বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত পাল্টাচ্ছে। এখন আর শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ বা বিপুল জনসংখ্যা উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি নয়। বর্তমান বিশ্বে একটি দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নির্ভর করে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে তার সংযোগের ওপর। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে এই সংযোগকেই এখন বলা হচ্ছে ‘কানেক্টিভিটি’। যে দেশ নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে পেরেছে, তারাই এগিয়ে গেছে। দক্ষ অবকাঠামো ও আধুনিক বন্দর এই কাজে সাহায্য করেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তির কেন্দ্র ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে পূর্ব তথা এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে কানেক্টিভিটি ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ। ফলে কানেক্টিভিটি এখন আর শুধু রাস্তা বা সেতু নির্মাণের বিষয় নয়। এটি মূলত একটি দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
এই বাস্তবতায় প্রস্তাবিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর (CMBEC) আমাদের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। এটি কেবল তিনটি দেশের মধ্যে সড়ক বা রেল যোগাযোগের প্রকল্প নয়। এটি মূলত দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করার সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। বাংলাদেশের তিন দিকজুড়ে ভারতের সীমান্ত। পূর্বে রয়েছে মিয়ানমার এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই অবস্থান বাংলাদেশকে প্রাকৃতিকভাবেই দুই অঞ্চলের সংযোগকেন্দ্রে পরিণত করেছে। কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন এই ভৌগোলিক সুবিধা পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। প্রস্তাবিত এই ত্রিপক্ষীয় করিডোর সেই সীমাবদ্ধতা ভাঙার একটি বড় সুযোগ এনে দিতে পারে। বাংলাদেশের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা দূর করতে এই প্রকল্পে যোগ দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বা কার্যকর কোনো যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। এই করিডোর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের যোগাযোগবিচ্ছিন্নতার অবসানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। করিডোরটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা এবং ভবিষ্যতের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এই সংযোগব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। সড়ক ও রেলপথে আমরা সরাসরি চীন ও মিয়ানমারের বাজারে প্রবেশাধিকার পাব। কিন্তু শুধু রাস্তা বা বন্দর বানালেই এই বিশাল সুযোগ লুফে নেওয়া যাবে না। এর জন্য আমাদের নিজেদের ঘরের কাজও করতে হবে।
এখানে আমরা চীনের একটি ঐতিহাসিক রূপান্তরের উদাহরণ মনে করতে পারি। চীনের কাছে হংকং হস্তান্তরের পর চীন ধীরে ধীরে নিজের মূল ভূখণ্ডের আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবসায়িক পরিবেশ আরো আন্তর্জাতিক মানের করে তোলে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মূল ভূখণ্ডে সরাসরি কাজ করার সুযোগ ও আগ্রহ দুটোই বেশি পেতে শুরু করে। বাংলাদেশ যদি এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চায়, তবে নিজস্ব আইনি ও কর্মপদ্ধতির সংস্কার দরকার। আমাদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে। কাস্টমস ও বন্দরের আইনি কাঠামোকে আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল, গুদামজাতকরণ এবং ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নইলে করিডোরের পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে আসবে না।
এই করিডোরের আলোচনা উঠলেই আঞ্চলিক ভূরাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ভারতের বড় অংশের নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যম এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। তারা একে ভারতের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করেন। তবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে ভারতের নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমের আরো দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। কারণ এই করিডোর কোনো তৃতীয় দেশকে লক্ষ করে তৈরি হচ্ছে না। এটি সম্পূর্ণ একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগ। চীনও বারবার বলে আসছে, এই অঞ্চলের উন্নয়ন ও সহযোগিতা কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ করে বা তাদের ক্ষতি করার জন্য করা হচ্ছে না। এছাড়া বাংলাদেশ তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থে তিস্তা ও মোংলা বন্দর উন্নয়নসহ নানা মেগা প্রজেক্ট করতে চাইবে। বাংলাদেশের সামনে আর কোনো পথও নেই। একটি সার্বভৌম দেশ তার নিজের অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই সিদ্ধান্তকে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার চশমায় দেখা ঠিক নয়।
ভারতের আরেকটি আশঙ্কার জায়গা হলো বঙ্গোপসাগরে চীনের উপস্থিতি। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, চীন ইতোমধ্যেই বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর, তেল ও গ্যাস পাইপলাইন এবং চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের (CMEC) মাধ্যমে চীন আগেই বঙ্গোপসাগরে নিজের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছে। ফলে বঙ্গোপসাগরে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চীনের বাংলাদেশের ওপর আলাদা কোনো কৌশলগত নির্ভরশীলতা নেই। সুতরাং বাংলাদেশ হয়ে নতুন একটি করিডোর নির্মাণের প্রস্তাবকে ভারতকে ঘিরে ফেলার কৌশল বা ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ হিসেবে দেখা যৌক্তিক নয়। এটি মূলত আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরো সাশ্রয়ী করার একটি চেষ্টা।
এখানে আমাদের ক্ষমতার বাস্তবতার তুলনা করাও প্রয়োজন। বিশ্বজুড়ে চীন যে পরিসরে অবকাঠামো ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ করতে পেরেছে, ভারত এখনো সেই মাত্রার আর্থিক সক্ষমতা ও বাস্তবায়ন ক্ষমতায় পৌঁছাতে পারেনি। অদূর ভবিষ্যতে পারবে বলেও মনে হয় না। এটি কাউকে ছোট করার জন্য বলা নয়। বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সরল স্বীকারোক্তি। প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতার সমীকরণ খুঁজলে সবাই লাভবান হবে। ভারতের উচিত এই ত্রিদেশীয় কাঠামোতে নিজেকে যুক্ত করা। তাদের উদ্বেগের জায়গাগুলো চীনের সঙ্গে এক টেবিলে বসে মীমাংসা করা।
কানেক্টিভিটির এই যুগে আমাদের কিছু আক্ষেপের জায়গাও রয়েছে। অতীতে ভারত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা ব্যবহার করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ ভূখণ্ডগতভাবে নেপাল ও ভুটানের খুব কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও এই দেশগুলোর সঙ্গে স্থল যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। কেন ওঠেনি, এটি একটি বড় প্রশ্ন। আঞ্চলিক সংযোগের স্বার্থে ভারতের আরো উদার ও দূরদর্শী ভূমিকা প্রত্যাশিত। বাংলাদেশ, নেপাল বা ভুটান—কোনো রাষ্ট্রই ভারতের সার্বভৌমত্ব বা নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়। ভবিষ্যতেও তারা হুমকি হবে বলে মনে হয় না। নিরাপত্তার অমূলক ভীতি দেখিয়ে স্থল ট্রানজিট সীমিত রাখা আঞ্চলিক মৈত্রীর পরিপন্থী। ভারত যত দ্রুত এই সত্য উপলব্ধি করবে, ততই তা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে।
এই করিডোর কোনো বিচ্ছিন্ন বা একক প্রকল্প নয়। এটি মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর সংযোগ ব্যবস্থার একটি সম্ভাব্য অংশ। বাংলাদেশ এরই মধ্যে ভারত নেতৃত্বাধীন বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল) এবং বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এই ত্রিপক্ষীয় করিডোর ভবিষ্যতে বিবিআইএন বা বিমসটেকের অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বিত হলে সমগ্র অঞ্চলের বাণিজ্যচিত্র বদলে যাবে। এটি আমাদের ঘোষিত ‘পূর্বমুখী নীতি’ বাস্তবায়নেও বড় ভূমিকা রাখবে। এই করিডোর শুধু আমাদের চীনের সঙ্গে জুড়বে না, এটি ভবিষ্যতে আমাদের থাইল্যান্ডের সঙ্গেও যুক্ত করবে। এর ফলে আসিয়ান (ASEAN) এবং আরসেপ (RCEP) ভুক্ত বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ ও বাণিজ্যিক সুযোগ আরো সম্প্রসারিত হতে পারে। এটি আমাদের পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানি শিল্পের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করবে।
এই জটিল সমীকরণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হওয়া উচিত? আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের এই নীতিকে আরো বাস্তবমুখী করতে হবে। চীনের এই প্রকল্পকে আমাদের বিশুদ্ধ ‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। ভারতের স্বার্থের বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার নেই। আমরা ভারতের ‘কালাদান’ মাল্টিমোডাল প্রকল্পের গুরুত্বও স্বীকার করি। আবার নিজেদের টিকে থাকার প্রয়োজনেই আমাদের অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও যুক্ত হতে হবে। ভারতেরও উচিত আমাদের এই প্রয়োজন অনুধাবন করা।
একই সঙ্গে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন অন্য বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট না হয়। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এবং বড় উন্নয়ন সহযোগী জাপানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির অর্থই হলো, সবার সঙ্গে নিজের জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখে সুসম্পর্ক রাখা।
তবে মনে রাখতে হবে, করিডোরের প্রকৃত সুফল তখনই মিলবে, যখন বাংলাদেশ শুধু ট্রানজিট দেশ হয়ে থাকবে না। এর সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানিমুখী শিল্প, কোল্ড চেইন, লজিস্টিকস পার্ক এবং মূল্যসংযোজনভিত্তিক (value-added) উৎপাদন গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় আমরা কেবল পণ্য চলাচলের পথ হয়ে থাকব। সেই পণ্যের মূল্যসংযোজনের বড় অংশ থেকে যাবে অন্য দেশেই। প্রতিটি চুক্তিতে তাই প্রযুক্তি হস্তান্তর ও স্থানীয় শিল্পের অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
সবশেষে বলব, এই অঞ্চলকে এগিয়ে নিতে হলে একক আধিপত্যের ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আমি মনে করি, ভারতেরও আসলে এই উদ্যোগে যোগ দেওয়া উচিত। কারণ ভারত নিজেও তার ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে চায়। আঞ্চলিক আধিপত্যের সংকীর্ণ হিসাব বাদ দিয়ে ভারত ও চীন প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের মতো দেশগুলোর জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে। দুই বড় দেশের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটলে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো উন্নয়নের এক নতুন শিখরে পৌঁছাবে। পারস্পরিক সহযোগিতা ও মৈত্রীর মাধ্যমেই কেবল আমরা সত্যিকার অর্থে একটি ‘এশীয় শতাব্দী’র স্বপ্ন পূরণ করতে পারি।
লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

