আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইউজিসির গবেষণা ফান্ড বরাদ্দে বৈষম্য কেন?

ড. খান শরীফুজ্জামান

ইউজিসির গবেষণা ফান্ড বরাদ্দে বৈষম্য কেন?

প্রতিবছরের মতো এবারও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য শিক্ষকদের গবেষণা ফান্ড বরাদ্দের বিজ্ঞাপন দিয়েছে। তবে বিজ্ঞপ্তির ছোট্ট একটি শর্ত অনেক বড় প্রশ্ন জাগায় মনে-গবেষণা প্রস্তাবনা জমা দিতে পারবেন শুধু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তাহলে ইউজিসি কি আসলে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য, নাকি বাংলাদেশের সমগ্র উচ্চশিক্ষার জন্য কাজ করে?

বিজ্ঞাপন

বৈষম্য চিত্র

ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২৩) বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে গবেষণা খাতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৬২ কোটি টাকা। একই সময়ে দেশের ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল শূন্য। অথচ সংখ্যার বিচারে আমাদের প্রায় ৭০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় বেসরকারি খাতের। তারা গবেষণা ফান্ড থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। এটি নিছক পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি এক ধরনের রাষ্ট্রীয় বৈষম্য। আমাদের বুঝতে হবে, গবেষণা কোনো শিক্ষকের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, এটি জাতির জন্য সম্পদ, আন্তর্জাতিক জ্ঞানের ভান্ডারের জন্য সম্পদ। কাজেই শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য গবেষণা ফান্ড বরাদ্দ মানে দেশের এক বিশাল অংশকে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া।

ইউজিসি ভূমিকা এ ক্ষেত্রে খুব একপেশে হয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় তো তেমন কোনো সহায়তা দেয়ই না, বরং এগুলোর ওপর ইউজিসির তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই। বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণ হলো শিক্ষার্থীরা আর ব্রেইন হলো শিক্ষকরা কিন্তু ইউজিসি-এই দুই গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় তেমন কোনো কার্যক্রমই পরিচালনা করে বলে মনে হয় না। মানুষ আশা করেছিল, ২০২৪-এর আন্দোলনের পর ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করবে! শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক বেতন আদায় বা শিক্ষকদের গবেষণা সুযোগ, প্রমোশন, বেতন-ভাতা, চাকরির নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা ও অবসরকালীন সুবিধা; এগুলোর কোনোটাই তেমন গুরুত্বের সঙ্গে দেখাশোনা করতে পারছে না ইউজিসি। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। দেশের বি ও সি ক্যাটাগরির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এমনও বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেগুলো একজন লেকচারারকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেতন দেয়, যা আমাদের বর্তমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের চেয়েও কম। এছাড়া অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কথা বাদই দিলাম। বি এবং সি ক্যাটাগরির ইউনিভার্সিটিগুলোয় অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধা মূলত তেমন কিছুই নেই। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মূলত কিন্ডারগার্টেন স্কুল বা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের মতো হয়ে পড়েছে। বি এবং সি ক্যাটাগরি ইউনিভার্সিটিগুলোয় নেই তেমন কোনো গবেষণার উদ্যোগ। বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর কোনো গবেষণা সেলও নেই। যেগুলোতে আছে ওগুলোতে কাগজে-কলমে নামকাওয়াস্তে একটি সেল আছে, যার বেশির ভাগই অকার্যকর। দুঃখের বিষয়-এ বিষয়গুলো ইফজিসির তদারকির তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই । অডিট বা ভিজিটে যাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পাঠানো হয়, তাদের ব্যাপারে আর কিছু নেই বললাম!

হিট প্রকল্প

ইউজিসি সম্প্রতি যে Higher Education Acceleration and Transformation (HEAT) প্রকল্প হাতে নিয়েছে, সেখানে সরকারি-বেসরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ দেখা গেছে। ৪ হাজার ১৬ কোটি টাকার এই প্রকল্পে (যার অর্ধেকের বেশি বহন করছে বাংলাদেশ সরকার, বাকি বিশ্বব্যাংক) ১৫১টি উপ-প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি মিলে ৪৮টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রজেক্ট পেয়েছে আর সেখানে ১৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে। শতাংশের হিসেবে প্রায় ৩০।

এটি অবশ্যই ইতিবাচক দিক। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়-যখন বড় আন্তর্জাতিক প্রকল্পে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তখন জাতীয় গবেষণা ফান্ডে কেন তাদের সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়?

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবতা

বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একক কোনো রঙে রঙিন নয়। কয়েকটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট, আইইউবি ইতোমধ্যে বিশ্বমানের অনেক গবেষণা করছে। আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা, বহুজাতিক গবেষণা সহযোগিতা, এমনকি বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়েও তারা সাফল্যের পরিচয় দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ২০২৩ সালের QS World University Rankings-এ বাংলাদেশের মধ্যে শীর্ষস্থান পায়। এক জরিপ (Scopus, ২০২২) অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে সর্বাধিক ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে প্রকাশনা করেছেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষকরা। অথচ, বি এবং সি ক্যাটাগরির অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর গবেষণা সেল নেই, শিক্ষকদের গবেষণার জন্য উৎসাহ বা ছুটির সুযোগ নেই। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আবার মনে করে, গবেষণায় শিক্ষকদের যুক্ত হওয়া মানে খরচ বৃদ্ধি। ফলে তারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গবেষণাকে নিরুৎসাহিত করে। তারপরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক নিজেদের উদ্যোগে গবেষণা চালাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যাচ্ছেন নিজের অর্থব্যয়ে। গবেষণা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শেয়ার করছেন, যা ভবিষ্যতে তাদের স্কলারশিপ, উচ্চশিক্ষা ও বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে গবেষণা ফান্ড দিলে উন্নয়ন শুধু ওই শিক্ষকের বা সেই বিভাগ বা সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের হয় না, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই গবেষণা কর্মে বিভিন্নভাবে জড়িত হয়, যা আমাদের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন শিক্ষার্থী যখন রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান, তার জন্য দেশে বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় স্কলারশিপের রাস্তা সুগম হয়, যা পরে দেশের উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের ইউজিসি সে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কেও গবেষণা ফান্ড দেয়, যদিও কিছু শর্ত থাকে। পাকিস্তানের হাইয়ার এডুকেশন কমিশন সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুদান দেয়। বাংলাদেশে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ফান্ড দেওয়া হচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এক অস্বাভাবিক বৈষম্য।

বৈষম্যের প্রভাব

এই বৈষম্যের কয়েকটি বড় প্রভাব রয়েছে : মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়-গবেষণা থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। জাতীয় উন্নয়ন থেমে যায়-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল শিক্ষার্থী জনসংখ্যা গবেষণার বাইরে থেকে যান। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কমে যায়-যেখানে বিশ্বের অন্য দেশগুলো সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে গবেষণা জোরদার করছে, বাংলাদেশ সেখানে পিছিয়ে যায়।

এই বৈষম্য দূর করতে হলে-সরকারি-বেসরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য গবেষণা ফান্ড উন্মুক্ত করতে হবে। কার্যকর গবেষণা সেল গঠন বাধ্যতামূলক করতে হবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। বরাদ্দ বণ্টনে প্রকাশনার মান, পিএইচডি ডিগ্রি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশিত লেখা-এ ধরনের বিষয়গুলো মানদণ্ড করতে হবে। এইচইএটি প্রকল্পের মতো বড় প্রকল্পে যেমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তেমনি ইউজিসির বার্ষিক গবেষণা ফান্ডেও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

আজকের বিশ্ব জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বিশ্ব। এখানে গবেষণা ছাড়া কোনো দেশ এগোতে পারে না। বাংলাদেশ যদি সত্যিই উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন চায়, তবে ইউজিসিকে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমায় আবদ্ধ রেখে চলা যাবে না। গবেষণা বরাদ্দের সুযোগ দিতে হবে সবার জন্য-সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই। অন্যথায় ইউজিসি থেকে যাবে বৈষম্যপূর্ণ, একপেশে প্রতিষ্ঠান হিসেবে। এখন সময় এসেছে এটিকে সত্যিকার অর্থে একটি জাতীয় উচ্চশিক্ষা কমিশনে রূপান্তর করার।

লেখক : রিসার্চ ফেলো, নীতি গবেষণা কেন্দ্র, ঢাকা, বাংলাদেশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন