বাংলাদেশ ব্যাংক ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অভিযোগ করে এর কঠোর সমালোচনা করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রিন্সটন বা ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষরা নিয়োগ পেয়েছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হওয়াার পর নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং সোয়েটার ফ্যাক্টরির এমডি। একই ঘটনা আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগেও দেখেছি। দলীয় ভিসি-প্রে-ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দল করাটা দুষণীয় কিছু নয় কিন্তু দল না করলে যদি নিয়োগ দেওয়া না হয়-সেটা দুর্ভাগ্যজনক।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন না দেওয়ার জন্য তিনি বিএনপিকে ধন্যবাদ দেন। বলেন, বিএনপি মনোনয়ন না দেওয়ার কারণে দেশের লক্ষ মানুষের ভালোবাসা বুঝতে পেরেছি।
রুমিন ফারহানা বলেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার জন্য বার বার আলোচনা হয়েছে। সরকারি দল, বিরোধী দল, চব্বিশের অভ্যুত্থানের আগে-পরে সব সময় বলা হয়েছে যে, ক্ষমতার ভারসাম্য আনার কথা। বিএনপি তার ভিশন ২০৩০ ও ৩১ দফায় এ সম্পর্কিত প্রস্তাব রেখেছে। এই কারণে প্রত্যাশা ছিলো এবার রাষ্ট্রপতি মন্ত্রী পরিষদ অনুমোদিত ভাষনের বাইরে গিয়ে নিজের মত করে ভাষণ দিতে পারবেন। কিন্তু আমরা দেখলাম এবারও মন্ত্রী পরিষদের অনুমোদিত ভাষণ দিতে হয়েছে। এতটুকু স্বাধীনতা আমরা রাষ্ট্রপতিকে দিতে পারিনি। তালে আমরা কোন ভারসাম্যের কথা বলছি।
নির্বাচনী এলাকার জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, আমার অসংখ্য নেতাকর্মী বঞ্চিত হয়ে ভয়ভীতির মধ্যে থেকে আমার নির্বাচন করেছে। দল থেকে বহিস্কার হয়েছেন। কিন্তু তারা আমাকে ছেড়ে যায়নি। বিএনপিকে ধন্যবাদ জানাই আমাকে মনোনয়ন না দেওয়া জন্য। মনোনয়ন না দেওয়ার কারণেই আমি বুঝতে পেরেছি- বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ার কত লক্ষ্য মানুষের দোয়া-ভালোবাসা ও সহযোগিতা আমার পাশে ছিলো। একটা দলীয় গণ্ডির মধ্যে থেকে নির্বাচন করলে এটা বুঝবার সৌভাগ্য আমার হতো না।
তিনি বলেন, হাজার মানুষের আত্মত্যাগ হচ্ছে এই সংসদ। এই মানুষগুলো কারা যাদের আত্মত্যাগে আজ আমরা কেউ এমপি, কেউ মন্ত্রী, কেউ বিরোধী দল হয়ে সংসদে এসেছি। তাদের স্বপ্ন কী ছিলো? তারা জানতো তাদের এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে কেউ এমপি-মন্ত্রী হবেন না। তারা ছিলো দেশের খেটে খাওয়া একেবারেই সাধারণ জনগণ। তারা নতুন বাংলাদেশ তৈরির স্বপ্ন দেখেছিল। নতুন রাজনীতি নির্মাণ ও নতুন চিন্তার জন্ম দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। গত কয়েক বছরের বৈষম্য থেকে মুক্ত হয়ে সকলকে নিয়ে একটা বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। তাদের কাছে আমিসহ এই সংসদ কৃতজ্ঞ বলে মনে করি।
রুমিন বলেন, যে প্রত্যাশা নিয়ে গণঅভ্যুত্থান, তাদের প্রত্যাশা কিন্তু বায়বীয় ও অলিক ছিলো না। এখনো যদি দেয়ালে দেয়ালে তাকালে দেখবো তারা তাদের স্বপ্নের কথা লিখে গেছেন। ‘উই ওয়ান্ট জার্জিস্ট’ কিংবা ‘দেশটা কারো বাপের না’। ‘তুমি কেন আমি কে? বিকল্প বিকল্প’, ‘আসছে ফাগুন, আমরা হবো দ্বিগুণ’, ‘শোনো মহাজন, আমরা অনেকজন’, ‘দিনে নাটক, রাতে আটক’, ‘নাটক কম করো পিও’, হামাক ব্যাটা মারলো কেন? এমন হাজার প্রশ্ন, লক্ষ জিজ্ঞাসা। এই লড়াইটা কেবল একটা সরকার পরিবর্তনের লড়াই ছিলো না। সকলকে নিয়ে সকলের বাংলাদেশ গঠন করার স্বপ্ন নিয়ে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম- ধর্ম-বর্ণ-জাতিগোষ্ঠী বা লৈঙ্গিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে ‘আদারস’ করে দেওয়া হবে না।
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরো বলেন, এই আন্দোলনের সম্মুখসারিতে ছিলেন নারীরা। একঝাঁক নতুন প্রজন্মের তরুণ মুখ আমরা পেয়েছিলাম। সেই নারীরা এক বছর পার না হতেই হারিয়ে গেল কেন? ৭ জন নারী সংসদ সদস্যের এই সংসদে প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি। মিছিলের সামনের সারিতে নারীর প্রয়োজন হয়। টিয়ার সেল ও লঠিচার্জের সামনে নারী ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। অস্থির সময়ে নারীর সাহায্য ছাড়া পার হওয়া যায় না। আর সব কিছু যখণ ঠিক হয় তখন নারী হয়ে যায় ‘ট্রলের বস্তু’। নারীর পোশাক, নারীর চেহারা, নারীর কথা, নারীর হাসি- সব কিছু তখন হাসির খোরাকে পরিণত হয়। বায়ান্ন শতাংশ মানুষকে পেছনে ফেলে নতুন বাংলাদেশ রচনার কোন চিন্তা যদি কেউ করে থাকে- সেটা কখনো সম্ভব নয়। কোনদিন সম্ভব নয়।
বিএনপি দলীয় সাবেক এই নেত্রী বলেন, কর্মমুখী শিক্ষা দিয়ে চাকরির জন্য প্রস্তুত করতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। উচ্চ খাদ্যমুল্যস্ফীতির কারণে বিশ্বব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ লাল তালিকায় ইতোমধ্যে বাংলাদেশের নাম গেছে। একক শিল্প হিসেবে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বৈদেশিক ঋণ বেড়ে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার হওয়া, বিদেশি বিনিয়োগের ক্রমাবনতি মোকাবিলা করতে হলে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরি ও বিদেশে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর কোন বিকল্প নেই।
রুমিন বলেন, গত ১৫ বছরে দেশ থেকে যে বিপুল পরিমান টাকা পাচার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে এর পরিমাণ ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। তা ফেরত আনা না গেলে কিংবা ব্যাংক খাতে থাকা ৬ লাখ কোটির টাকার খেলাপী ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা না গেলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধোরের কোন পরিকল্পনাই কাজে আসবে না। মিথ্যা ইনভয়েসিং বন্ধ করা না গেলে টাকা পাচার বন্ধ হবে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

