ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দীর্ঘ ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বন্ধনে দৃঢ়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা শুধু দুই দেশের সম্পর্ককে গভীরতর করেনি, এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এই সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। এই গভীর শিকড়যুক্ত সংযোগ থাকা সত্ত্বেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বারবার সহযোগিতা ও সংঘাতের মধ্যে দোদুল্যমান হয়েছে। সহযোগিতার সময়গুলো পারস্পরিক উপকারিতার সম্ভাবনা তুলে ধরলেও অন্তর্নিহিত উত্তেজনা প্রায়ই অগ্রগতিকে ব্যাহত করেছে। আকার, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক এজেন্ডার বৈষম্য এই গতিশীলতাকে প্রভাবিত করে, যা কখনও কখনও আধিপত্য ও নির্ভরশীলতার ধারণা সৃষ্টি করে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সম্পর্ক ক্রমেই তিক্ত হয়ে উঠেছে, যা পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সন্দেহের দ্বারা চিহ্নিত। অমীমাংসিত নদীর পানিবণ্টন চুক্তি, অযাচিত রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো মূল বিষয়গুলো বাংলাদেশে অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলেছে। এর পাশাপাশি স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থার প্রতি ভারতের স্পষ্ট সমর্থন এই গতিশীলতাকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং এর দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে।
মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত: হাসিনা সরকারের পতন
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের নাটকীয় পতন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হয়। আওয়ামী লীগের দীর্ঘকালীন শাসনের সমাপ্তি, যা কর্তৃত্ববাদী শাসন, ব্যাপক দুর্নীতি ও জনগণের ব্যাপক অসন্তোষের অভিযোগে জর্জর ছিল, দেশের রাজনৈতিক সংস্কারের দরজা খুলে দেয় এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে সম্ভাব্য নতুন দিক নির্ধারণের সুযোগ সৃষ্টি করে। তবে ভারতের জন্য এই রাজনৈতিক পরিবর্তন জটিল চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে, কারণ আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের গভীর সম্পর্ক এবং ঢাকায় প্রভাব বজায় রাখার স্বার্থ। এ সম্পর্ক কখনও কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার মঞ্চে শক্তিশালী হয়েছে, আবার কখনও সীমান্ত সমস্যা, পানিবণ্টন ও আঞ্চলিক আধিপত্যের ইস্যুতে উত্তেজনার শিকার হয়েছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও এর কারণ বিশ্লেষণ করে সমাধানের পথ বের করা দুই দেশের স্বার্থেই অপরিহার্য।
উত্তেজনার কারণ
১. বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের প্রভাবশালী অবস্থান প্রায়ই সমালোচিত হয়েছে। কিছু ভারতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশের নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরতে উৎসাহী হয়েছে। বিশেষত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে কূটনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ভারতের কূটনৈতিক আচরণ আরও আলোচিত হয়েছে। রাজনৈতিক পরিবেশে ভারতের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসের সৃষ্টি করেছে।
২. ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এ নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনা দুই দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা একটি বিষয়, যা বাংলাদেশে কৃষি ও জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারতের রাজনৈতিক ও প্রাদেশিক সীমাবদ্ধতা চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে বরাক নদীতে বাঁধ নির্মাণসহ একতরফা পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের কারণ হয়েছে। এসব ইস্যু শুধু কৃষি খাতেই নয়, পরিবেশগতভাবে টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সমস্যার সৃষ্টি করেছে।
৩. বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ভারতের সঙ্গে ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে আমদানির তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি নগণ্য। বিশেষত, গার্মেন্টস খাতের ওপর শুল্ক আরোপ এবং আমদানি-রপ্তানির অযৌক্তিক নিয়ম বাণিজ্যিক সম্পর্ককে দুর্বল করছে। ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও ভারত বাংলাদেশে তাদের পণ্য রপ্তানিতে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে, যা অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার অন্যতম কারণ।
৪.সীমান্তে সহিংসতা দুই দেশের সম্পর্ককে বহু বছর ধরে জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিকদের গুলি করে হত্যা দুই দেশের মধ্যে আস্থার অভাব সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও সীমান্তে অবকাঠামোগত সমস্যা এই উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। অতি সম্প্রতি রংপুর ও তৎসংলগ্ন জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন নিয়ে উসকানি দিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।
৫. বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিয়ে ভারতীয় মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচারণা দুই দেশের সামাজিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলেছে। এসব প্রচার দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভাজনকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারতে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব এবং ধর্মীয় বিষয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
উত্তেজনা নিরসনের সম্ভাব্য পথ
১. ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তুলতে হলে পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করতে হবে। ভারতকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলা উচিত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার সময় জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কৌশল অবলম্বন করতে পারে।
২. তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। এই চুক্তি দ্রুত সম্পাদনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন। অন্য অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন ও পানি ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের যৌথ পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
৩. ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্কের উন্নতির জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা সম্প্রসারণ এবং অপ্রয়োজনীয় বাধা দূর করা প্রয়োজন। ভারতের উচিত, বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, বিশেষ করে গার্মেন্ট খাতে। একই সঙ্গে ভারত বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়িয়ে এবং যৌথ শিল্প প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।
৪. সীমান্তে সহিংসতা রোধ করতে দুই দেশের যৌথ সীমান্ত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। সীমান্তে মানবিক আচরণ ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। অবৈধ কার্যকলাপ রোধ করতে দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে বোঝাপড়া আরও উন্নত করা যেতে পারে।
৫. দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংগঠনগুলো, যেমন সার্ক ও বিমসটেকের মাধ্যমে যৌথ প্রকল্প গ্রহণ ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনা বাড়ানো যেতে পারে। বিশেষত, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো বিষয়ে দুই দেশ একত্রে কাজ করতে পারে।
৬. দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থা বাড়ানোর জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক হবে। সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে ঐতিহাসিক বন্ধন জোরদার করা যেতে পারে, যা উভয় দেশের মধ্যকার বিশ্বাস আরও দৃঢ় করবে।
বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের ভূমিকা
২০২৪ সালে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সরকারের উচিত ভারতের সঙ্গে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়নে আন্তরিক কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা।
অন্যদিকে ভারতের উচিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোকে বিবেচনায় রেখে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য সমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং সহযোগিতার ভিত্তি মজবুত করতে হবে। কূটনৈতিক সদিচ্ছা ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নই ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।
যদি দুই দেশ আস্থা ও সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করে, তবে এটি শুধু দুই দেশের জন্যই নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও শান্তি, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার মডেল হয়ে উঠতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

