জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও যুগান্তকারী অধ্যায়। এই অভ্যুত্থান কেবল কয়েকদিনের কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল গত ১৭ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বঞ্চনা এবং দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নিজ কক্ষে আমার দেশের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এসব কথা বলেন তিনি।
ত্রাণমন্ত্রী বলেন, এই গণবিপ্লবের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট একটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটেছে এবং জাতি এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট আলোচনায় উঠে এসেছে যে, জুলাইয়ের এই অর্জন একদিনে সম্ভব হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে রাজপথে নেতাকর্মীদের রক্ত ও আত্মত্যাগ। বিশেষ করে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী এ সময়ে অবর্ণনীয় নির্যাতন, গুম এবং খুনের শিকার হয়েছেন। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ত্যাগ এই লড়াইয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে জানান তিনি।
আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, সাবেক দেশনেত্রী দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ কারাবরণ এবং তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাসিত জীবন থেকে প্রতিনিয়ত আন্দোলনের রূপরেখা প্রদান নেতাকর্মীদের রাজপথে টিকে থাকার শক্তি জুগিয়েছে।
তিনি বলেন, লন্ডন থেকে তারেক রহমানের দেওয়া নির্দেশনায় নেতাকর্মীরা সংগঠিত হয়ে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এবং এটিই শেষ পর্যন্ত একটি সফল গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছে। ছাত্র আন্দোলন থেকে গণবিস্ফোরণ জুলাইয়ের আন্দোলনটি প্রাথমিকভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটা বিরোধী আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও সরকারের অনমনীয় ও কঠোর মনোভাব একে একটি বৃহত্তর রূপ দেয়।
সরকারের এ মন্ত্রী আরো বলেন, যখন সরকার কোনো যৌক্তিক দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানায় এবং দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়, তখন এটি সাধারণ জনতা, কৃষক, শ্রমিক এবং সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলনে পরিণত হয়। তিনি মনে করেন এই রূপান্তরটি ছিল একটি 'জনবিস্ফোরণ'। সরকার যখন রক্তের নেশায় মত্ত হয়ে উঠেছিল, তখন আপসের কোনো পথ খোলা ছিল না এবং এর ফলে একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটে।
জুলাই আন্দোলনে নিজের এলাকার কথা স্মরণ করে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, লালমনিরহাটের রক্তঝরা ইতিহাস এই আন্দোলনের আঁচ শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছিল জেলা ও মফস্বল শহরগুলোতেও। লালমনিরহাটের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে একদিনেই সেখানে ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া ঢাকায় কাজ করতে যাওয়া লালমনিরহাটের আরও তিনজন সাধারণ মানুষ শহীদ হন, যাদের মধ্যে পোশাক শ্রমিক ও রিকশাচালকও ছিলেন।
তিনি আরো বলেন, এই ১৭ বছরে লালমনিরহাটে মোট ১৩ জন নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ শহীদ হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৩ সালে পাটগ্রামের ছাত্রদল নেতা নাসিরকে মিছিল চলাকালীন পুলিশ সরাসরি গুলি করে হত্যা করার ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তারেক রহমানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে নাসিরের নিঃস্ব পরিবারের জন্য একটি বাড়ি তৈরি করে দেওয়ার মাধ্যমে শহীদ পরিবারকে পাশে থাকার উদাহরণও এখানে স্মরণ করা হয়।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয় ও শঙ্কা বিশাল এই অর্জনের মাঝেও বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে দেশে যে ধরনের গুণগত ও ভাষাগত পরিবর্তন বা স্লোগানের মার্জিত রূপ দেখা গিয়েছিল, এবারের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তা যেন ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে বলে জানান তিনি।
ত্রাণমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে রাজনীতিতে অশ্লীলতা, অশ্রাব্য ভাষা এবং একে অপরকে অপমান করার প্রবণতা বেড়েছে, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি সুস্থ রাজনৈতিক ধারা রেখে যেতে হলে সকলকে সংযত হতে হবে। যদি আমরা একে অপরকে সম্মান দিতে না জানি, তবে জাতি হিসেবে আমরা বড় কোনো গুণগত পরিবর্তন আনতে পারব না।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার ও ৩১ দফা পরিকল্পনা বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে রাষ্ট্রযন্ত্রের যে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে কাঠামোগত সংস্কার বা 'রাষ্ট্র মেরামত' এখন সময়ের প্রধান দাবি। স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তম্ভ আজ ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে। এই সংকট উত্তরণে বিএনপি ইতোমধ্যে তাদের ঐতিহাসিক '৩১ দফা' সংস্কার প্রস্তাব জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে।
দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এই ভাবনা অনুযায়ী, তারা যখনই জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবেন, তখনই ধারাবাহিকভাবে এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবেন। এই সংস্কারের মূল লক্ষ্য হবে একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, জুলাইয়ের এই মহৎ অর্জনকে সার্থক করতে হলে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং সামগ্রিক মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন। যারা এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন তাদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং যারা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের পথচলা শুরু করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জনগণের ম্যান্ডেটের প্রতি সম্মান প্রদর্শনই পারে একটি স্থিতিশীল ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ উপহার দিতে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


