুক চিরে জেগে ওঠা ইসলামপুরের চরাঞ্চলে সূর্য ওঠে প্রতিদিন, কিন্তু পৌঁছায় না শিক্ষার আলো। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, শিক্ষকও আছেন কাগজে-কলমে; অথচ নেই নিয়মিত পাঠদান, নেই দায়িত্ববোধ কিংবা তদারকি। বছরের পর বছর অবহেলা আর খামখেয়ালিপনায় ধুঁকছে চরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। ফলে ঝরে পড়ছে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী; বাধ্য হয়ে অনেক অভিভাবক সন্তানদের নুরানি মাদ্রাসায় ভর্তি করছেন।

উপজেলার সাপধরী ও বেলগাছা ইউনিয়নের যমুনা বেষ্টিত চরগুলো ঘুরে দেখা গেছে ভয়াবহ চিত্র। কোথাও শ্রেণিকক্ষে পেঁয়াজের বস্তা, কোথাও বিদ্যালয়ের বারান্দা ব্যবহার হচ্ছে গৃহস্থালি কাজের জন্য। আবার কোথাও শিক্ষকের পরিবর্তে ক্লাস নিচ্ছেন নৈশপ্রহরী।

বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে করুণ অবস্থা দিঘাইড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক নুরুজ্জামানের ‘নিজস্ব নিয়মে’ চলে বিদ্যালয়টি। তিনি নিয়মিত বিদ্যালয়ে না এসে নৈশপ্রহরী লিটনকে দিয়েই করান পাঠদান। সরেজমিনে দেখা যায়, একটি শ্রেণিকক্ষে মাত্র তিনজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে পাঠদান করানোর চেষ্টা করছেন নৈশপ্রহরী লিটন। অন্যদিকে বিদ্যালয়ের বারান্দায় স্থানীয়রা বসে গৃহস্থালি কাজ করছেন। একটি কক্ষে স্তূপ করে রাখা হয়েছে পেঁয়াজের বস্তা।

স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, “শিক্ষকরা নিয়মিত স্কুলে আসেন না। মাঝে মধ্যে হেডস্যার নুরুজ্জামান আসেন, কিছুক্ষণ বসে আবার চলে যান।”

নৈশপ্রহরীর ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “কাকে দিয়ে ক্লাস নেব বা নেব না, সেটা আমার বিষয়। আপনারা বলার কে?” অন্যদিকে নৈশপ্রহরী লিটন বলেন, “হেডস্যারের অনুমতিতেই আমি ক্লাস নিই।”

একই চিত্র চর বরুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। বিদ্যালয় ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে নিস্তব্ধ হয়ে; নেই শিক্ষক, নেই শিক্ষার্থী। স্থানীয়দের ভাষ্য, বছরের পর বছর এমন অবস্থাতেই চলছে বিদ্যালয়টি। ওই এলাকার কয়েকজন অভিভাবক জানান, এই স্কুলে শুধু পতাকা ওড়ে। শিক্ষকরা মাঝে মাঝে আসেন, কিছুক্ষণ বসে নৌকায় করে চলে যান। তাই বাধ্য হয়ে সন্তানদের নুরানি মাদ্রাসায় দিয়েছেন তারা।

চর মন্নিয়া এলাকার অভিভাবক মো. বক্কর মণ্ডল বলেন, “শিক্ষকদের অবহেলা আর তদারকির অভাবে চরের প্রাথমিক শিক্ষা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে এই শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে।”

চরবাসীর প্রশ্ন—যেখানে শিক্ষক, ভবন ও সরকারি বরাদ্দ সব আছে, সেখানে কেন নেই শিক্ষা? যমুনার ঢেউয়ের সঙ্গে কি হারিয়ে যাচ্ছে চরাঞ্চলের শিশুদের ভবিষ্যৎ?

এ বিষয়ে ইসলামপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহানারা বেগম বলেন, “বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শন করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন