২০২৪ সালের জুলাই মাস, বাংলায় তখন বর্ষাকাল। আকাশে ঘন মেঘের ঘনঘটা, জমিনে বৃষ্টির অবিরল ধারা, নদীতে পাড়ভাঙা ঢেউ, আর সমুদ্রে দুকূল প্লাবিত জোয়ার-প্রকৃতির এই অপূর্ব ও অপরূপ সম্মিলনের সঙ্গে বাংলাদেশের সহস্র তরুণের বুক থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা টগবগে উষ্ণ তাজা রক্ত একসঙ্গে মিলে জাতীয় তথা বিশ্ব ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায় রচিত হলো, যার নাম জুলাই গণঅভ্যুত্থান। একটি বিপ্লব বা অভ্যুত্থান একটি জাতির জীবনে প্রতি বছর ঘটে না। কখনো তা কয়েক দশক পরে, আবার কখনো তা কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে যায়। আবার কোনো কোনো জাতি বিপ্লবের স্বপ্নেই পার করে দেয় অনন্তকাল।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে আগস্ট মাসের ৫ তারিখ পর্যন্ত ৩৬ দিনের প্রত্যেক সপ্তাহ, প্রত্যেক দিনে জাতীয় ইতিহাসের এক-একটি অধ্যায় রচিত হয়েছে, যা একই সঙ্গে বিয়োগান্ত এবং গৌরবের। বিয়োগান্ত এ কারণে যে, এই গণঅভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষ শাহাদতবরণ করেছেন এবং ২০ হাজারের অধিক মানুষ আহত হয়ে আংশিক বা স্থায়ী পঙ্গুত্ববরণ করেছে অবশিষ্ট জীবনের জন্য। গৌরবের এজন্য যে, এই ত্যাগের বিনিময়ে আমরা দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী জঞ্জাল রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি ও জালিমের কারাগার ভেঙে গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। ফ্যাসিস্টকে রাষ্ট্র থেকে উৎখাত করতে সক্ষম হয়েছি।
জুলাই অভ্যুত্থানকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিলেন ১৮ কোটি মানুষের গণনেত্রী, আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশ যখনই ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়েছে, অন্যায় ও জুলুমের করালগ্রাসে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে, আপসহীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া তার দৃঢ় নেতৃত্ব, দেশপ্রেম ও অপরিসীম ত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে রাজপথে নেমেছেন। তার সেই বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও আহ্বানে সাড়া দিয়ে সারা দেশ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সংঘটিত হয়েছে একের পর এক গণঅভ্যুত্থান। স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে ৯ বছরের আপসহীন সংগ্রাম এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাড়ে ১৫ বছরের জীবন ও পরিবার বাজি রাখা এক অভূতপূর্ব লড়াই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট রচনা করেছিল, এই গণঅভ্যুত্থানকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিল। ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন সরকারের এক্সিট প্ল্যানের পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ১৬ বছরে জুলুমের কারাগারে পরিণত করেছিলেন। এ সময় অনেকেই যখন নানা হেকমত ও কৌশল অবলম্বন করে আত্মরক্ষায় সচেষ্ট ছিল, তখন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া তার অসুস্থতা, নিজের জীবনের ঝুঁকি, প্রবাসে এক সন্তানের মৃত্যু এবং অপর সন্তানের জালিমের নির্যাতন থেকে সুস্থতার লড়াই মাথায় নিয়ে, প্রিয় স্বামীর শেষ চিহ্ন ভিটেবাড়ি ছাড়া হয়েও সংগ্রামে অবিচল থেকেছেন। রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার বিনিময়ে বিদেশে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থতা অর্জন ও স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতার ফ্যাসিস্ট সরকারের লোভনীয় অফারকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে কারাগারে থেকেই ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার সঙ্গে সারা দেশে বিএনপির কোটি কোটি নেতাকর্মী ও সমর্থক হত্যা, নির্যাতন, গুম, আয়না ঘর, নিপীড়ন, হামলা, মামলা, ভিটেবাড়ি ছাড়া হয়ে বনে-জঙ্গলে, ধানক্ষেতে বছরের পর বছর দিন-রাত পার করে এই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের চেতনা ও আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে রেখেছেন। ছাত্রদল নেতাকর্মীদের শিক্ষাজীবন ঝরে গেছে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে শ্রমিকের কাজ করে জীবন নির্বাহ করেছেন, তবু ভোল পাল্টে বা হেকমত করে কোথাও জালিমের সহযোগী হননি।
এক চরম স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদের নির্মম রাহুগ্রাস থেকে এ দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে আমাদের তরুণ প্রজন্ম, ছাত্র-জনতা যে অনন্য আত্মত্যাগ এবং রক্তদানের ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান প্রবাসে বলপূর্বক বাধ্যতামূলক নির্বাসনে থেকে আমার নেতা তারেক রহমানের দিকনির্দেশনায় মাঠপর্যায়ে আন্দোলনরত বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে সরাসরি অংশ নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমি বহু চড়াই-উতরাই দেখেছি, বারবার কারাবরণ করেছি, এমনকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চরম শিকার হয়ে গুমের ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের গণতন্ত্রবিরোধী একতরফা নির্বাচন বাতিল ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে যখন দেশজুড়ে তুমুল আন্দোলন চলছিল, তখন আমাদের দলের চেয়ারপারসন দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। আমাদের দলের সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতৃত্ব এবং অগণিত ছাত্র ও যুবনেতা তখন গ্রেপ্তার হয়ে অন্ধকার কারাগারে নিক্ষিপ্ত, মামলা-হামলার পাশাপাশি আওয়ামী সন্ত্রাসী এবং পুলিশ বাহিনীর সরাসরি গুলিতে রাজপথে আমাদের সহযোদ্ধারা শহীদ হচ্ছিলেন, অনেকেই চিরতরে গুম হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন দলের নির্দেশে প্রচণ্ড মৃত্যুঝুঁকি ও হুমকির মুখে গণমাধ্যমে বক্তব্য, বিবৃতি এবং কর্মসূচি ঘোষণা করার পাশাপাশি সার্বিক রাজনৈতিক আন্দোলন যখন নিবিড়ভাবে সমন্বয় করে যাচ্ছিলাম, ঠিক সেই চূড়ান্ত ধাপে এসে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে ঢাকার উত্তরার একটি বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে অস্ত্রধারীরা আমাকে তুলে নিয়ে যায়। তখন আমি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমার হাত বেঁধে, চোখ ঢেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এক অজ্ঞাত স্থানে, যা পরে দেশজুড়ে ‘আয়না ঘর’ নামে কুখ্যাতি লাভ করে। স্যাঁতসেঁতে, আলোহীন সেই ৫ ফিট বাই ১০ ফিটের নির্মম বন্দিশালায় আমার জীবনের অবর্ণনীয় ৬১টি দিন কাটে। এরপর অত্যন্ত সূক্ষ্ম চক্রান্তের মাধ্যমে সীমান্ত পার করে আমাকে ভারতে ফেলে দেওয়া হয়।
অবৈধ অনুপ্রবেশের মিথ্যা দায়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং পুলিশ আমার বিরুদ্ধে মামলা করে। যদিও পরে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৮ সালে ভারতের নিম্ন আদালত আমাকে খালাস দেয়। তারপরও ভারত সরকার আমার খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আপিল আদালতও সেই রায় বহাল রেখে আমাকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর স্পষ্ট নির্দেশ দেয়। তবু তৎকালীন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও বাধার কারণে আমার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দীর্ঘায়িত হতে থাকে।
সাড়ে ৯ বছরের বলপূর্বক নির্বাসিত জীবনের যন্ত্রণা সহ্য করে ২০২৪-এর সেই রক্তঝরা উত্তাল দিনগুলোতে মাতৃভূমি থেকে বহু দূরে অবস্থান করা সত্ত্বেও আমার মন, চিন্তা ও রাজনৈতিক কর্মের পুরোটা জুড়ে ছিল স্বৈরাচারবিরোধী এই গণঅভ্যুত্থান। জুলাইয়ের প্রথম প্রহরে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বৈষম্যবিরোধী কোটা সংস্কার আন্দোলনের ঝান্ডা তুলে ধরল, তখন দূর পরবাসে বসেই আমি অনুধাবন করতে পেরেছিলাম—এটি আর সাধারণ কোনো কোটা সংস্কারের আন্দোলন নয়; এটি ১৬ বছর ধরে ফ্যাসিবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট আপামর জনগণের বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভের তীব্র স্ফুলিঙ্গ। আজকে পরম সত্য উচ্চারণের দিন। কবি মোহিনী চৌধুরীর সেই অমর পঙক্তি আমাদের সবার হৃদয়ে বাজে—‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে।’
৮ জুলাই থেকে যখন ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির ঘোষণা এলো, তখন রাজপথ ও রেলপথগুলোতে আমাদের তরুণ নেতাকর্মীরা সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে দিনরাত সমন্বয়, সহযোগিতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে থাকে। ১৫ ও ১৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ওপর ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী এবং পুলিশের যৌথ হামলা আমার হৃদয়কে দারুণভাবে রক্তাক্ত করেছিল। সে সময় সাধারণ নারী শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো হয়েছিল নজিরবিহীন নির্যাতন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজিদা আহমেদ তন্বীর রক্তাক্ত চেহারা ও চোখের ছবি সেদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। স্বৈরাচারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে নারী প্রতিরোধের সেই ছবিটি দেশজুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং আপামর ছাত্র-জনতা ও অভিভাবকদের রাজপথে নামিয়ে আনতে এক বিশাল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তন্বীর রক্তাক্ত মুখ শুধু একটি ছবি ছিল না; তা ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এ দেশের নারী সমাজের সাহসিকতা ও অদম্য বীরত্বের ঐতিহাসিক প্রতীক।
১৬ জুলাই ছিল এই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার দিন। রংপুরে বীর আবু সাঈদের বুকের ছাতি পেতে দেওয়া সাহসিকতা এবং চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের প্রতিশ্রুতিশীল নেতা ওয়াসিম আকরামের শাহাদত আন্দোলনকে এক অপ্রতিরোধ্য গণবিস্ফোরণে রূপ দেয়। ওয়াসিমের এই আত্মত্যাগ ছিল আন্দোলনের সঙ্গে বিএনপির প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের এক রক্তঝরা দলিল। ওয়াসিম ছিল আমার নিজের গ্রামেরই সন্তান, আমার পরম স্নেহভাজন। তার শাহাদতবরণের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই ভারতে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। সেই তরুণ যখন দেশের মানুষের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করল, তা স্মরণ করে আজও আমার চোখ জলে ভেসে যায়।
২০২৪ সালের ৩৬ দিনের এই আন্দোলন ও এর ইতিহাস বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে, বিশ্বব্যাপী তরুণদের মধ্যে দৃষ্টান্ত হিসেবে উজ্জীবিত করেছে। যার প্রমাণ আমরা দেখেছি নেপালে এবং ভারতের সাম্প্রতিক ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে। এসব আন্দোলনে বাংলাদেশের আন্দোলনের ভাষা, স্লোগান, কর্মসূচি অনুসৃত হতে দেখা গেছে। বাংলাদেশের এই গণঅভ্যুত্থান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত গণমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের বর্ণনায় লিখেছে, ‘বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছে যে, জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তির সামনে সবচেয়ে কঠোর স্বৈরশাসনও টিকতে পারে না। জেন-জি (Gen Z)-এর এই প্রতিরোধ আন্দোলন বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য এক নতুন আশার আলো।’ বিবিসি বাংলাদেশের এই গণঅভ্যুত্থানকে ‘জেন-জি বিপ্লব’ (Gen Z Revolution) হিসেবে অভিহিত করে। সংবাদমাধ্যমটি উল্লেখ করে যে, ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট, কারফিউ এবং নজিরবিহীন দমন-পীড়ন সত্ত্বেও তরুণদের সৃজনশীল স্লোগান, গ্রাফিতি ও সাহসিকতা একটি স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ইকোনমিস্ট আন্দোলনটিকে ‘বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে রূপক অর্থে ব্যবহার করে। তারা লেখে : ‘এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চেপে বসা কর্তৃত্ববাদী শাসনের শিকল ভেঙে তরুণদের এই অভ্যুত্থান দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।’ বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অদম্য সাহসের প্রশংসা করে এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার এই অভিযাত্রাকে তরুণদের একটি ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করে। আলজাজিরা শিক্ষার্থীদের দেয়ালচিত্র (গ্রাফিতি), গান এবং সোশ্যাল মিডিয়াকেন্দ্রিক প্রতিরোধকে তুলে ধরে বলে যে, এটি একবিংশ শতাব্দীর অহিংস ও কার্যকর গণআন্দোলনের একটি বিশ্বমানের রোল মডেল। দ্য গার্ডিয়ান ছাত্র ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন গণআন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ আন্দোলনের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, বাংলাদেশের তরুণদের এই ঐতিহাসিক অংশগ্রহণ ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ইচ্ছাকে স্বাগত জানাই। অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের বিবৃতিতে, বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ও তরুণ শিক্ষার্থীদের সাহসী পদক্ষেপ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার জন্য তাদের নিষ্ঠার প্রশংসা করে নতুন বাংলাদেশের সংস্কার প্রক্রিয়াকে পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দেয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বিবৃতিতে শিক্ষার্থীদের ওপর চলা চরম হিংস্রতার বিরুদ্ধে তরুণদের অবিচল প্রতিরোধকে ‘অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণমানুষের এক অনন্য আত্মত্যাগ’ হিসেবে উল্লেখ করে ন্যায়বিচারের আহ্বান জানায়। আরেক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানায় এবং বাংলাদেশের জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরে।
ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর, ৬ আগস্ট ২০২৪ ভারতের গুয়াহাটিতে বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন থেকে ট্রাভেল পাস পেয়ে সাড়ে ৯ বছরের প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে ১১ আগস্ট ২০২৪ আমি নিজ জন্মভূমিতে ফিরে আসতে সক্ষম হই। বিমানবন্দরে নেমে জিয়া উদ্যানে আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করি এবং গণঅভ্যুত্থানের শহীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি বৈষম্যহীন শক্তিশালী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের শপথ গ্রহণ করি। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সংস্কার কমিশন এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রতিটি বৈঠকে বিএনপির নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত মোতাবেক সক্রিয় ভূমিকা রাখি। আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারে যৌক্তিক মতামত দেওয়ার মাধ্যমে ঐতিহাসিক ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষরিত হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ ওয়াসিম আকরাম, শহীদ মুগ্ধসহ নাম জানা-অজানা শত শত শহীদের আত্মত্যাগকে। যাদের রক্তে ও সাহসিকতায় আমরা পেয়েছি ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন এক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, তাদের প্রত্যাশার রাষ্ট্র গড়ে তোলাই আমাদের প্রধান অঙ্গীকার। রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং একটি জবাবদিহিমূলক, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমরা সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জুলাইয়ের চেতনা আমাদের অনন্তকালের দিকনির্দেশক।
লেখক : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও সদস্য, স্থায়ী কমিটি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



