‘দেশপ্রেম হলো দরিদ্র মানুষকে ধনীদের জন্য প্রাণ দিতে রাজি করানোর এক কৌশল।’ জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশের উক্তি হিসেবে কথাটি প্রচলিত রয়েছে। যদিও নিৎশে এমনটি বলেছিলেন কি না, নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবু কথাটি সময়ে সময়ে খুব লেগে যায়। যেমন, এখন লেগে যাচ্ছে।
‘লেগে যাচ্ছে’ কথাটি বলছি জুলাই রেভল্যুশনের পর কিছু সিনিয়র তকমা লাগানো সাংবাদিকের আলাপ শুনে। এমনই এক সাংবাদিক একটি টেলিভিশন টকশোতে ফ্যাসিজমের সংজ্ঞা পাল্টে দিতে চাইলেন। কেন চাইলেন? যাতে জুলাই রেভল্যুশনকে অপ্রাসঙ্গিক করা যায়, সেই চিন্তা থেকে। বেচারার বয়স হয়েছে, তার নাম নিলাম না। নাম নিলে অনেকেই জাতে উঠে যান। আমরা এমন কিছু লোককে জাতে তুলি, যারা জাতে উঠে জাতের জাত মারার চেষ্টায় থাকেন। সুতরাং, নাম না নেওয়াটাই সংগত কারণে। ওই ‘সিনিয়র’ সাংবাদিক বললেন, আওয়ামী লীগকে নাকি ফ্যাসিস্ট বলা যায় না। বেচারার বয়স হয়েছে, তা বোঝা যায়। সেরিব্রাল অ্যাট্রোফি নামে একটি রোগ হয় বুড়ো বয়সে। মানুষ সব ভুলে যেতে থাকে। তিনিও সম্ভবত তার শিক্ষা-দীক্ষা ভুলতে বসেছেন। তার ধারণা, অন্য দেশ দখল করার চেষ্টা থাকে ফ্যাসিস্টদের মধ্যে; যাদের এই চেষ্টা নেই, তারা ফ্যাসিস্ট নয়।
ফ্যাসিজমের সংজ্ঞায় আসি। ফ্যাসিবাদ হলো সর্বময় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় গড়ে ওঠা একটি চিন্তাধারা, যেখানে রাষ্ট্র ও একনায়ক এক হয়ে যায়। একে একচ্ছত্র কর্তৃত্ববাদ বলা যায়। মানুষ হয়ে যায় দাস, আর ক্ষমতাসীনেরা প্রভু। ফ্যাসিজমের মূল লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরাচার, উগ্র জাতীয়তাবাদ, বিরোধীদের দমন এবং নিপীড়ন। এখানে অন্য দেশ দখলের কোনো চেষ্টার কথা বলা হয়নি। না, নিজে বলছি না, সরাসরি গুগল থেকে তুলে দিচ্ছি। গুগল ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলছেÑ
উগ্র জাতীয়তাবাদ: জাতির শ্রেষ্ঠত্ব ও উগ্র জাতীয়তাবাদী অহংকার প্রচার করা।
একনায়কতন্ত্র : রাষ্ট্রে একজন নেতা বা একটিমাত্র দলের একাধিপত্য ও সর্বময় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা।
বিরোধিতা দমন: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বিরোধিতা নির্মমভাবে দমন করা।
সহিংসতা ও সামরিক শক্তি: শক্তিপ্রদর্শন, যুদ্ধ এবং উগ্র সামরিকীকরণের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন।
সামরিক শক্তি প্রদর্শন ফ্যাসিজমের শেষ ধারণা। এখন আসি ফ্যাসিজমের সময়ে আমাদের দেশের প্রসঙ্গে। ফ্যাসিস্টরা কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে? আমাদের চারদিকে রয়েছে ভারত। প্রচার রয়েছে, এই ভারতই ফ্যাসিবাদের শক্তি, যা প্রমাণিত। ফ্যাসিস্টদের শেষ ঠিকানা ভারত। সুতরাং, শক্তি প্রদর্শন কার বিরুদ্ধে, সেই ‘সিনিয়র’ সাংবাদিকরা বলবেন কি? ভাইরে, তথাকথিত সিনিয়ররা সত্যিকার অর্থেই সেরিব্রাল অ্যাট্রোফিতে আক্রান্ত। হয় বয়স তাদের সব ভুলিয়ে দিয়েছে, নয়তো তারা মোহে আচ্ছন্ন। অন্ধমোহ, যাকে বলা যায় ডগমাটিজম।
আরেকজন আছেন, একসময় বিএনপিপন্থি বলা হলেও এখন ফ্যাসিজমের এনেবলার। তিনিও সিনিয়র পদবিধারী সাংবাদিক। মাঝেমধ্যেই তরুণদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, জুলাই বিপ্লবের পরে বিপ্লবীদের অনেকেই অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন। এসব গর্দভ জানেনই না, প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব কতটা এগিয়েছে। এখন একটি কোচিং সেন্টারে লেকচার দিয়েও অনেক টাকা উপার্জন করা যায়। ঘরে বসে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে এসব তথাকথিত সিনিয়র সাংবাদিকের চেয়ে অনেক বেশি উপার্জন করা সম্ভব। আমি জানি না, এসব সাংবাদিকের নামের পাশে ‘সিনিয়র’-এর বদলে কেন ‘অবসরপ্রাপ্ত’ শব্দটি লাগানো হয় না। এরা যখন সাংবাদিক ছিলেন, তখন সাংবাদিকতা কোনোভাবেই পেশা হিসেবে গড়ে ওঠেনি। এখনো আমাদের দেশে সাংবাদিকতাকে অন্তত পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। সুতরাং, এসব সাংবাদিক বর্তমান সময়কে ধারণ করবেন না, এটাই স্বাভাবিক।
আরেকজন আছেন, আব্দুন নূর তুষার। ছিলেন ডাক্তার, তারপর হলেন উপস্থাপক। অতীতকাল ব্যবহার করলাম। কারণ, এখন তিনি গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। ভুলভাল আলাপের একজন বিশেষজ্ঞ। ইতিহাসজ্ঞান নেই, নেই কোনো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, তবু তিনি আলোচনা করেন রাজনীতির বাহির-অন্দর নিয়ে। আর সুযোগ পেলেই শহীদ ওসমান হাদিকে গালাগাল করেন।
ওসমান হাদিকে কেন গালাগাল করেন, সে প্রশ্নের উত্তর জটিল এবং একই সঙ্গে সহজ। সহজ কীভাবে বলি? তুষার সাহেবরা আমদানি করা একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে তারা আমাদের সংস্কৃতিকে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতিতে বদলে দিয়েছিলেন। সেই বদলে দেওয়া সংস্কৃতিতে তাদের একটি কমফোর্ট জোন তৈরি হয়েছিল।
ওসমান হাদি সেই কমফোর্ট জোনে আঘাত করেছিলেন। তাদের কাচের ঘর ভেঙে দিয়েছিলেন। কীর্তনের বদলে কাওয়ালিকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হাদি। কীর্তন আমাদের সংস্কৃতির অংশ, কিন্তু প্রধান অংশ নয়। সেই কীর্তনকেই আমাদের সংস্কৃতির প্রধান অংশে পরিণত করেছিলেন আব্দুন নূর তুষাররা। ফলে সংগতভাবেই বিরোধ ও বিভেদের সৃষ্টি হয়েছিল এবং সাম্প্রদায়িকতারও জন্ম হয়েছিল। কারণ, আমাদের যাপিত জীবনের সঙ্গে কীর্তন যায় না। তারপরও তা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যেমন : তথাকথিত এলিট মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা রবীন্দ্রনাথকে জোর করে আমাদের জাতির ওপর সংস্কৃতির ঈশ্বর হিসেবে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। হাদি সেই ঈশ্বরকে ধুলায় নামিয়ে দিয়েছেন। হাদিকে গালাগাল করার কারণ সেটাই।
আমজনতা পার্টির তারেক সাহেব, যিনি আম-তারেক নামে বহুল পরিচিত, তিনি হাদির কবর নজরুলের কবরের পাশ থেকে সরাতে বলেছেন। আব্দুন নূর তুষাররাও তা-ই বলেছেন। অথচ তারা তো নজরুলকেই বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। ফ্যাসিজমের সময়ে নজরুলের কবরের কতটা অবহেলা হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তখন তারা নজরুলের কবর নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হননি। উল্টো তারা রবীন্দ্রনাথকে সংস্কৃতির ঈশ্বর বানিয়েছিলেন। রবীন্দ্র-কাল্ট গড়ে তুলেছিলেন। রবীন্দ্রসংগীতকে ইবাদতের সমতুল্য বলার মতো ধৃষ্টতাও দেখানো হয়েছিল। বিপরীতে, আজ তারা নজরুলকে অবলম্বন করছেন হাদির অবমাননায়। যেমন : ‘রাজাকার’ কবি আল মাহমুদের কবিতা আজ পঠিত হয়, উচ্চারিত হয় পলাতক ফ্যাসিস্টদের আলাপ-প্রলাপে। ফ্যাসিস্টদের সময়ে আল মাহমুদকে অবমাননা ও অপমান করার কোনো কিছুই বাদ রাখা হয়নি। সেই আল মাহমুদকেই আজ তাদের অবলম্বন করতে হচ্ছে। তেমনি হাদিকে অবমাননা করতে এখন নজরুলের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে গুপ্ত ফ্যাসিস্টদের। এই আম-তারেক, আব্দুন নূর তুষারসহ অন্যরা—তাদের সবার চিন্তার স্তর একই। তাদের চিন্তা হাদির কবর সরানোতেই সীমাবদ্ধ। যেমন : ফ্যাসিস্টদের চিন্তা ছিল চন্দ্রিমা থেকে শহীদ জিয়ার কবর সরানো। কবর সরানোর চিন্তা ধারণকারীরা মূলত গুপ্ত ফ্যাসিস্ট।
যাকগে, আসি ফ্যাসিজমের সংজ্ঞায়। যারা নতুন করে ফ্যাসিজমের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে চান, তারা মূলত বোকার স্বর্গে বাস করেন। তারা ভুলে গেছেন, গত দেড় দশক ধরে স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যে ইতিহাস পড়ানো হয়েছে, তা তরুণরা আত্মস্থ করেনি; বরং তারা সত্যটা জেনেছে। তারা উল্টো চ্যালেঞ্জ করেছে নির্মিত ইতিহাসের বাকোয়াজকে। সেই তরুণরা জানে, আপনারা কেন ও কোন কারণে ফ্যাসিজমের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে চাইছেন। তারা জানে, আপনারা সবাই গুপ্ত ফ্যাসিস্ট। এসপিওনাজের ভাষায়, যাদের বলা হয় ‘স্লিপার সেল’। ‘গুপ্ত’ শব্দটা আপনাদের জন্যই প্রযোজ্য এবং সঠিক।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

