এনআইডির জন্ম তারিখ সংশোধনে চাপে ইসি

গাজী শাহনেওয়াজ

এনআইডির জন্ম তারিখ সংশোধনে চাপে ইসি
ছবি: সংগৃহীত

ছবিসহ জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) থাকা তথ্য সংশোধনের ‘ঘ’ ক্যাটাগরির আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধের অজুহাতে জন্ম তারিখ সংশোধনসংক্রান্ত আবেদন নিষ্পত্তির সব ধরনের এখতিয়ার ঢাকাকেন্দ্রিক করার পর সারা দেশের মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।

এনআইডির তথ্য সংশোধনের জন্য টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া-দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসছেন রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে। কিন্তু এখানে এসে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। উল্টো দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে অর্থ ও সময়ের অপচয়-দুক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সেবাপ্রত্যাশী। এছাড়া তথ্যে ঘাপলা ও নথিপত্রের অসংগতিতে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন জটিলতা।

বিজ্ঞাপন

এ অবস্থায় ‘ঘ’ ক্যাটাগরির আবেদন নিয়ন্ত্রণে অ্যাপয়েন্টমেন্টভিত্তিক সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে ইসি। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত আবেদন বিবেচনার জন্য আবেদনকারীদের শুনানি শুনবে ইসি। এ উপলক্ষে একটি ওয়ার্কশপ করার চিন্তা রয়েছে ইসির।

নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ‘ঘ’ ক্যাটাগরির আবেদন জমা পড়ছে। বর্তমানে এ ধরনের আবেদনের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। ইসির রেকর্ড অনুযায়ী, গত সপ্তাহে এক দিনেই এ-সংক্রান্ত ৩০০ জন ভিজিটরকে সামলাতে হয়েছে আবেদন নিষ্পত্তির দায়িত্বে থাকা ১২-১৩ জন কর্মকর্তাকে। এরপর অ্যাপয়েন্টমেন্টভিত্তিক নিয়ম চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ আমার দেশকে বলেন, জন্ম তারিখ সংশোধনসংক্রান্ত যেকোনো ক্যাটাগরির আবেদন নিষ্পত্তির জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষমতা দেওয়া হবে না। কারণ, একজন মানুষের দুটি জন্ম তারিখ থাকাটা সমীচীন নয়। নিজের অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে সিনিয়র সচিব বলেন, একজনের পিতা মারা যাওয়ার ২০ মাস পর বয়স সংশোধনের আবেদন আমরা পেয়েছি। আবার কারো কারো এমনও পেয়েছি, তার আবেদনটি নিষ্পত্তি করলে ওই ব্যক্তির বয়স দাঁড়াবে ১০ বছর। এটা কি সম্ভব?

ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে উপচেপড়া ভিড়

আগে জন্ম তারিখের ক্ষেত্রে ১০ বছর বা তার বেশি বয়স সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তি করতেন এনআইডির ডিজি। ক্ষেত্রবিশেষ ইসি সচিব-কমিশন। অপরদিকে, পাঁচ-সাত বছর বা ৯ বছর পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা (আরইও) ও এনআইডির পরিচালকরা এ ধরনের সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তি করতে পারতেন। জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা করতে পারতেন করণিক পর্যায়ের জন্ম তারিখ সংশোধন। সাম্প্রতিক সময়ে সেসব ক্ষমতা গুটিয়ে আনা হয়েছে ঢাকার ইসি সচিবালয়ে। ফলে সচিবালয়ের প্রধান কার্যালয়ে প্রতিদিন মানুষের উপচেপড়া ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নানান বিশৃঙ্খলাও তৈরি হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনআইডির একাধিক কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, মানুষ কাজের জন্য একদম মাথার ওপর এসে দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে স্বাভাবিক কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ বিভিন্ন ধরনের অবৈধ আবদার নিয়ে হাজির হচ্ছেন। কেউ এসে কান্নাকাটি করছেন, কেউ পা জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছেন। আবার কেউ এসে হাত ধরে অনুরোধ করছেন। কর্মকর্তারা বলছেন, আমরা তো কাজ করি নথিপত্র ও কাগজের ভিত্তিতে। দুয়ে দুয়ে চার না মিললে তো আমরা অনুমোদন দিতে পারি না।

অদ্ভুত আবদার : মেয়ের চেয়ে মা ছোট!

কর্মকর্তাদের মুখে উঠে এসেছে আবেদনকারীদের কিছু অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য জালিয়াতির চেষ্টা। উদাহরণ হিসেবে এক কর্মকর্তা জানান, ময়মনসিংহের ধোবাউড়া থেকে আসা এক নারী স্কুলের আয়া হিসেবে কর্মরত। তিনি নিজের জন্ম সাল সংশোধন করে ১৯৭৫ করতে চান। অথচ নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, তার মেয়ের জন্ম সাল ১৯৭৩! অর্থাৎ মেয়ের চেয়ে মা দুই বছরের ছোট হতে চান। কাজ না করে দিলে তিনি কার্যালয়েই বিষ খেয়ে আত্মহত্যার হুমকি পর্যন্ত দেন।

আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, ১৯৬০ সালের জন্ম তারিখের এক বয়স্ক ব্যক্তি (স্কুলের নাইট গার্ড) বয়স সংশোধনের জন্য তার স্ত্রীকে নিয়ে এসে হাতজোড় করে কান্নাকাটি করছেন। কিন্তু নথিপত্র ঠিক না থাকায় কর্মকর্তারা তা অনুমোদন দিতে পারছেন না। তিনি ওই বয়স সংশোধন করে চান ১৯৮০ সাল।

নীতিগত দ্বন্দ্ব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভয়াবহ এই চাপ কমানোর জন্য যেখানে মাত্র ১২-১৩ জন কর্মকর্তা ফাইল তুলছেন, সেখানে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ কমাতে আরো ৩২ কর্মকর্তা চেয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ইসির নীতিনির্ধারকরা ওই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। তাদের যুক্তিÑকর্মকর্তাদের ওয়াচ বা নজরদারিতে রাখার জন্যই ফাইলগুলো সচিবালয়ে রাখা হয়েছে। তিনি ফিল্ডের (মাঠ পর্যায়ের) কাউকে বিশ্বাস করেন না। তবে এ ক্ষমতা পুনরায় মাঠে ফিরিয়ে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বারবার বলছেন, তিনি মাঠ পর্যায়ে ক্ষমতা দেবেন না। অন্যদিকে একজন নির্বাচন কমিশনার এটি আবার মাঠে দেওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ আমার দেশকে বলেন, এনআইডি সংশোধন নিয়ে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ-সংক্রান্ত নীতিমালা সংশোধনের জন্য একটি প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু এখনো যাচাই করে দেখা হয়নি। তবে মানুষের ভোগান্তি কমানোর জন্য শিগগির একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে এই বিশৃঙ্খলা ও জট নিরসনে কমিশন একটি কর্মশালা (ওয়ার্কশপ) করার চিন্তা করছে, যার মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে মানুষের সরাসরি কার্যালয়ে আসার ভোগান্তি কমাতে একটি ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট সফটওয়্যার’ তৈরির কাজ চলছে। এই সফটওয়্যার চালু হলে মানুষ সরাসরি কার্যালয়ে না এসে অ্যাপয়েন্টমেন্টের ভিত্তিতে কাজ করতে পারবেন। এজন্য আবেদন বিবেচনার জন্য আবেদনকারীকে পুনরায় আবেদন করতে হবে।

এএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন