ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন টেলিভিশন সাংবাদিক দেব কোটাক। বিক্ষোভকারীরা তার টিভি চ্যানেলকে সরকারপন্থী ‘গোদি মিডিয়া’ বলে অভিযোগ করেন।
দেব কোটাক ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল টাইমস নাও এর প্রতিবেদক।
তিনি ভারতের প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে চলমান বিক্ষোভ কাভার করতে গিয়েছিলেন। তার পরিকল্পনা ছিল ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি সম্প্রচার করে কিছুক্ষণ অবস্থান শেষে ফিরে আসার। এ সময় ‘গোদি মিডিয়া’ স্লোগান দিতে দিতে একদল বিক্ষোভকারী তার ওপর চড়াও হয়। অনেকে তাকে মারধরের ঘটনাটি মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে। পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
দেব কোটাকের ওপর শারীরিক হামলার ঘটনা ব্যতিক্রমী হলেও, গত সপ্তাহ থেকে জোরালো হওয়া এ আন্দোলনে ভারতের মূলধারার প্রায় সব টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদকর্মীদেরই বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে। অনেককে সরকারপন্থী ও ‘বিক্রি হয়ে যাওয়া’ গণমাধ্যমের প্রতিনিধি বলে কটূক্তি করা হয়েছে।
৩৬ বছর বয়সী দেব কোটাক বলেন, ‘উত্তেজিত জনতা আমাকে প্রায় মেরেই ফেলত। তারা ক্ষুব্ধ ছিল। তাদের ধারণা, গণমাধ্যম তাদের বক্তব্য তুলে ধরেনি।’
তিনি বলেন, ‘আমাকে চড়, লাথি ও ঘুষি মারা হয়েছে। পানির বোতলও ছুড়ে মারা হয়। আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তখন শুধু জীবিত অবস্থায় সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছি।’
সোমবার সংসদ ভবনের দিকে বিক্ষোভকারীদের পদযাত্রায় পুলিশের দমন–পীড়নের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই অভিযানে বহু শিক্ষার্থী আহত হন।
কোটাক বলেন, ‘তারা বারবার বলছিল, আমরা তাদের বক্তব্য দেখাইনি। কিন্তু এটি ঠিক নয়। আমি উভয় পক্ষের আহত হওয়ার ঘটনাই প্রতিবেদনে তুলে ধরেছি।’ টাইমস নাওয়ের প্রধান সম্পাদক নাভিকা কুমারের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।
সাংবাদিকদের প্রতি এই বৈরী আচরণকে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে চলমান বিতর্কের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (আরএসএফ) বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে গত এক দশকে ভারতের অবস্থানের উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। ২০১০ সালে দেশটির অবস্থান ছিল ১২২তম। ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫৭তম স্থানে।
প্যারিসভিত্তিক সংস্থাটি বলেছে, সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা, সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে গণমাধ্যমের মালিকানা কেন্দ্রীভূত হওয়া এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধির কারণে এই অবনতি ঘটেছে।

এডিটরস গিল্ড অব ইন্ডিয়া সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের ওপর ক্ষোভ ও হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তবে সংগঠনটি বলেছে, ‘ত্রুটিপূর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশন শুধু পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে না, বরং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সমাজের ওপর পড়ে। একই সঙ্গে কার্যকর গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের অবস্থানও দুর্বল হয়।’
এ ঘটনায় ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কার্যালয়ের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক মুখপাত্রও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
সংবাদ জনবিরোধী হয়ে উঠেছে
র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রবীশ কুমারকে ‘গোদি মিডিয়া’ শব্দটির প্রবর্তক হিসেবে ধরা হয়। এশিয়ার নোবেল নামে পরিচিত এই পুরস্কারজয়ী সাংবাদিকের দেওয়া শব্দটি পরে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়। ‘গোদি’ শব্দটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদবির সঙ্গেও ছন্দ মিলে যাওয়ায় এর ব্যবহার আরো বেড়েছে।
সমালোচকদের মতে, সরকারকে জবাবদিহির মুখে না ফেলা, মোদিকে অতিরিক্ত ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা এবং ভিন্নমতকে উপেক্ষা বা সমালোচনা করার কারণে ভারতের প্রায় সব টেলিভিশন চ্যানেল ও কয়েকটি জাতীয় দৈনিককে এখন ‘গোদি মিডিয়া’ বলা হয়।
রবীশ কুমার বলেন, ‘গোদি মিডিয়া গণতন্ত্রবিরোধী, জনবিরোধী এবং বিরোধীদলবিরোধী। তারা বিরোধী মতকে নিয়মিত হেয় করে, সমালোচকদের বিদেশি শক্তির এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করে এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য খুব কমই প্রচার করে।’
ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখপাত্র দীপক বালিয়ান বলেন, বিক্ষোভকারীদের বারবার সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা বিক্ষোভকারীদের বলেছি এবং এখনো বলছি, গোদি মিডিয়ার সঙ্গেও যেন কেউ খারাপ আচরণ না করেন। তাদের কাজ করতে দিন। এখানে কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিই আমরা নিশ্চিত করতে চাই।’
২০১৪ সালের পর সংবাদ পরিবেশনে বড় পরিবর্তন
অনলাইন সংবাদমাধ্যম নিউজলন্ড্রির সম্পাদকীয় পরিচালক মনীষা পাণ্ডের মতে, মূলধারার টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস বহু বছরের হতাশার ফল। তিনি বলেন, ‘প্রচারধর্মী সাংবাদিকতা, পক্ষপাতদুষ্টতা ও মতামতনির্ভর প্রাইমটাইম অনুষ্ঠান আগে থেকেই ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের পর যে পরিবর্তনটি স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো সংবাদ ক্রমেই জনবিরোধী হয়ে উঠেছে।’
ডিজিটাল ভাষ্যকার আকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমে যাওয়ায় মানুষ স্বাধীন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছে। টাইমস নাও এর সাবেক এই সাংবাদিক বলেন, গণমাধ্যম যখন সরকারকে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়, তখনই বিকল্প ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের উত্থান ঘটে। অন্যথায় এভাবে তা গড়ে উঠত না। তার ভাষ্য, টেলিভিশন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের স্লোগান ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
কলকাতায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার নিন্দা
এদিকে বামপন্থী ছাত্রসংগঠন ও ককরোচ জনতা পার্টির উদ্যোগে কলকাতার শিয়ালদহ থেকে এসপ্লানেড পর্যন্ত আয়োজিত মিছিলে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ, বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ সংবাদ সংগ্রহে থাকা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়।
দরিনা ক্রসিংয়ে সরাসরি সম্প্রচারের সময় এক টেলিভিশন সাংবাদিকের ওপর হামলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, কয়েকজন যুবক তাকে ঘিরে ধরে ‘লুজার, লুজার’ বলে চিৎকার করতে থাকেন এবং পরে মারধর করেন। আহত ওই সাংবাদিককে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহত আরও কয়েকজন সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহকও একই হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শুক্রবার সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানান। তিনি সংবাদকর্মীদের ‘আমাদের সম্পদ’ বলে উল্লেখ করেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আহত সাংবাদিকদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, হামলাকারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা হামলাকারীদের শনাক্ত করেছি। অপেক্ষা করুন, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে কলকাতা প্রেস ক্লাবও হামলার নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটির ভাষ্য, বিক্ষোভের সময় সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা’। দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে তারা।
তবে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, কর্মসূচি ছিল শান্তিপূর্ণ এবং যারা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে, তারা আন্দোলনের অংশ ছিল না।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইন
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


