চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৫৬ হাজার ১১৭ কোটি ৫৯ লাখ ৪১ হাজার টাকার সম্পূরক বাজেট জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। চলতি অর্থ বছরে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের ব্যয় মূল বরাদ্দের চেয়ে বেড়েছে তা অনুমোদনের এই সম্পূরক বাজেট পাস হলো।
সোমবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেন। পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগে সম্পূরক বাজেটের ২৫টি মঞ্জুরি দাবির ওপর ভোট গ্রহণ হয়। এসব দাবির বিপরীতে ২০ জন সংসদ সদস্য ৩০৪টি ছাঁটাই প্রস্তাবের নোটিশ দেন। অর্থ বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। পরে তা কণ্ঠভোটে নাকচ হয়।
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ৬২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। সংশোধিত বাজেটে ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বরাদ্দ বেড়েছে ৫৬ হাজার ১১৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। আর ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বরাদ্দ কমেছে ৫৯ হাজার ৩৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সার্বিকভাবে ২ হাজার কোটি টাকা কমে সংশোধিত বাজেট দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়।
সম্পূরক বাজেটে মোট বরাদ্দের মধ্যে ৬ হাজার ১১১ কোটি ৭৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত ব্যয়। বাকি ৫০ হাজার ৫ কোটি ৮১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা সংসদে ভোটে গৃহীত মঞ্জুরি।
সম্পূরক বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে অর্থ বিভাগ। এ বিভাগের মোট সম্পূরক বরাদ্দ ২৮ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা দায়যুক্ত ব্যয় এবং ২৩ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ভোটে গৃহীত মঞ্জুরি।
এরপর পরিকল্পনা বিভাগে ১২ হাজার ৪০৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ৪ হাজার ৯২৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ২ হাজার ১৭৭ কোটি ৪ লাখ টাকা, স্থানীয় সরকার বিভাগে ১ হাজার ৮০৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে ১ হাজার ৬৯০ কোটি ৮১ লাখ টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সম্পূরক বাজেটের আলোচনায় বিরোধী সদস্যরা ‘আগে খরচ, পরে অনুমোদন’ প্রক্রিয়া, ব্যাংক খাতের সংকট, খেলাপি ঋণ, ঘাটতি অর্থায়ন, দুদককে শক্তিশালী করা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং খাল খননসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সম্পূরক বাজেটের আলোচনার শুরুতেই ঢাকা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন বলেন, খরচ করার পর অনুমোদন নেওয়ার চর্চা বন্ধ হওয়া দরকার। তিনি বলেন, ‘সম্পূরক বাজেটের উপরে যে খরচ করে এর পরে অনুমোদন নেওয়া—এই প্র্যাকটিসটা আমার মনে হয় বন্ধ হওয়া দরকার। এটা দেশের জন্য, দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো হবে।’
পাবনা-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমানও একই প্রশ্ন তোলেন পরিকল্পনা বিভাগের মঞ্জুরি দাবির ওপর আলোচনায়। তিনি বলেন, সংবিধানের ৯১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অতিরিক্ত ব্যয়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নামে সরকারকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে; পরে তা সম্পূরক বাজেট হিসেবে সংসদে আনা হয়। নাজিবুর বলেন, তিনি খরচ করবেন, তারপরে এটা রাবার স্ট্যাম্পের মতো সম্পূরক বাজেট হিসেবে সংসদে পেশ করা হবে। আমাদের পাস করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
নাজিবুর রহমান সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯-এর প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ওই আইনে সংশোধিত বাজেট যথাসম্ভব প্রতি বছরের মার্চ মাসের মধ্যে পেশ করার কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যথাসম্ভব—এই শব্দটার অপব্যবহার করে সম্পূরক বাজেট কখনোই মার্চ মাসে দেওয়া হয় না।’ তিনি বলেন, কেন মার্চে সম্পূরক বাজেট দেওয়া গেল না, তার ব্যাখ্যা সরকারের দেওয়া উচিত।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবির ওপর আলোচনায় বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুল আলিম বলেন, সরকারি অর্থ ব্যয়ে সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে সম্পূরক বাজেটের প্রয়োজন পড়ত না। তিনি বলেন, ‘আগে খরচ, তারপরে অনুমোদন—এই রীতি চালু হয়েছে। আমি আপনার মাধ্যমে এই মহান সংসদে উত্থাপন করতে চাই, আগে অনুমোদন, তারপরে খরচ।’ তার অভিযোগ, অর্থবছরের শেষদিকে তাড়াহুড়ো করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবণতা অনিয়ম ও অপচয়ের সুযোগ তৈরি করে।
কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুল গফুর অর্থ বিভাগের মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের পক্ষে বলেন, নির্ধারিত বরাদ্দের মধ্যে খরচ সীমিত রাখতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই অতিরিক্ত চাহিদা প্রমাণ করে সরকারি ব্যয়ে কোনো নিয়ন্ত্রণ ও মিতব্যয়িতা ছিল না। সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, খরচের আগে সংসদের অনুমোদন নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে তা সংসদের কর্তৃত্বকে আরও শক্তিশালী করত।
তিনি বলেন, আমিও বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রীয় খরচ যা কিছু, সেটা আগেই সংসদে অনুমোদন নেওয়া উচিত। তবে নানা কারণে এটা হয়ত সম্ভব হয় না। স্পিকার বলেন, প্রত্যেক সংসদেই এভাবে সম্পূরক বাজেট পাস হয়েছে; এটি এখন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। প্রত্যেকটি আইটেম খরচের আগে যদি সংসদে অনুমোদন নেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে ভালো হতো। সংসদের সার্বভৌমত্ব আরও দৃঢ়তর হতো। ভবিষ্যতের জন্য সে ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করে দেখতে পারি।
অর্থমন্ত্রী সম্পূরক বাজেটের সমাপনী বক্তব্যে বলেন, সংশোধিত বাজেটে বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

