আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

মৃত্যুর দ্বার থেকে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী

ড. শাহজাহান খান

মৃত্যুর দ্বার থেকে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশ এবং সমগ্র বিশ্ব আজ বিস্মিত—২০০৮ সালে যে ব্যক্তিকে প্রায় মেরে ফেলা হয়েছিল, তিনি আজ নতুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। একবার ভাবুন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মতো একজন কিংবদন্তি রাষ্ট্রনায়ক ও আপসহীন রাজনীতিবিদ বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র হয়ে নিজ যোগ্যতায় তাদের সমকক্ষ একজন স্বতন্ত্র রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা কতটা কঠিন? একজন গৃহিণী হিসেবে জীবন শুরু করা বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে কতটা কঠিন ছিল প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজ গুণে ‘দেশনেত্রী’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা? তাহলে কি তার বাবা-মায়ের বিশালতার বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র নেতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য বিষয়টি আরো কঠিন ছিল না?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য বিষয়টিকে আরো চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনন্য ব্যক্তিত্ব ও সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি—একজন সামরিক জেনারেল থেকে দেশের রাজনৈতিক শীর্ষে পৌঁছানোর অসাধারণ যাত্রা। তার অতুলনীয় সততা, সরলতা, স্বজনপ্রীতি পরিহার, সময়ানুবর্তিতা, দেশপ্রেম, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, জাতীয় ঐক্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতি দৃঢ়তা, উন্নয়নমূলক দৃষ্টিভঙ্গি (খাল খনন, মৎস্য, বৃক্ষরোপণ, গার্মেন্ট, নারী উন্নয়ন), বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দলীয় সীমার বাইরে যোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ—সব মিলিয়ে তিনি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা অর্জন করেন। তিনি বিএনপিকে রাজনৈতিক বাহন হিসেবে ব্যবহার করলেও দলীয় নেতা-কর্মীদের দুর্নীতি বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের রাজনীতিকীকরণে লিপ্ত হতে দেননি।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রপতি জিয়া অত্যন্ত কঠিন ও অনিশ্চিত সময়ে দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং সব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। সেনাবাহিনীর একটি অংশের হাতে স্বামীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বেগম জিয়াও নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। সামরিক স্বৈরাশাসকের দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে তিনি রাজপথের সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। উভয়েরই ছিল ভিন্ন রাজনৈতিক ও আদর্শিক মতাবলম্বীদের একত্র করার অসাধারণ ক্ষমতা।

যুক্তরাজ্যে এক দশকেরও বেশি নির্বাসন শেষে তারেক রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। ২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত সরকারের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে নির্মম নির্যাতনের ফলে গুরুতর আহত হওয়ায় তাকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়া হয়। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় বিএনপির একজন তৃণমূল কর্মী হিসেবে, যখন তার মা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি দলের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছান।

অন্যান্য অনেক রাজনীতিকের মতো তিনি নিজের বা তার মায়ের কষ্টকে সামনে এনে জনগণের সহানুভূতি চাননি। বরং তিনি তার প্রস্তাবিত পরিকল্পনা ও সংস্কারের ভিত্তিতে জনগণের ভোট প্রার্থনা করেছেন। এটি ছিল তার সচেতন সিদ্ধান্ত—বাবা-মায়ের অর্জন ও উত্তরাধিকারের ওপর নির্ভর না করে নিজ যোগ্যতায় নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার দারুণ উদ্যোগ। নির্বাচনে জয়ের পর সব বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি জাতীয় ঐক্যের প্রতি তার দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রমাণ দিয়েছেন।

তারেক-রহমান

তারেক রহমান তার বাবা-মায়ের সময়ের তুলনায় আরো সংকটময় ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিএনপি ও দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব তাকে মুক্ত নাগরিক হিসেবে দেশে ফিরে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। জুলাইয়ের বীরদের আকাঙ্ক্ষা ও আত্মত্যাগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তার পিতার বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্ব এবং স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তার মায়ের সাহসী সংগ্রাম—সব মিলিয়ে তাকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে অনুপ্রাণিত করেছে।

তার সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে—পূর্ববর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলের নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অর্থপাচারের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবলহীনতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের রাজনীতিকীকরণ, বৈদেশিক স্বার্থের সংঘাতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এবং দলীয় কর্মীদের চাঁদাবাজিসহ অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা।

অতীতে পুরো শাসনব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল এবং অনেক কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের আশ্রয়ে প্রশাসনের লোকেরা করদাতা নাগরিকদের প্রভুতে পরিণত হয়েছিল। নতুন প্রধানমন্ত্রীকে এই দুর্নীতির মহামারি ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত নির্মূল করতে হবে এবং এ কাজ এখনই শুরু করতে হবে।

বাংলাদেশের প্রধান সম্পদ হলো তার তরুণ জনগোষ্ঠী। বিশ্বজুড়ে দক্ষ জনশক্তির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে মধ্যপ্রাচ্যে স্বল্প মজুরির অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে পাঠানো বন্ধ করতে হবে। এটি জাতীয় মর্যাদার সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তরুণদের প্রশিক্ষণ ও ব্যাংকঋণ প্রদান করে দেশে ও বিদেশে তাদের জন্য সরকারকে উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

দেশে ও বিদেশে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা পূরণে বাংলাদেশকে উদারভাবে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করতে হবে। পেশাভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ভাষা দক্ষতা প্রদান করলে নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, অফিস স্টাফ, আইটি সহায়ক, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বারসহ বিভিন্ন পেশায় উন্নত দেশগুলোয় কর্মী পাঠিয়ে আয় বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, পূর্ব ইউরোপসহ অনেক পশ্চিমা দেশে জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়ছে।

স্বল্পতম সময়ে ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’ বা demographic dividend কাজে লাগানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশকে শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হবে। গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করে বিশ্বমানের গবেষক ও বিজ্ঞানী গড়ে তুলতে হবে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো অর্থনীতি গড়তে হবে। এর সূচনা করতে হবে প্রাথমিক স্তর থেকেই—উচ্চ বেতনে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে।

তারেক রহমান যদি দুর্নীতি নির্মূল করতে পারেন, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন এবং বিশ্বমানের জনশক্তি তৈরি করে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির পথিকৃৎ হতে পারেন, তবে তিনি নিজেকে সত্যিকারের ‘জনগণের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।

বাংলাদেশের সাফল্য নির্ভর করে সমাজের সব স্তরের মানুষের মধ্যে ন্যায্যভাবে সম্পদ ও জীবিকার বণ্টনের ওপর, কিছু অতি ধনী ‘দানব’ তৈরির ওপর নয়। অসীম অর্থ ও ক্ষমতার লোভের কারণে আওয়ামী লীগ সরকার অজনপ্রিয় হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত হয়। মানুষের আশা—ওই ভয়াবহ ইতিহাসের যেন আর পুনরাবৃত্তি না হয়।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া

Shahjahan.Khan@unisq.edu.au

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন