জাতিসংঘে অন্যরকম বাংলাদেশ

জাতিসংঘে অন্যরকম বাংলাদেশ

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে বলা হয় বৈশ্বিক কূটনীতির মহাসমাবেশ। সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশন মানেই বিশ্বনেতাদের মিলনমেলা। নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিশ্বমঞ্চের এই শীর্ষ আসরে প্রতিটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা তাদের নীতি, অবস্থান ও বৈশ্বিক সংকটের কথা তুলে ধরেন। বর্তমানে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন চলছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই অধিবেশনে বিশ্বের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে শতাধিক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এই অধিবেশনে সশরীরে যোগ দিয়েছেন বলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক বা জেনারেল ডিবেট শুরু হয়েছে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে এবং তা চলবে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ৮১তম অধিবেশনটির মেয়াদ এক বছর এবং ২০২৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আলোচনা চলবে।

এবারের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য হলো, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ চার দশক পর কোনো বাংলাদেশি এই মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক পদের দায়িত্ব পেলেন। এবার অধিবেশনের মূল থিম হলো—‘আস্থা পুনরুদ্ধার ও রূপান্তর ব্যবস্থাপনা : সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ’। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বিরোধ-বিভাজন দূর করে জাতিসংঘের ওপর বিশ্ববাসীর আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর এতে জোর দেওয়া হচ্ছে। চলমান অধিবেশনে মধ্যপ্রাচ্যে সংকট (ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, গাজা যুদ্ধ), ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি, জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র সমস্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং আধুনিক প্রযুক্তির জবাবদিহিমূলক ব্যবহারের বৈশ্বিক নীতিমালা তৈরির বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ উল্লেখযোগ্য বিষয়।

এবার জাতিসংঘে এক অন্যরকম বাংলাদেশ উপস্থাপিত হয়েছে। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশ সভাপতির গৌরবজনক উপলক্ষ হওয়ার পাশাপাশি এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান প্রথম ভাষণ দিয়েছেন। জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তার ভাষণ দেওয়ার মাধ্যমে জাতিসংঘে অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সাধারণ পরিষদের সভাপতির ৪০ সদস্যের প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক নির্বাহী কার্যালয়ে ছয়জন বাংলাদেশি কর্মকর্তার নিয়োগ বাংলাদেশের জন্য এক বিরল ঘটনা।

এবার জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এবং ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম প্রথম ভাষণ দিয়েছেন। বালেন্দ্র শাহের কালো চশমা মিডিয়ার দৃষ্টি কেড়েছে। তার ‘হিমালয় সুনামি’র কথাও বিশ্বনেতাদের নজর কেড়েছে।

বিশ্ব গণমাধ্যমের নজর কেড়েছেন যারা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিতর্কে বিশ্বনেতাদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে এবার দেখা যায়, চলমান কয়েকটি যুদ্ধ পরিস্থিতি। প্রথম দিনেই বিশ্বনেতারা তাদের জোরালো ও ঝাঁঝালো বক্তব্য দিয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমের নজর কেড়েছেন।

বিশ্বের তিন প্রধান পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অধিবেশনে বক্তৃতা করেছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অধিবেশনে যোগ দেননি, তাদের প্রতিনিধিরা এসেছেন। যদিও অধিবেশন চলাকালেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি ওয়াশিংটন সফরে ছিলেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। চীন ও রাশিয়ার এই দুই প্রেসিডেন্টকে জাতিসংঘে খুব একটা দেখা যায় না। তারা বছরের পর বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছেন। পুতিন ও শি জিনপিংয়ের সশরীরে অধিবেশনে যোগ না দেওয়াটা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বড় আলোচনার বিষয় হয়েছে। পুতিন এর আগে নিয়মিত যোগ দিলেও বর্তমানে জাতিসংঘকে এড়িয়ে চলছেন পশ্চিমাদের সঙ্গে চরম বৈরিতার কারণে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে রাখায় আন্তর্জাতিক আইনি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয় রয়েছে। ফলে জাতিসংঘে তার পরিবর্তে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভকে দেখা যায়, যিনি পুতিনের খুব বিশ্বস্ত। অবশ্য পুতিন চারবার সশরীরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এসেছেন। অন্যদিকে শি জিনপিং মনে করেন, জাতিসংঘে শত শত দেশের প্রতিনিধির সামনে ভাষণ দেওয়ার চেয়ে আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি তার জন্য বেশি কার্যকর। বেইজিং মনে করে, তারা বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ পরাশক্তি। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনাই তাদের জন্য বেশি ভালো। শি জিনপিং এ পর্যন্ত মাত্র একবার জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছেন; অথচ ১৪ বছর ধরে তিনি ক্ষমতায় রয়েছেন।

এবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়ে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিরুদ্ধে তিনি আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে পুরোপুরি ‘ধ্বংস’ বা নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিয়েছেন, যা বিশ্বব্যাপী সমালোচনার সৃষ্টি করে। তার বক্তব্যের পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জাতিসংঘে জোরালো বক্তব্য দেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি আয়াতুল্লাহ

খামেনিকে হত্যা এবং স্কুলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় শিশুদের নিহত হওয়ার ছবি দেখান।

জাতিসংঘে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যখন বক্তব্য দেন, তখন মুসলিম দেশসহ ৭৭টি দেশের প্রতিনিধিরা ওয়াক আউট করেন। বাহরাইনসহ কয়েকটি দেশ ওয়াকআউট না করায় সমালোচনা হয়েছে; কারণ ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজার ৯২৮ জন ফিলিস্তিনি হত্যার শিকার হয়েছে এবং ১ লাখ ৭৫ হাজার ৩০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। গণহত্যার শিকার মানুষের মধ্যে ২০ হাজার ১৭৯ জন শিশু এবং ২০ শতাংশ নারী। এ হিসাব জাতিসংঘ এবং গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। অথচ জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে আগ্রাসী ভঙ্গিতে নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরাইল কোনো গণহত্যা চালায়নি, গণহত্যা প্রতিরোধ করেছে।’ তিনি নিউ ইয়র্কের মেয়রকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মি. মামদানি, আপনি আমাকে আটকাতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পারেননি। আমি এসেছি।’ যুদ্ধাপরাধী হিসেবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। নিউ ইয়র্কের মেয়র ঘোষণা দেন, তিনি জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে এলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। ফলে নেতানিয়াহু ম্যানহাটন থেকে ৬০ মাইল দূরে স্টুয়ার্ট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে জাতিসংঘে আসেন। ‘উইং অব জায়ন’ বিমান নিয়ে তিনি আসেন। নিউ ইয়র্কের মেয়রকে আক্রমণ করায় নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সেখানে প্রতিবাদ হয়েছে।

সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী ভাষণে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘বিশ্বের ফাটলগুলো এখন গিরিখাতে রূপ নিয়েছে।’ তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতি ড. খলিলুর রহমান বিশ্বনেতাদের যুদ্ধ সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় এখন তিন ট্রিলিয়ন ডলার বা তিন লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাচ্ছে। এ কারণে টেকসই উন্নয়নের তহবিল সংকুচিত হচ্ছে। আমাদের সামরিক শক্তি প্রয়োগের বদলে সংলাপ ও কূটনৈতিক আলোচনায় সমাধানে যেতে হবে।

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গৌরবগাথা

নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে যখন বিশ্বনেতাদের সমাগম ঘটে, তখন প্রতিটি দেশের নজর থাকে নিজেদের অবস্থান ও মর্যাদার দিকে। তবে এবারের জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনটি বাংলাদেশের জন্য কেবল কোনো রুটিন কূটনৈতিক সফর ছিল না; এটি ছিল বিশ্বমঞ্চে আমাদের এক অনন্য গৌরবগাথা এবং আত্মমর্যাদার নতুন ইতিহাস। এবারের অধিবেশনজুড়ে লাল-সবুজের যে দীপ্তি বিশ্ববাসী দেখেছে, তা প্রতিটি দেশের নাগরিকের মনে এক অভূতপূর্ব দেশপ্রেমের জোয়ার এনে দিয়েছে। এবারের অধিবেশনের সবচেয়ে বড় অহংকার লুকিয়ে ছিল এর সর্বোচ্চ নেতৃত্বের আসনে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞ কূটনীতিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের এই বিশ্বমঞ্চ পরিচালনার দায়িত্ব বাংলাদেশের হাতে থাকা আমাদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও যোগ্যতার এক অনন্য প্রমাণ। সভাপতির কক্ষ থেকে শুরু করে মূল দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও কৌশলগত পদগুলোয় একঝাঁক প্রতিভাবান বাংলাদেশির মেধার স্বাক্ষর প্রমাণ করেছে, বাঙালি শুধু স্বপ্ন দেখে না, বৈশ্বিক নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাও রাখে। এই ঐতিহাসিক আবহে গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সবুজ মার্বেলখচিত ঐতিহাসিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে মাতৃভাষা বাংলায় দেওয়া ১৭ মিনিটের তার সেই ধ্রুপদী বক্তব্য ছিল এক স্বাধিকারকামী, আত্মপ্রত্যয়ী এবং মানবিক বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বিশ্বশান্তি, বহুপাক্ষিকতা এবং মানবমর্যাদার পক্ষে এক আপসহীন ও সুদৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেন।

বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর উদ্দেশে তার কণ্ঠ—‘মারণাস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতাই হোক পরিবর্তনের হাতিয়ার’—গোটা বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ফিলিস্তিনের নিপীড়িত মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের পক্ষে এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে বাংলাদেশের স্পষ্ট ও সাহসী উচ্চারণ বিশ্বমঞ্চে আমাদের এক সাহসী বীরের আসনে বসিয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে আশ্রিত ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও সসম্মান প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির যে জোরালো আহ্বান তিনি জাতিসংঘে জানিয়েছেন, তা আমাদের মানবিক কূটনীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ভাষণে দেশের অভ্যন্তরীণ রূপান্তরের এক গৌরবোজ্জ্বল চিত্রও বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়। ২০২৪ সালে দেড় দশকের এক দীর্ঘ দুঃশাসন ও ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ যেভাবে আবার গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসনের পথে যাত্রা শুরু করেছে, সেই সাহসিকতার গল্প ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ সম্পর্কে তিনি বিশ্বকে জানিয়েছেন। পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, কিংবা যুবসমাজের স্বপ্ন পূরণের যে রূপরেখা তিনি তুলে ধরেছেন, তা এক অপার সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। ‘ডিজিটাল বিভাজন’ যেন আগামী দিনের ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিভাজনে’ রূপ না নেয়, সে বিষয়ে তার দূরদর্শী হুঁশিয়ারি ও জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা তৈরির দাবি প্রমাণ করে, প্রযুক্তি বিশ্বেও বাংলাদেশ কতটা সময়োপযোগী ভাবনার নেতৃত্ব দিচ্ছে। বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে উচ্চারিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’ দেশের মানুষের মধ্যে নতুন দেশপ্রেমের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একদিকে সভাপতির আসনে বাংলাদেশের পতাকা, অন্যদিকে বিশ্বমঞ্চের পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ ও মর্যাদাকে সবার ওপরে তুলে ধরার এই দ্বিমুখী সাফল্য আমাদের কূটনীতির এক সোনালি অধ্যায়। এছাড়া সাইডলাইনে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকগুলোয় তিনি বাংলাদেশের স্বার্থগুলো তুলে ধরেছেন।

ড. খলিলুর রহমান যেভাবে অধিবেশন পরিচালনা করছেন

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান অত্যন্ত দক্ষ, নিরপেক্ষ এবং দূরদর্শী পারফরম্যান্স প্রদর্শন করছেন। গত ৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির তীব্র মেরূকরণ ও চরম উত্তেজনার মধ্যেও তিনি যেভাবে বিশ্বমঞ্চ পরিচালনা করছেন, তা আন্তর্জাতিক মহল এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট (গাজা ও লেবানন সংঘাত) এবং বৈশ্বিক মেরূকরণের এই কঠিন সময়ে ড. খলিল কোনো পক্ষের দিকে ঝুঁকে না পড়ে অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ও আলোচনাগুলো পরিচালনা করছেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভসহ বহু বিশ্বনেতা তার এই পেশাদারিত্বের প্রশংসা করেছেন এবং অধিবেশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছেন।

ওআইসি সেক্রেটারি জেনারেলসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় জোটের প্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে ফিলিস্তিন ইস্যু, ইসলামোফোবিয়া দূরীকরণ এবং বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে তিনি শক্তিশালী সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছেন।

ড. খলিলের বক্তব্য—‘জাতিসংঘের ওপর ৮০০ কোটি মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে আমাদের সংস্কার এবং দৃশ্যমান ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে’ জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ বিশ্বনেতাদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।

তিনি তার ভাষণে স্পষ্ট করে বলেছেন, বিশ্ব পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ছোট বা সুবিধাবঞ্চিত দেশকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি), জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দ্বীপরাষ্ট্র এবং আফ্রিকার দেশগুলোর অধিকার রক্ষায় তার বলিষ্ঠ বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বৈষম্য কমানোর নতুন তাগিদ তৈরি করেছে।

তার বক্তৃতা বিশ্ব মিডিয়ায় সাড়া ফেলেছে, যেখানে তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার ন্যায্য ও শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। এই সাহসী অবস্থান অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাঝে তাকে এক পরম নির্ভরযোগ্য নেতায় পরিণত করেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের ঝুঁকি মোকাবিলায় তিনি যে নিয়ন্ত্রক কাঠামো বা গাইডলাইন তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন, তা বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ও নীতিনির্ধারণী মহলে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। জাতিসংঘে তার প্রতিটি পদক্ষেপ ও বক্তব্য প্রমাণ করছে, তিনি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পদ অলংকৃত করছেন না, বরং বৈশ্বিক সংকট উত্তরণে একজন ‘ব্রিজ-বিল্ডার’ বা সেতু-নির্মাতা হিসেবে প্রকৃত নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিশ্বমঞ্চে তার এই অনবদ্য পারফরম্যান্স বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

লেখক: বাংলাদেশ সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন