বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ আগামী গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত (আগামী বছর জুন থেকে আগস্ট) প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের চাহিদা কমে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা ইউরোপের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে। কারণ শীতকালীন তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মৌসুম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর আগেই তারা গ্যাসের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু তবে এই পরিস্থিতিতে এশিয়াও মোটেও স্বস্তিতে থাকবে না।
বিশ্বের ৯০ শতাংশ গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বকারী শিল্প সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল গ্যাস ইউনিয়ন (আইজিইউ) এই পূর্বাভাস দিয়েছে। খবর ওয়েলপ্রাইজ ডটকমের।
সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইজিইউয়ের মহাসচিব মেনেলাওস ইড্রিওস বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হতে পারে। ইউরোপ এখন এশিয়ার চেয়ে বেশি দাম দিয়ে গ্যাস কেনার চেষ্টা করছে। কারণ তাদের মজুত পুনরায় পূর্ণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাসের দামের ঊর্ধ্বগতি ইতোমধ্যেই চাহিদার ওপর কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে এই চাহিদা হ্রাস সাময়িক নাকি স্থায়ী রূপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, এটি সাময়িক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো প্রাকৃতিক গ্যাস-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে। দামের ঊর্ধ্বগতি সত্ত্বেও তারা এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে গোল্ডম্যান স্যাকস গ্যাসের চাহিদার দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নয়। এই সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটি এই শীতের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছে। তারা জানিয়েছে, পারস্য উপসাগর থেকে এলএনজি সরবরাহ বাড়লে ইউরোপে গ্যাসের দাম প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা প্রায় ৭০ ইউরো থেকে কমে ৫০ ইউরোতে নেমে আসতে পারে।
ব্যাংকটির গ্লোবাল কমোডিটিস রিসার্চের সহ-প্রধান সামান্থা ডার্ট বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় পারস্য উপসাগর থেকে এলএনজি রপ্তানির পরিমাণ এখনো ১৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশের ঘরে রয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের এলএনজি আমদানিকারকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ইউরোপে গ্যাসের দাম বাড়াতে হবে। তবে অন্যরা গ্যাস কেনা বন্ধ করে দিলে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি বাড়বে।
গ্যাসের মজুদাগারগুলো পূর্ণ করার জন্য ইউরোপে হয়তো আরো গ্যাস আসবে। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কয়লার দিকে ঝুঁকছে, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এই আমদানিকারক অঞ্চলটির জন্য গ্যাস কেনা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
রয়টার্স বলছে, আগামী ছয় মাসে ইউরোপের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লার ব্যবহার ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কারণ এই মাসে গ্যাসের দাম বেড়ে গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে (প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় ৮০ ইউরো) পৌঁছেছে।
এনার্জি-রিস্ক-আইকিউয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত ৩০ দিনে ইউরোপের বেঞ্চমার্ক গ্যাসের দাম ১৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
তবে এশীয় গ্যাস আমদানিকারকদের জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, শিগগির তাদের জন্য আরো বেশি পরিমাণে রুশ এলএনজি পাওয়া যাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই বছরের শুরুর দিকে রুশ এলএনজি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন করেছে, যা জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। এর অর্থ হলো ইয়ামাল এলএনজি থেকে আসা গ্যাসের প্রবাহ ভিন্ন পথে পরিচালিত হবে এবং সেগুলো হয়তো ছাড়ে বা কম দামে বিক্রি করা হতে পারে।
অবশ্য এর ফলে ইউরোপের জন্য গ্যাস সরবরাহের উৎস সংকুচিত হয়ে পড়বে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্ব বারবার স্পষ্ট করেছে যে, ভূ-রাজনৈতিক অগ্রাধিকারগুলোই তাদের কাছে মুখ্য এবং সেই অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মূল্য দিতেও জোটটি প্রস্তুত।
এদিকে, গ্যাস সরবরাহের নিরাপত্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক আরেকটি অগ্রাধিকারের বিষয় রয়েছে। আর তা হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কর্মসূচি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

