‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ পরিচয়ে মোবাইল বা ক্যামেরায় অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তির ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করলে ২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা আইনে ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
মঙ্গলবার সংসদে উত্থাপিত প্রশ্নোত্তর পর্বে লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। খবর বাসসের।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৮তম দিনে প্রশ্নোত্তরপর্বে লিখিত প্রশ্ন করেন নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালী।
লিখিত প্রশ্নে সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালী জানতে চান—ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ) মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলবেন কি, ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ পরিচয়ে অনেকেই মোবাইল বা ক্যামেরা নিয়া ঘুরে ঘুরে অনুমতি ছাড়াই ব্যক্তির ভিডিও ধারণ করিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রসালো শিরোনামে প্রচার করেছে। অনেক ক্ষেত্রে হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবি করে থাকে। এই প্রেক্ষিতে আপনার মন্ত্রণালয় কী ধরনের প্রতিরোধমূলক, আইনগত ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের দৃষ্টান্ত রোধে কী পরিকল্পনা রয়েছে?
জবাবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম লিখিত জবাবে বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ কর্তৃক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ (গত ১০ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে সংসদের বৈঠকে সাইবার সুরক্ষা বিল, ২০২৬ পাস হয়েছে)-এর ধারা ২৫(১) অনুযায়ী ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন বা সেক্সটরশনের অভিপ্রায়ে তথ্য, ভিডিও, চিত্র বা যেকোনো উপাদান প্রেরণ, প্রকাশ, প্রচার বা প্রচারের হুমকি প্রদান, বা ক্ষতিকর বা ভীতি প্রদর্শক তা একটি অপরাধ।
ওই অপরাধের দণ্ড
ধারা ২৫(২) অনুযায়ী অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাক অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। ধারা ২৫(৩) অনুযায়ী ভুক্তভোগী নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু হলে অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। চাঁদা দাবির বিষয়টি ধারা ২২ (সাইবার স্পেসে প্রতারণা)-এর আওতায় পড়বে, যেখানে অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ
সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ (গত ১০ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে সংসদের বৈঠকে সাইবার সুরক্ষা বিল ২০২৬ পাস হয়েছে)-এর ধারা ৮ অনুযায়ী, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মহাপরিচালক ক্ষতিকর কন্টেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষমতা রাখেন এবং বিটিআরসিকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করতে পারেন। ধারা ৯ অনুযায়ী, জাতীয় সাইবার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার, এই ধরনের অপরাধ শনাক্ত ও প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
ধারা ৩৫ অনুযায়ী, পরোয়ানা ব্যতিরেকেও জরুরি ক্ষেত্রে তল্লাশি, কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, তথ্য-উপাত্ত বা অন্যান্য সরঞ্জামাদি জব্দ ও অপরাধীকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ক) আইনি কাঠামো সুদৃঢ়করণ: ধারা ৫ ও ৬ অনুযায়ী জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি গঠন করা হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদধারী বিশেষজ্ঞ নিয়োগ বাধ্যতামূলক। এই এজেন্সি বিনা অনুমতিতে ভিডিও ধারণ ও প্রচারজনিত অভিযোগ কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। ক্রমান্বয়ে এই এজেন্সির লোকবল ও অবকাঠামো বৃদ্ধি করা হবে।
ধারা ৮(৩ ও ৪) অনুযায়ী, যেকোনো ক্ষতিকর কন্টেন্ট ব্লক বা অপসারণের পর ৩ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিতে হবে এবং স্বচ্ছতার স্বার্থে ব্লক করা সকল কন্টেন্টের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করার বিধান রাখা হয়েছে।
প্রতিরোধ ব্যবস্থা
ধারা ৯ অনুযায়ী, কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম ও জাতীয় সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার-সাইবার স্পেসে ক্ষতিকর কন্টেন্ট রিয়েল-টাইমে শনাক্ত করতে ক্লাউডভিত্তিক সাইবার সিকিউরিটি সলিউশন যেমন: সিকিউরিটি অর্কেস্ট্রেশন, অটোমেশন অ্যান্ড রেসপন্স (সোয়ার), এন্ডপয়েন্ট ডিটেকশন অ্যান্ড রেসপন্স (ইডিআর), এক্সটেন্ডেড ডিটেকশন অ্যান্ড রেসপন্স (এক্সডিআর) ব্যবহার করা হবে।
ধারা ৯(৫) (ঙ) অনুযায়ী, গ্লোবাল থ্রেট ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্য ও লগ আদান-প্রদানের মাধ্যমে সীমান্ত পেরিয়ে পরিচালিত অপরাধও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
তদন্ত সক্ষমতা বৃদ্ধি
ধারা ১০ ও ১১ অনুযায়ী, এজেন্সির নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা হবে, যা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করবে। ফলে ভিডিওর উৎস, ব্যক্তির পরিচয় ও ডিভাইস দ্রুত শনাক্ত করা যাবে।
ধারা ৩২ অনুযায়ী, তদন্তের সময়সীমা ৯০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত রয়েছে, যা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করবে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
ধারা ৪৮ অনুযায়ী, বিদেশ থেকে পরিচালিত এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহায়তা আইন, ২০১২ প্রয়োগ করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা হবে।
ধারা ৪(২) অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাইরে থেকে বাংলাদেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে এই অপরাধ সংঘটিত হলেও এই আইন প্রযোজ্য হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

