টানা তাপপ্রবাহের পর রোববার বিকেল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টির প্রভাবে সারা দেশে বইছে স্বস্তির সুবাতাস। সোমবার সকাল থেকে রাজধানীর আকাশে চলছে রোদ-মেঘের খেলা; কখনো রোদ উঁকি দিলেও মেঘমালা তাকে ঘিরে ধরছে মুহূর্তের মধ্যে। এমন রোদ-মেঘের খেলার মধ্যেই ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
ভারি বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তা দিয়ে সংস্থাটি বলছে, দেশের উত্তরাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন এলাকায় গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা তৈরি হয়ে অব্যাহত থাকতে পারে। এর প্রভাবে আগামী তিন দিন রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে। ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণের কারণে এসব এলাকার কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
আবহাওয়া দপ্তরের ভাষায়, ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে তা ভারি এবং ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি রেকর্ড হলে সেটিকে বলা হয়ে থাকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত। এদিক থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারি বৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার সকাল ৯টা নাগাদ আগের ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল ছাড়া রাজধানীসহ দেশের সাত বিভাগেই কমবেশি বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছে টাঙ্গাইলে— ৫৮ মিলিমিটার; অবশ্য গতকাল রংপুরে ১৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছিল। রাজধানীতে আজ সকাল ৭ টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘন্টায় ৪১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এতে তাপমাত্রা কমে স্বস্তির সুবাতাস বইছে। আজ রাজধানীতেও সকাল ৭ টায় রাজধানীর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২১ ডিগ্রী সেলসিয়াস; যা আগের কয়েকদিনের তুলনায় ৫ ডিগ্রীর মতো কমেছে। রাজধানীর মতো সারাদেশেও তাপমাত্রা কমে বয়ে চলা তাপপ্রবাহও প্রশমিত হয়েছে।
এদিকে আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক স্বাক্ষরিত সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আজ সোমবার লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ হতে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর প্রভাবে রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায়; রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা কিংবা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।
সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা/ঝড়ো হাওয়া ও
বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেইসাথে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। এদিন সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
আবহাওয়া দপ্তরের গত ২৪ ঘন্টার স্টেশন পর্যবেক্ষণ তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের ৫১টি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ২২টি স্টেশন এলাকা ছাড়া সারাদেশেই কমবেশি বৃষ্টি হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় টাঙ্গাইলে ৫৮ মিলিমিটার। এছাড়া কিশোরগঞ্জের নিকলিতে ৫৪, সিরাগঞ্জের তাড়াশ ও রংপুরে ৫১ মিলিমিটার করে, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ৫০, নারায়ণগঞ্জে ৪৯, নেত্রকোনায় ও নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৪৭, ময়মনসিংহ ও মানিকগঞ্জের আরিচায় ৪৬, চাঁদপুরে ৩৩, কুড়িগ্রামের রাজারহাট ৩১ পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ২৯, দিনাজপুরে ২৩ এবং কুমিল্লায় ২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। তবে আট বিভাগের মধ্যে বরিশাল বিভাগে একফোঁটাও বৃষ্টি হয়নি। খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গায় ১৪ মিলিমিটার ছাড়া আর কোথাও বৃষ্টি হয়নি।
স্বল্প সময়ে পরিমাণে বেশি বৃষ্টির প্রভাবে গত ২০ এপ্রিল থেকে বয়ে যাওয়া তাপপ্রবাহের পরিধি একবারে কমে শুধু রাঙামাটি, বান্দরবান ও লক্ষ্মীপুরের ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। আজ সোমবার তা প্রশমিত হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
এদিকে আগের তুলনায় তাপমাত্রাও কমে এসেছে। গতকাল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় রাঙামাটিতে, ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন রাজধানীর তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল বিকেলে ৩২ মিলিমিটার বৃষ্টির পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তা ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে এবং আজ সকালে তা ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমেছে।
আজ বেলা ১২টার দিকে আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ আমার দেশকে বলেন, বৃষ্টির প্রভাবে তাপমাত্রা প্রশমিত হয়েছে। বৃষ্টিপাতের এই প্রবণতা আগামী মাসের ৩ তারিখ নাগাদ চলতে পারে। ফলে এই সময়ে দেশে কোনো তাপপ্রবাহ থাকবে না।
এর আগে গত বুধবার ২৭ জেলা, গত বৃহস্পতিবার ২০ জেলা, শুক্রবার ২১ জেলা এবং শনিবার ২০ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেলেও গতকাল রোববার ৩ জেলার ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। অন্যদিকে গত বুধবার চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রাজশাহীতে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, পরদিন বৃহস্পতিবার তা কিছুটা কমে যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শুক্রবার আরো কমে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। তবে কিছুটা বেড়ে শনিবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রাজশাহীতে ৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাজধানীতে ছিল ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন শুক্রবার রাজধানীতে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অবশ্য গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা আগের দিন বুধবার ছিল ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি। আর এটাই চলতি মৌসুমে রাজধানী ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত থাকলে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলা হয়। তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা মাঝারি এবং তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র তাপপ্রবাহ ধরা হয়। তাপমাত্রা ৪২-এর বেশি হলে তা অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলে গণ্য হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

