ডিবি হারুনকে দায়িত্ব থেকে সরানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন হাসিনা

ডিবি হারুনকে দায়িত্ব থেকে সরানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন হাসিনা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে ডিবি কার্যালয়ে খাবার খাওয়ানো এবং সেই ছবি প্রকাশের ঘটনা নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তৎকালীন ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত সে সময় তাকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়নি।

এ-সংক্রান্ত একটি অডিও কলের কথোপকথনের প্রতিলিপি আজ (১২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২কে এ তথ্য জানান প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন। ওই কথোপকথনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে নিজের বদলি ঠেকানোর অনুরোধ করেছিলেন সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন।

বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত ওবায়দুল কাদের ও হারুন অর রশীদের কথোপকথনের প্রতিলিপিতে হারুনকে বলতে শোনা যায়, সমন্বয়কদের খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত তার নিজের ছিল না। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও এসবি প্রধানের নির্দেশেই খাবারের ব্যবস্থা করা এবং ছবি তোলা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। ওই ঘটনার পর ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই হারুনকে ডিবি থেকে বদলি করে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারের দায়িত্ব দেয়া হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে করা মামলায় যুক্তিতর্কে প্রমাণ হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে অন্যদের ফোনে কথা বলার কথোপকথন ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেছে প্রসিকিউশন।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে আন্দোলন যখন দেশজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করে, তখন কয়েকজন সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তাদের ডিবি কার্যালয়ে খাবার খাওয়ানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। ছবিতে তৎকালীন ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদের সঙ্গে আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ককে একই টেবিলে বসে খাবার খেতে দেখা যায়।

সে সময় ছবিটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ অভিযোগ করে, আটক শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে ডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আটক সমন্বয়কদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা হচ্ছে।

তবে ওই ছবি প্রকাশের ঘটনাটি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও অস্বস্তির কারণ হয়েছিল। বিশেষ করে আন্দোলন যখন সরকারবিরোধী বড় সংকটে রূপ নিচ্ছিল, তখন আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা তরুণদের সঙ্গে ডিবিপ্রধানের এমন ঘনিষ্ঠতার ছবি রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক বার্তা তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হয়।

জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে সমন্বয়কদের ডিবি হেফাজতে নেওয়া, তাদের কাছ থেকে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা আদায়ের অভিযোগ এবং পরে খাবারের ছবি প্রকাশ—সব মিলিয়ে হারুন অর রশীদের ভূমিকা ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খাবারের ছবি সরকারের কৌশল নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলে।

পরবর্তীতে আন্দোলনের গতিপথ আরও দ্রুত পরিবর্তিত হয়। আগস্টের শুরুতে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছালে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং ৫ আগস্ট তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। এরপর জুলাই-আগস্টের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে তদন্ত, মামলা ও নতুন করে তথ্য প্রকাশের ধারাবাহিকতায় ডিবি হেফাজতে সমন্বয়কদের নেওয়া এবং তাদের সঙ্গে খাবারের ছবি তোলার ঘটনাটিও আবার আলোচনায় আসে।

তবে ঘটনাটির রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই শেষ নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নানা ঘটনার মতো এই ঘটনাও এখন প্রশ্ন তুলছে—তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন সংস্থা আন্দোলন মোকাবিলায় কী ধরনের কৌশল নিয়েছিল, সেই কৌশলগুলো কতটা সমন্বিত ছিল এবং মাঠপর্যায়ের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ভাবনার কোনো দ্বন্দ্ব ছিল কি না।

সমন্বয়কদের সঙ্গে হারুন অর রশীদের খাবারের ছবি একসময় ছিল আলোচিত একটি প্রতীকী ঘটনা। কিন্তু সেই ছবিই শেষ পর্যন্ত তৎকালীন ডিবিপ্রধানের জন্য সরকারের ভেতরে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছিল। যদিও নির্দেশ দেওয়া হলেও, শেষ পর্যন্ত তাকে তখন ডিবিপ্রধানের পদ থেকে অপসারণ করা হয়নি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও সেই উত্তাল সময়ের নানা অজানা ঘটনা ও সিদ্ধান্তের পেছনের গল্প সামনে আসছে। সমন্বয়কদের সঙ্গে খাবারের ছবি এবং হারুন অর রশীদকে সরানোর নির্দেশের এই নতুন তথ্যও সেই সময়ের ক্ষমতার ভেতরের অস্বস্তি ও সিদ্ধান্তগত টানাপোড়েনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন