রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ সময় ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমডি) এ তথ্য জানিয়েছে।
ফুটপাতের হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে গতকাল বুধবার পুলিশ-হকার সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকা। দফায় দফায় ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়া, টিয়ারশেল-ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও লাঠিপেটায় পুলিশ সদস্য, সাংবাদিকসহ আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫০ জন। এ সময় হকাররা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তিনটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এদিকে উচ্ছেদ অভিযানে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান হামলার পেছনে ফ্যাসিবাদের দোসরদের ইন্ধন থাকার অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে না জানিয়ে এবং বিকল্প ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা, স্থানীয় এমপি, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে জানা যায়, গতকাল সকালে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে মিরপুর-১৪ পর্যন্ত ফুটপাত ও সড়কের অবৈধ দখল সরাতে অভিযান শুরু করে ডিএনসিসির ভ্রাম্যমাণ আদালত। স্থানীয়ভাবে ‘হোপ মার্কেট’ হিসেবে পরিচিত এলাকার সামনের অংশে দোকানপাট সরানোর কাজ চলার সময় প্রথম উত্তেজনা দেখা দেয়। দোকান সরানোর সময় উচ্ছেদের কাজে ব্যবহৃত গাড়ির সঙ্গে বৈদ্যুতিক তারে টান পড়লে শর্টসার্কিট থেকে আগুন ধরে যায়। এতে হকারদের কয়েকটি দোকানের মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপরই পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। শুরুতে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে হকারদের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। শুরু হয় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। থেমে থেমে চলতে থাকে সংঘর্ষ।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বেলা পৌনে ১২টার দিকে মিরপুর আইডিয়াল কলেজের সামনে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ অবস্থান নেয়। অন্যদিকে মিরপুর-১০ গোলচত্বরে পুলিশ অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়লে হকারদের একটি অংশ ইটপাটকেল ছুড়ে জবাব দেয়। ইটের আঘাত এড়াতে এক পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের কিছুটা পিছু হটতে দেখা যায়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। সংঘর্ষ চলাকালে উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও দুপুরের দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উচ্ছেদ কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়।
সংঘর্ষের মধ্যে খবর সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকরাও হামলা ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। আরেকটি চ্যানেলের একজন রিপোর্টার ও ক্যামেরাপারসনের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে। একটি দৈনিকের ফটোসাংবাদিকও হামলায় আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ডিএনসিসি প্রশাসকও সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়টি উল্লেখ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।
সংঘর্ষের পর হকারদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে তাদের পক্ষ থেকে ভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের দাবি, শুধু ফুটপাত দখলমুক্ত করাই এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল না। হোপ মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ এবং সেখানকার দোকানিদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা তোলার বিষয়টি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। হকারদের অভিযোগ, একটি গ্রুপ গত কয়েক মাস থেকে মার্কেট ও আশপাশের ফুটপাতের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে মরিয়া হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় থেকে চাঁদা আদায়ের পথ অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী একটি পক্ষ বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে সিটি করপোরেশনের অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের উচ্ছেদে চাপ দিচ্ছে। তবে ডিএনসিসি কর্মকর্তারা বলছেন, হকারদের পুনর্বাসন নিয়ে আগেই করপোরেশনের উদ্যোগ ছিল। চলতি বছরের এপ্রিলে মিরপুর-১০ এলাকার ১০২ জন হকারকে ডিজিটাল পরিচয়পত্র দিয়ে নির্ধারিত স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন হকারদের একটি অংশ স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছিল।
এদিকে মিরপুরের সংঘর্ষের পর মাঠ পর্যায়ের প্রস্তুতি ও সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অভিযানে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল বলে মনে হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, অভিযানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ করেননি। ঘটনার কারণ ও প্রেক্ষাপট তদন্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ পরিকল্পিত এবং এর পেছনে ‘ফ্যাসিবাদের দোসরদের’ ইন্ধন রয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্যকে না জানিয়ে এবং বিকল্প ব্যবস্থা না করে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরে ফুটপাতের হকারদের উচ্ছেদ অভিযান চালানোর ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ওই আসনের এমপি ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল দুপুরে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, সংঘাতের পরিবর্তে এমন ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং সাধারণ জনগণের চলাচলের পথও নির্বিঘ্ন ও ব্যবহারোপযোগী থাকে। এ জন্য সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যেখানে সমস্যা, সেখানে সমাধানের পথও রয়েছে। তবে সেই সমাধান হতে হবে নিরপেক্ষ, বাস্তবভিত্তিক ও মানবিক; কাউকে অযথা ক্ষতিগ্রস্ত করে নয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


