জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণে সভাপতি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট, জাতিসংঘের কার্যকারিতা এবং ঐতিহাসিক স্মৃতির নানাবিধ প্রেক্ষাপট গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি তার ভাষণে ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়, বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের দৃশ্যমান ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
ভাষণের শুরুতেই ড.খলিলুর রহমান চার দশক আগের স্মৃতিচারণ করেন। আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট কূটনীতিক ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
ড. খলিল উল্লেখ করেন, বহুপাক্ষিকতা এবং জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা নতুন কোনো বিষয় নয়। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংস্থাটি এই চ্যালেঞ্জ ও প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে আসছে। তবে এই সমস্ত সমালোচনা ও সংশয়ের মধ্য দিয়েও জাতিসংঘ টিকে রয়েছে—কারণ এটি নিখুঁত বলে নয়, বরং বৈশ্বিক শান্তি ও কূটনীতির জন্য এটি সম্পূর্ণ অপরিহার্য এবং এর কোনো বিকল্প চিন্তা করা অসম্ভব। ১৯৪৫ সালে সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলনে মাত্র ৫০টি দেশ নিয়ে যাত্রা শুরু করা জাতিসংঘে আজ ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র এক ছাদের নিচে মিলিত হয়েছে, যা মানব ইতিহাসে অভূতপূর্ব। একটি ধ্বংসাত্মক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ রোধ করাই ছিল এই প্রতিষ্ঠানের মূল অঙ্গীকার এবং এ বিপর্যয় এড়াতে পারাটাই জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
গাজা পরিস্থিতি:আন্তর্জাতিক ব্যর্থতা ও মানবিক বিপর্যয়
জাতিসংঘের বিভিন্ন অর্জনের কথা স্বীকার করার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান চরম ব্যর্থতার কথা সততার সঙ্গে তুলে ধরেন অধিবেশনের সভাপতি। বিশেষ করে ফিলিস্তিন সংকট এবং গাজার বর্তমান পরিস্থিতিকে জাতিসংঘের সনদের মূলনীতি ও বিশ্ববিবেকের ওপর বড় ধরনের আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গাজা সংকটের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, গাজার চলমান যুদ্ধে ইতোমধ্যে ৭০,০০০-এরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে বড় একটি অংশই নিষ্পাপ শিশু ও বেসামরিক নাগরিক।
তিনি বলেন, অবরুদ্ধ গাজায় প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তার অত্যন্ত নগণ্য ও সামান্য অংশ পৌঁছানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্ববিবেকের জন্য চরম লজ্জাজনক।
ড. খলিল গাজা, ইউক্রেন, সুদান ও মিয়ানমারের মতো স্থানে সংঘাতের কথা উল্লেখ করে বলেন— মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার নীতিমালা কোনো নির্বাচিত বা সুবিধাজনক মানদণ্ডে প্রয়োগ করা যাবে না।
তিনি বলেন, গাজা পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যখন ভেটো কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে স্থবির হয়ে পড়ে, তখন সংস্থাটির সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ফিলিস্তিন সমস্যা দশকের পর দশক ধরে সমাধানহীন অবস্থায় পড়ে থাকা এবং গাজার বর্তমান ধ্বংসলীলা ঠেকাতে না পারা জাতিসংঘের এক বড় ব্যর্থতা।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ:শান্তিরক্ষা, মানবতা ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ
সভাপতির বক্তব্যে ড. খলিল জাতিসংঘে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক অবদান এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের মর্যাদা অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে উপস্থাপন করেন।
তিনি মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মানবিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের কান্ট্রি টিম এবং বাংলাদেশ সরকারের সমন্বিত প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কক্সবাজারে সীমিত সম্পদ নিয়ে জাতিসংঘ যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তা প্রশংসার দাবিদার।
ড. খলিল জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত একাধিক দেশের প্রতিনিধিদের অভিজ্ঞতা উদ্ধৃত করে তিনি বলেন—বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শান্তিরক্ষীরা কেবল নীল হেলমেট পরিহিত সেনা ছিলেন না; তারা সেখানে ধ্বংসস্তূপের মাঝে রাস্তা ও সম্প্রদায় তৈরি করেছেন, শিশুদের খাবার দিয়েছেন, সমাজ পুনর্গঠনে ভূমিকা রেখেছেন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছেন।
বাংলাদেশের ভেতরের সাম্প্রতিক ইতিহাস ও টেকসই উন্নয়ন অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা বিষয়েও আলোকপাত করেন ড. খলিল। তিনি বলেন, অতীতে একটি স্বৈরাচারী ও দমনমূলক শাসনের অধীনে মূলধন পাচার ও দুর্নীতির ফলে বাংলাদেশের উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার ও অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি রোধ করে নিজস্ব সম্পদ সংগ্রহের ওপর জোর দেওয়া হয়।
জাতিসংঘের সংস্কার ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
গাজা সংকট বা অন্যান্য বৈশ্বিক অস্থিরতা দূর করতে এবং হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর ৪-দশক আগের উত্থাপিত “আস্থা সংকট” কাটিয়ে উঠতে সভাপতির ভাষণে তিনটি মূল সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেন ড. খলিলুর রহমান।
তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে যেখানে অকার্যকারিতা দেখা যাচ্ছে, তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করা। নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার মতো অপ্রতিনিধিত্বশীল অঞ্চলের ন্যায়সঙ্গত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অচলাবস্থা দূর করা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের কাঠামোগত রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে ড. খলিল বলেন, কেবল সাময়িক ব্যথানাশক ব্যবস্থা বা পদ পরিবর্তন না করে হাজার হাজার অপ্রয়োজনীয় বা পুরোনো সক্রিয় ম্যান্ডেট বাদ দিয়ে সংস্থাকে মানসিকভাবে সংস্কার ও রূপান্তর করা।
অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ ও উদীয়মান প্রযুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং এজিআই -এর মতো উদীয়মান প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি ও চাকরির ক্ষতি মোকাবিলায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে এক হয়ে কাজ করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার যাতে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, অপপ্রচার বা উস্কানি না ছড়িয়ে মানব কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজকে যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।
ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ যেভাবে মানবতা ও শান্তিরক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বমঞ্চে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, ঠিক তেমনি নিরাপত্তা পরিষদ ও জাতিসংঘকে নিজেদের ভুল স্বীকার করে গাজাসহ বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দ্রুত কার্যকরী ভূমিকা নিতে হবে। তবেই সাধারণ মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

