শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসছেন বলে একটা খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। খবরের সোর্স হচ্ছে একটা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া তার এক সাক্ষাৎকার। পালানোর পর থেকে তিনি ভারত সরকারের আশ্রিতা। এই আশ্রয় তসলিমা নাসরিনের মতো আশ্রয় না যে তিনি যখন-তখন যেখানে খুশি যেতে পারেন বা যা মুখে আসে বলতে পারেন। শেখ হাসিনা সেখানে যত ভিআইপি মর্যাদায়ই থাকুন কেন, কার্যত তিনি এক ধরনের বন্দি। বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিধায় দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গেও তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে আছে, ফলে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বক্তৃতা-বিবৃতি ফ্রিস্টাইল হওয়ার কোনো কারণ নেই। ফলে এটাই স্বাভাবিক যে শেখ হাসিনা ভারতে যাওয়ার পরদিন থেকেই তার সব তৎপরতা ভারত সরকার বা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন বা নজরদারিতে। সে হিসেবে ধরে নেওয়া যায় এ যাবৎকাল যত বক্তব্য-বিবৃতি তিনি দিয়েছেন, সবই তাদের অনুমোদিত।
সে হিসেবে রয়টার্সকে তিনি যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আয়োজিত, স্পনসরকৃত এবং উত্তরপত্রও গোয়েন্দা সংস্থারই সরবরাহ করা বলে ধরে নেওয়া যায়। তাদের অনুমতি অনুমোদন ছাড়া শেখ হাসিনার পক্ষে এ ধরনের একটা নীতিনির্ধারণী সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং প্রচার যদি সম্ভব না হয়, তাহলে শেখ হাসিনা কি বললেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভারত সরকার এই পর্যায়ে এমন একটা প্রচারে গেল কেন বা তাকে নিয়ে কী ভাবছে!
ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক যখন কিছুটা নাজুক অবস্থায় এবং ভারত চাইছে সম্পর্ক স্বাভাবিক হোক, ঠিক এ সময় শেখ হাসিনার মুখ দিয়ে তার ফেরার কথা বলানোর মাধ্যমে ভারত নিশ্চয়ই যে একটা বার্তা দিল, তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। তবে বার্তাটা আসলে কী, তা বুঝতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশ বারবার ভারত সরকারের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছে যেন শেখ হাসিনাসহ আদালতে দণ্ডিতদের ফেরত দেওয়া হয়। এখন শেখ হাসিনা নিজেই যদি বলেন আমি ফিরছি, বাংলাদেশকে তার পাসপোর্ট অথবা ট্রাভেল ডকুমেন্ট এমনকি ভারত বললে দিল্লি থেকে তাকে আনতে বিমান বা গাড়ি নিদেনপক্ষে একটা প্রিজন ভ্যান হলেও পাঠাতে হবে।
কথাটা হচ্ছে এরপর কী!
তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সময়ও শেষ হয়ে গেছে। আপিলের সুযোগ আর নেই। তার অর্থ রায় বহাল থাকছে। উনি ফিরে আসার পর সরকার তাকে নিয়ে কী করবে! রায় কার্যকরের উদ্যোগ নেবে, না ঝুলিয়ে রাখবে! কত দিন! অথবা আপিলের সুযোগ দিতে আইনে সংশোধনী আনবে!
এ কথাও উঠেছে, আসতেই যদি হয় তাহলে ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা কেন! তার মানে এখানে কি কোনো ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে! ডিসেম্বর নাগাদ দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে এবং তার সূত্র ধরে আর্মিতে কোনো ক্যু করিয়ে ফেরার পরিকল্পনা! ওয়ান-ইলেভেন আমলেও একবার তিনি দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, ক্ষমতা পাওয়ার ইঙ্গিত পেয়ে ফিরেছিলেন। মানুষ শেখ হাসিনাকে যতটুকু জানে তিনি ভারত সরকারের রাজসিক আতিথেয়তা ছেড়ে দেশে এসে জেলের ভাত খাওয়ার লোক না। কোনো ভবিষ্যৎ না দেখে আজীবন জেলে থেকে অযথাই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার রক্তও তার শরীরে না। তাহলে জেলে বসে তিনি কী করবেন! দল গোছাবেন? কীভাবে! কোনো সরকার কি তেমন সুযোগ কখনো কাউকে দেয়!
সবচেয়ে বড় কথা, জেলে বসে শেখ হাসিনা কোন রাজনীতি করবেন! অবশ্যই সরকারবিরোধী। কিন্তু তার সরকারবিরোধী রাজনীতির রেকর্ড তো ভালো না। জিয়াউর রহমানকে তেমন একটা পাননি কিন্তু এরশাদ-খালেদা জিয়াকে রীতিমতো নাকানিচুবানি খাইয়েছেন। সরকারবিরোধী রাজনীতির নামে দেশে যে সন্ত্রাস-সহিংসতা, জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর ও খুনের বদলে খুন, একটার বদলে দশটা লাশ, লগি-বইঠার তাণ্ডবÑমোটকথা, যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছেন, সে ইতিহাস তো এখনো মুছে যায়নি। ৯০-এর পর বিরোধী দলে গিয়েই ঘোষণা দিয়েছিলেন সরকারকে এক মুহূর্তও শান্তিতে থাকতে দেবেন না। দেননি। হরতাল-অবরোধ, ঘেরাও, লাগাতার সংসদ বর্জনÑএমনকি পাঁচ বছরে ছয়শ দিন হরতাল ডাকার রেকর্ডও তিনি গড়েছেন। এটাই শেখ হাসিনার সরকারবিরোধী রাজনীতি। তিনি জানতেনই না বিরোধী দলে থেকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা যায় বা গঠনমূলক বিরোধিতা কাকে বলে।
এই যার অতীত রেকর্ড, দেশে ফিরে জেলে গিয়ে বা বাড়িতেই বসে থেকে তিনি কোন রাজনীতি করবেন, তা বলাই বাহুল্য। শেখ হাসিনা ভুল স্বীকার করেননি, অন্যায়-অপকর্মের দায় কাঁধে তুলে নেননি বা জনগণের কাছে ক্ষমাও চাননি। উল্টো কঠিন প্রতিশোধ নেওয়া, একটা একটা করে খুঁজে বের করে পিষে মেরে ফেলা বা ফিরে এলে প্রতিপক্ষকে ধরে ধরে জবাই করার হুমকি-ধমকি শোনা গেছে। ফলে আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ আছে। তিনি তার পুরোনো পথেই হাঁটবেন। অথবা কোনো কিছুর অপেক্ষায় প্রহর গুনবেন!
একটা নতুন সরকার সবে শুরু করেছে। ১৭ বছরের অনিয়ম, অনাচার, লুটপাট, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়নের ধ্বংসাবশেষ থেকে দেশকে তুলে আনার চেষ্টা করছে, এমন সময় সেই পুরোনো স্টাইলের জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতির চাপ কি এরা নিতে পারবে! এর চেয়েও বড় কথা, জামায়াত, এনসিপিসহ আওয়ামী লীগবিরোধী দলগুলো কি সে অবস্থায় বসে থাকবে! শাহবাগে মজমা জমিয়ে শেখ হাসিনা যেমন ‘লিঞ্চিং মবে’র মাধ্যমে কিল হিম কিল হিম আওয়াজ উঠিয়েছিলেন, কাল যদি তেমন কোনো মব একই আওয়াজ তোলে, পরিস্থিতিটা কী দাঁড়াবে!
আলুর গুদামে আগুন লাগিয়ে পোড়া আলু খাওয়া উদ্দেশ্য থাকলেও লিঞ্চিং মবের এই সম্ভাবনাটা শেখ হাসিনা কতটুকু মাথায় রেখেছেন, তা নিয়ে সন্দেহ আছে!
লেখক : সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

