আসিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘মনগড়া নয়’, প্রয়োজনে বিদেশে চিঠি দেবে দুদক

আসিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘মনগড়া নয়’, প্রয়োজনে বিদেশে চিঠি দেবে দুদক
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব সাইদুর রহমান খান।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগকে মনগড়া বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে তথ্য চেয়ে পারস্পরিক আইনি সহায়তার (এমএলএআর) আওতায় চিঠি পাঠানো হবে।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কমিশনের সচিব সাইদুর রহমান খান এসব কথা জানান।

তিনি বলেন, অনুসন্ধান থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিষয়টি এখনো অনুসন্ধান ও তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তে যে তথ্য পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ব্যক্তিগত পছন্দ বা মনগড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দুদকের নেই।

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক সচিব বলেন, অনেক ধরনের বক্তব্যই সামনে আসছে। তবে দুদক কীভাবে কাজ করছে, তা পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যাবে অভিযোগের ভিত্তি আছে কি না কিংবা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে অনুসন্ধান পরিচালিত হচ্ছে কি না।

তিনি আরো বলেন, অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী ধাপে যাওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষ হওয়ার পর প্রতিবেদন কমিশনের কাছে উপস্থাপন করা হবে। এরপর প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।

বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহযোগিতা নেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নে সাইদুর রহমান খান বলেন, আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রয়োজন হলে বিদেশে এমএলএআর পাঠানো হবে। যেসব দেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে, সেসব দেশের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন হলে চিঠি দেওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পর সারবত্তা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে কমিশন।

এদিকে আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে হওয়া নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ইতোমধ্যে দুদকের হাতে এসেছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর এসব নথি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল কমিশন। এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র দুদকে সরবরাহ করেছে।

এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি, কেনাকাটাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এ জন্য উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে বিশেষ একটি টিম গঠন করা হয়। পরদিন অনুসন্ধানের স্বার্থে চার ধরনের নথি চেয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়।

এরপর গত রোববার আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আরো কয়েকটি অভিযোগ নিয়ে পৃথক অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। নতুন অভিযোগগুলোর মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ঘুষ, নিয়োগ-পদায়ন বাণিজ্য, বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে অর্থ লেনদেন, সিটি করপোরেশনের টেন্ডার থেকে কমিশন নেওয়া এবং বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, পাঁচটি দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আসিফ মাহমুদের দুই বোনের স্বামী ও এক ভাগনিকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাঠিয়ে বিলাসবহুল ভিলা কেনা, ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং ‘গ্রিন গ্রুপ’-এ মূলধন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতির অর্থ দিয়ে পর্তুগালে জমি কেনার অভিযোগ আনা হয়েছে।

নতুন অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের ৩৬ জেলার ডিসি পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এছাড়া গ্রামীণ অবকাঠামো ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকার লেনদেন, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগের বিনিময়ে ১০ কোটি টাকা গ্রহণ, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।

অভিযোগে আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তার বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ঠিকাদারদের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায় করতেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তার পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষের লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া সরকারি অর্থে হেলিকপ্টারে ভ্রমণ, হোটেল ওয়েস্টিনসহ বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেলে যাতায়াত এবং বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ি ব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের অভিযোগও করা হয়েছে।

তবে দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আসিফ মাহমুদ। রোববার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, তার বিরুদ্ধে কখনো ১ লাখ ২০ হাজার কোটি, কখনো ১১ হাজার কোটি এবং এর আগে ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা নিয়ে অভিযোগের কথা শোনা গেছে। তার ভাষ্য, অভিযোগের অঙ্ক এভাবে পরিবর্তিত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের আগে নিজেদের মধ্যে অবস্থান পরিষ্কার করা উচিত।

আসিফ মাহমুদ আরো অভিযোগ করেন, সরকার কাউকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি করতে চাইলে বিভিন্ন প্রক্রিয়া রয়েছে। তার মতে, অতীতেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দুদককে ব্যবহারের অভিযোগ ছিল এবং ভবিষ্যতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।

দুদকের অনুসন্ধানে আসিফ মাহমুদের পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদসহ আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম এসেছে।

গত ২ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানের খবর প্রকাশের পর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছিলেন আসিফ মাহমুদ। ওই বক্তব্যে তার মানহানি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। পরে গত ১০ সেপ্টেম্বর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের দেওয়া ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আইনি নোটিশ পাঠান তিনি। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছিলেন, আইন ও বিধি মেনেই আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে।

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...